মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক | ৪ মার্চ, ২০২৬
বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে রাজ্যজুড়ে। আর এই ভোটের আবহে মুর্শিদাবাদের রাজনীতিতে ক্রমশ চড়ছে পারদ, বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ। এবার খোদ ভরতপুরের সাসপেন্ডেড তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের পরিবারেই বড়সড় 'ভাঙন' ধরাল শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। সব কিছু ঠিক থাকলে খুব শীঘ্রই ঘাসফুল শিবিরে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিতে চলেছেন খোদ হুমায়ুনের জামাই রায়হান আলি। শুধু রায়হান একাই নন, তাঁর বাবা অর্থাৎ হুমায়ুনের বেয়াই শরিফুল ইসলামও শাসকদলের পতাকা হাতে তুলে নিতে চলেছেন বলে মঙ্গলবার বিশ্বস্ত সূত্র মারফত জানা গিয়েছে।
দল থেকে নিলম্বিত হওয়ার পর যখন নিজের নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে চলেছেন ভরতপুরের দাপুটে নেতা হুমায়ুন, ঠিক সেই সময়ে তাঁর নিজের ঘরেই এই রাজনৈতিক বিভাজন মুর্শিদাবাদ জেলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রার যোগ করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
পুরনো মাদক মামলা এবং 'ভয় দেখানোর' তত্ত্ব
রায়হান ও তাঁর বাবার এই দলবদলের নেপথ্যে কি কেবলই রাজনৈতিক আদর্শ, নাকি রয়েছে অন্য কোনও কারণ? বিরোধী থেকে শুরু করে হুমায়ুন শিবিরের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে 'চাপ সৃষ্টির' তত্ত্ব। জানা গিয়েছে, একটি পুরনো মাদক মামলায় ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হয়েছে হুমায়ুনের জামাই রায়হান এবং তাঁর বাবা শরিফুল ইসলামকে। তাঁদের রীতিমতো ডেকে পাঠানো হয়েছিল।
এই ঘটনার পর থেকেই সরব হয়েছিলেন খোদ হুমায়ুন কবীর। রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক আচরণ এবং ভয় দেখিয়ে তৃণমূলে যোগদান করানোর বিস্ফোরক অভিযোগ আগেই প্রকাশ্যে এনেছিলেন তিনি। হুমায়ুনের অভিযোগ ছিল, তাঁর জামাইকে মিথ্যে মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে দলে টানার মরিয়া চেষ্টা করছে তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকী, শাসকদলের তরফ থেকে লালগোলা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে রায়হানকে প্রার্থী করার টোপও দেওয়া হয়েছে বলে সুর চড়িয়েছিলেন ভরতপুরের এই বিদ্রোহী নেতা। এই টানাপোড়েন এবং পুলিশি তলবের আবহেই জামাই ও বেয়াইয়ের তৃণমূলে যোগদানের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
জল্পনার কেন্দ্রে লালগোলা: দোল মিটলেই দলবদল?
মঙ্গলবার রায়হান আলি নিজেই সংবাদমাধ্যমের কাছে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, খুব শীঘ্রই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখতে চলেছেন এবং তাঁর গন্তব্য যে তৃণমূল কংগ্রেস, সেটাও একপ্রকার স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
তৃণমূল সূত্রের খবর, আসন্ন দোল উৎসব মিটে গেলেই রাজ্য নেতৃত্বের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাসফুল শিবিরের উত্তরীয় পরবেন রায়হান ও তাঁর বাবা শরিফুল। মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক অলিন্দে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, হুমায়ুনের করা 'টোপ'-এর অভিযোগ একেবারেই অমূলক নয়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে লালগোলা কেন্দ্র থেকে শাসকদলের প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এই মুহূর্তে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন রায়হান। প্রায় ১০ বছর আগে হুমায়ুন-কন্যা নাজমা সুলতানার সঙ্গে বিয়ে হয় রায়হানের। এবার সেই জামাইকেই বিধানসভায় ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে শাসকদল।
আদর্শগত কারণ না কি নিছকই রাজনৈতিক কৌশল?
