Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

বিজেপির প্রচারমিছিলে হামলা, তারপর পুলিশকে মারধর — ভোটের আগেই রণক্ষেত্র দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী।




রাস্তায় ফেলে এসআইকে বাঁশপেটা, পরদিন সাসপেন্ড আইসি — বাসন্তীকাণ্ডে কড়া বার্তা কমিশনের থানার আইসি সাসপেন্ড, ডিজির কাছে রিপোর্ট তলব, ৯ জন গ্রেফতার। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে — কেন্দ্রীয় বাহিনী কেন দেরিতে পৌঁছল?


 মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা, ২৭ মার্চ: ছবিটা টেলিভিশনে দেখে বহু মানুষ চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন। বাসন্তী থানার সাব-ইন্সপেক্টর সৌরভ গুহ রাস্তায় পড়ে আছেন। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। আর তাঁকে ঘিরে দাঁড়িয়ে লুঙ্গি-হাওয়াই চটি পরা কয়েকজন — হাতে বাঁশ। সেই অবস্থাতেই তাঁকে ঘিরে ধরে বাঁশ দিয়ে পেটাতে থাকে দুষ্কৃতীরা। প্রাণভয়ে কোনওক্রমে পালিয়ে বাঁচতে হয় পুলিশ অফিসারকে।

এটা বৃহস্পতিবার দুপুরের ঘটনা। শুক্রবার সকালে কমিশন বাসন্তী থানার আইসি অভিজিৎ পালকে সাসপেন্ড করল। এর মধ্যে মাত্র একটা রাত।

ঘটনা কীভাবে শুরু হল?

বৃহস্পতিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসন্তী বিধানসভা কেন্দ্রের সোনাখালি এলাকায় বিজেপির একটি মিছিল বেরিয়েছিল। মিছিলে ছিলেন বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সর্দার এবং দলের কর্মী-সমর্থকরা।

অভিযোগ, বিজেপির প্রচার ক্যামেরাবন্দি করছিলেন তৃণমূলের কর্মীরা। তা নিয়ে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে সংঘর্ষে পরিণত হয়।

দুষ্কৃতীরা বাঁশ ও লাঠি হাতে চড়াও হয়ে বিজেপি কর্মীদের একের পর এক বাইক ভাঙচুর করতে থাকে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে দেখে বেগতিক বুঝে বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সর্দার এলাকা ছেড়ে কাছাকাছি একটি ভারত সেবাশ্রমে আশ্রয় নেন।

খবর পেয়ে বাসন্তী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। আর তখনই ঘটে আসল বিপর্যয়।

TV9 বাংলার ক্যামেরায় ধরা পড়ে পুরো দৃশ্য। এসআই সৌরভ গুহ রাস্তায় পড়ে যান। মাথা ফেটে রক্তাক্ত হন। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে আসার কেউ ছিল না। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে।

সব মিলিয়ে অন্তত আটজন পুলিশকর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। গুরুতর আহত এসআই সৌরভ গুহকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।


কমিশনের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া

ঘটনার ছবি ছড়িয়ে পড়তেই কমিশন নড়ে বসে। পুলিশকে মারধর — বিশেষত একজন অফিসারকে রাস্তায় ফেলে বাঁশপেটার ভিডিয়ো — এটা কমিশনের কাছে সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষের মতো দেখা গেল না।

শুক্রবার সকালে কমিশন ঘোষণা করল — বাসন্তী থানার ইন্সপেক্টর ইন-চার্জ অভিজিৎ পাল সাসপেন্ড। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব পেলেন প্রবীর ঘোষ। একই সঙ্গে অভিজিতের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হল।

কমিশন এখানেই থামল না। বাসন্তীর ঘটনার প্রেক্ষিতে রাজ্যের সমস্ত পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনারদের কাছে জরুরি নির্দেশ পাঠানো হল। বলা হল, এই ধরনের ঘটনায় শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করতে হবে। সমস্ত থানার ওসিকেও একই নির্দেশ দেওয়া হল। প্রয়োজনে বল প্রয়োগের অনুমতিও দেওয়া হল।


সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: কেন্দ্রীয় বাহিনী কেন দেরিতে এল?

এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা উঠেছে প্রশাসনের ভেতর থেকেই।

কমিশন রাজ্যের ডিজির কাছে রিপোর্ট তলব করে জানতে চেয়েছে, এত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও মাত্র দুই সেকশন কেন আনা হয়েছিল? কেন বাহিনী ডাকতে দেরি হল? অনুমতি না থাকলে মিছিল হল কীভাবে?

কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। ঘটনাস্থলে বাহিনী দেরিতে পৌঁছানোয় পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। পুলিশ সুপার পরে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।

কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, 'গোয়েন্দা ব্যর্থতা' নিয়েও আলাদাভাবে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্ন উঠেছে — আগে থেকে কোনও তথ্য ছিল না? জানা ছিল না যে এই এলাকায় উত্তেজনা আছে?


গ্রেফতার ৯, জামিনঅযোগ্য ধারায় মামলা

বৃহস্পতিবারের ঘটনার পর শুক্রবার বেলা পর্যন্ত মোট নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের আলিপুর আদালতে তোলা হয়েছে।

ধৃতদের বিরুদ্ধে পুলিশকে মারধর ও খুনের চেষ্টা, এলাকায় হিংসা ছড়ানো, প্রচারে বাধা দেওয়া এবং সম্পত্তি নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। সবকটি অভিযোগই জামিনঅযোগ্য ধারায়।

আলিপুর আদালত ধৃতদের পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছে। বিজেপির দাবি, গ্রেফতার সবাই তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতী।


তৃণমূল-বিজেপির পাল্টাপাল্টি

ঘটনার পর থেকে দুই দলের মধ্যে দোষারোপের লড়াই তুঙ্গে।

বিজেপি প্রার্থী বিকাশ সর্দার বলেছেন, "আজ বাসন্তীতে গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে অতর্কিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল।" তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, এলাকায় পর্যাপ্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী নেই বলে বিরোধী কর্মীরা নিরাপত্তাহীন।

তৃণমূল অবশ্য সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, বিজেপিই পরিকল্পিতভাবে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

একদিকে বিজেপির অভিযোগ প্রচারে বাধা দেওয়া এবং রাস্তা আটকানোর। অন্যদিকে তৃণমূলের পাল্টা অভিযোগ, বিজেপিই আগে উস্কানি দিয়েছে। দুই পক্ষের বক্তব্য সরাসরি বিপরীত।


কমিশনের বার্তাটা কী?

বাসন্তীর ঘটনায় কমিশন যা করল — একজন আইসিকে সরাসরি সাসপেন্ড করা — সেটা আগে খুব একটা দেখা যায়নি।

কমিশনের বার্তাটা স্পষ্ট। পুলিশের উপর হামলা এবং ভোটের প্রচারে বাধা — এই দুটো বিষয়কে একসঙ্গে দেখা হচ্ছে। এবং থানার আধিকারিক যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারেন, তাহলে তাঁর চাকরি যাবে।

ধৃতদের পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশের পাশাপাশি এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর রুটমার্চও শুরু হয়েছে। চাপা আতঙ্ক কাটছে না এলাকায়।


পটভূমি: বাসন্তী কেন সংবেদনশীল?

বাসন্তী দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার বিধানসভা কেন্দ্র। এখানে তৃণমূলের ঐতিহাসিক দাপট। ২০২১ সালে তৃণমূল ভালো ব্যবধানে জিতেছিল। এবার বিজেপি সেই ব্যবধান কমাতে মরিয়া। সেই পটভূমিতে প্রচার শুরু হওয়ার এত কম সময়ের মধ্যে এই সংঘর্ষ — স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ছে।

ভোট হবে ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল। এখনই এই চিত্র। বাকি দিনগুলো কেমন যাবে, সেটা ভাবলে প্রশ্ন জাগে।


মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code