শ্বশুর হুমায়ুন কবীর যেখানে সরাসরি পুলিশি চাপ এবং মিথ্যে মামলার অভিযোগ তুলছেন, সেখানে জামাই রায়হানের গলায় কিন্তু অন্য সুর। মঙ্গলবার তাঁর বক্তব্যে শ্বশুরের তোলা অভিযোগের বিন্দুমাত্র প্রতিফলন মেলেনি।
তৃণমূলে যোগদানের কারণ হিসেবে রায়হান তুলে ধরেছেন রাজনৈতিক আদর্শের কথা। তিনি বলেন, "বিজেপির মতো একটি ঘোরতর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আটকাতে এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র বিকল্প হল তৃণমূল কংগ্রেস। যেহেতু বিজেপিই আমাদের প্রধান শত্রু, তাই সেই শক্তিকে রুখতেই তৃণমূলে যোগদানের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
রায়হানের এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি তাঁর শ্বশুরের রাজনৈতিক লাইনের বাইরে গিয়ে শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের ঠিক করে দেওয়া 'অ্যান্টি-বিজেপি' ন্যারেটিভকেই হাতিয়ার করে ময়দানে নামতে চাইছেন।
হুমায়ুনের নতুন দল 'এজেইউপি' (AJUP) এবং তাঁর অনড় অবস্থান
জামাই যখন তৃণমূলে, শ্বশুর তখন নিজের আলাদা রাজনৈতিক জমি প্রস্তুত করতে ব্যস্ত। দল বিরোধী কার্যকলাপ এবং একাধিকবার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল হুমায়ুন কবীরকে। এরপর আর বসে থাকেননি তিনি। মুর্শিদাবাদে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে আলাদা রাজনৈতিক দল তৈরি করার ঘোষণা করেছিলেন।
প্রাথমিকভাবে দলের নাম ঠিক করা হয়েছিল 'জনতা উন্নয়ন পার্টি' বা জেইউপি (JUP)। কিন্তু নির্বাচন কমিশনে খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, এই একই নামে ইতিমধ্যেই অন্য একটি রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত (Registered) রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই নাম বদলের সিদ্ধান্ত নিতে হয় হুমায়ুনকে। দলীয় সূত্রে খবর, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর দলের নামের আগে 'আম' (Aam) শব্দটি যোগ করার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন। সেক্ষেত্রে দলের নতুন নাম হবে 'আম জনতা উন্নয়ন পার্টি' বা এজেইউপি (AJUP)।
দল গঠন এবং নাম নিয়ে এই আইনি জটিলতা থাকলেও, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে নিজের নতুন দল নিয়ে লড়াই করার বিষয়ে এখনও একশো শতাংশ অনড় রয়েছেন ভরতপুরের এই দাপুটে নেতা।
রাজনীতি বনাম পারিবারিক সম্পর্ক: কী বলছেন হুমায়ুন?
শ্বশুর এক দলের প্রতিষ্ঠাতা আর জামাই তাঁর কট্টর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শাসকদলের সম্ভাব্য প্রার্থী! এই নয়া রাজনৈতিক সমীকরণের ফলে কি পারিবারিক সম্পর্কে কোনও প্রভাব পড়বে?
এই প্রশ্নের উত্তরে যথেষ্ট পরিণত রাজনীতিকের মতোই জবাব দিয়েছেন হুমায়ুন কবীর। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে রাজনৈতিক জীবনের কোনো সংঘাত নেই। হুমায়ুনের কথায়, "ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে রাজনৈতিক জীবনের কোনও সম্পর্ক নেই। রাজনীতির জন্য আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক কোনোভাবেই ব্যাহত হবে না।"
তবে জামাইয়ের তৃণমূলে যোগদান নিয়ে এখনই খুব বেশি মুখ খুলতে নারাজ তিনি। হুমায়ুন বলেন, "ওরা আগে যোগ দিক, তারপরে আমি যা বলার মন্তব্য করব।" তবে একইসঙ্গে পুলিশি চাপের তত্ত্বও ফের একবার উসকে দিয়েছেন তিনি। তাঁর সংযোজন, "দীর্ঘ দিন ধরেই ওদের পরিবারের উপরে পুলিশ দিয়ে মারাত্মক চাপ তৈরি করা হচ্ছিল।"
শাসকদলের প্রতিক্রিয়া: "শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে"
এই গোটা ঘটনাক্রম নিয়ে স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব। হুমায়ুন কবীর দল ছাড়ার পর মুর্শিদাবাদে তাঁর যেটুকু প্রভাব ছিল, খোদ তাঁর পরিবারের সদস্যদের দলে টেনে সেই প্রভাবে কার্যত জল ঢেলে দিতে চাইছে শাসকদল।
এই প্রসঙ্গে মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন, "আমাদের এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনও রাজনৈতিক দলে যে কেউ যদি যোগ দেন, তবে তাকে দলের শক্তি বৃদ্ধি হিসেবেই ধরা হয়। রায়হান তৃণমূলে যোগ দিলে অবশ্যই আমাদের দলের শক্তি আরও বৃদ্ধি পাবে।" রায়হানের পরিচয় প্রসঙ্গে অপূর্ব সরকার অত্যন্ত কৌশলী জবাব দিয়ে বলেন, "সে কার আত্মীয়, বা কার ছেলে, সেটা রাজনীতিতে কোনো বড় বিষয় নয়। মূল কথা হল দলের প্রতি তাঁর আনুগত্য এবং লড়াই করার মানসিকতা।"
সব মিলিয়ে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক চিত্রনাট্য যে রীতিমতো জমে উঠেছে, তা বলাই বাহুল্য। একদিকে হুমায়ুন কবীরের 'আম জনতা উন্নয়ন পার্টি'-র ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে শাসকদলের টিকিটে জামাই রায়হানের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিষেক—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আগামী দিনে জেলার রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।
Tags:- #MurshidabadPolitics #HumayunKabir #TMC #WestBengalElection2026 #RaihanAli #AamJanataUnnayanParty #LalgolaConstituency #BengalPoliticalNews #ManusherBhasha #NewsDesk

0 মন্তব্যসমূহ