মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক কলকাতা, ২১ মার্চ ২০২৬
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: আসন্ন ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দামামা ইতিমধ্যেই বেজে গিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলি যখন ভোটের ময়দানে নিজেদের ঘুঁটি সাজাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের মনে ভিড় করছে চরম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে তারা নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন তো? গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই এই সংশয় আরও তীব্র হয়েছে। কারণ, সেই তালিকায় প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম 'বিবেচনাধীন' বা 'পেন্ডিং' অবস্থায় রাখা হয়েছিল।
তবে এবার সেই অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আগামী সোমবার অর্থাৎ পরশুদিন রাজ্যের প্রথম 'সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট' বা পরিপূরক ভোটার তালিকা প্রকাশিত হতে চলেছে। আর সবথেকে বড় স্বস্তির খবর হলো, এই তালিকায় যদি কোনও বৈধ ভোটারের নাম না থাকে বা বাদ যায়, তবে তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত বিশেষ 'ট্রাইবুনালে' আপিল করতে পারবেন। কীভাবে কাজ করবে এই ট্রাইবুনাল? সাধারণ মানুষ কীভাবে নিজেদের ভোটাধিকার ফিরে পেতে আবেদন করবেন? এই নিয়েই আজকের বিস্তারিত প্রতিবেদন।
হাইকোর্টের কড়া নির্দেশ, ১৯ জন প্রাক্তন বিচারপতিকে নিয়ে ট্রাইবুনাল গঠন
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রাজ্য রাজনীতিতে চরম ডামাডোল চলছিল। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস লাগাতার অভিযোগ করে আসছিল যে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। জল গড়ায় আদালত পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এই সমস্যার সমাধানে এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
গতকালই নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে নোটিফিকেশন বা বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে যে, ভোটারদের আপিল শোনার জন্য রাজ্যে বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। রাজ্যের ২৩টি জেলার জন্য মোট ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই গোটা প্রক্রিয়াটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং স্বচ্ছ রাখার জন্য ট্রাইবুনালগুলির মাথায় বসানো হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতিদের।
কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ১৯ জন প্রাক্তন বিচারপতির তালিকায় রয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি. এস. শিভগ্নানম (T.S. Sivagnanam), প্রাক্তন বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু-সহ আরও ১৭ জন স্বনামধন্য আইনি ব্যক্তিত্ব। এঁদের কড়া নজরদারিতেই চলবে নাম অন্তর্ভুক্তি বা বাতিলের চূড়ান্ত বিচারপ্রক্রিয়া।
নাম বাদ গেলে কীভাবে এবং কোথায় আপিল করবেন?
সাপ্লিমেন্টারি বা পরিপূরক ভোটার তালিকায় যদি আপনি দেখেন যে আপনার নাম 'ডিলিটেড' (Deleted) বা বাদ গিয়েছে, অথবা আপনার নাম আদৌ ওঠেনি, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। নির্বাচন কমিশন এবং ট্রাইবুনাল আপনাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং প্রমাণ পেশ করার পূর্ণ সুযোগ দিচ্ছে। আবেদন করার জন্য কমিশন দুটি উপায় রেখেছে—অনলাইন এবং অফলাইন।
১. অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি: যাঁরা প্রযুক্তির সঙ্গে সড়গড়, তাঁরা খুব সহজেই ঘরে বসে অনলাইনে নিজেদের আপিল নথিভুক্ত করতে পারবেন। এর জন্য দুটি মাধ্যম রয়েছে:
ইসিআই (ECI) নেট মোবাইল অ্যাপ: নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব অফিশিয়াল মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে ডাউনলোড করে সেখানে নিজের ভোটার কার্ডের তথ্য দিয়ে লগ-ইন করে আপিল করা যাবে।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট: সরাসরি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে (nvsp.in বা eci.gov.in) গিয়ে নির্দিষ্ট পোর্টালে প্রামাণ্য নথিপত্র আপলোড করে ট্রাইবুনালের কাছে আবেদন জানানো যাবে।
২. অফলাইনে আবেদনের পদ্ধতি: রাজ্যের প্রান্তিক এলাকার মানুষ বা যাঁরা অনলাইনে স্বচ্ছন্দ নন, তাঁদের সুবিধার্থে অফলাইন বা সশরীরে উপস্থিত হয়ে আবেদন করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক (District Magistrate / DM)-এর কার্যালয়ে গিয়ে আবেদন জমা দেওয়া যাবে।
অতিরিক্ত জেলাশাসক (Additional District Magistrate / ADM)-এর দপ্তরেও আপিল গ্রহণ করা হবে।
এছাড়াও মহকুমা স্তরে মহকুমা শাসক বা এসডিও (SDO)-র কাছে সরাসরি নিজেদের নথিপত্র সহ অফলাইন ফর্ম পূরণ করে আবেদন জমা দিতে পারবেন সাধারণ মানুষ।
আবেদন জমা পড়ার পর ট্রাইবুনাল দ্রুত সেই নথিপত্র খতিয়ে দেখবে এবং শুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
কবে, কীভাবে প্রকাশিত হবে তালিকা? নজর পরিসংখ্যানে
প্রাথমিকভাবে কমিশনের পরিকল্পনা ছিল প্রতি শুক্রবার করে এই সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করার। সেই অনুযায়ী গতকাল, অর্থাৎ শুক্রবারই প্রথম তালিকাটি বেরনোর কথা ছিল। কিন্তু আজ, শনিবার পবিত্র ইদ-উল-ফিতর (Eid) পালিত হচ্ছে। উৎসবের ছুটি এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির কারণে শুক্রবারের বদলে আগামী সোমবার প্রথম পরিপূরক তালিকাটি প্রকাশ করতে চলেছে নির্বাচন কমিশন।
এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহেই তালিকা প্রকাশ পাবে। কমিশন জানিয়েছে, সোমবার প্রথম তালিকার পর ওই সপ্তাহেরই শুক্রবার প্রকাশিত হবে দ্বিতীয় তালিকা। এরপর থেকে প্রতি শুক্রবার ধাপে ধাপে পরবর্তী সাপ্লিমেন্টারি লিস্টগুলি প্রকাশিত হবে, যা চূড়ান্ত ভোটার তালিকার সঙ্গে সংযোজিত হতে থাকবে।
এক নজরে এসআইআর (SIR) ও ভোটার তালিকার পরিসংখ্যান: রাজ্যের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর নিয়ে যে বিপুল জট তৈরি হয়েছিল, তার একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে:
প্রাথমিকভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া নামের সংখ্যা: ৭০ লক্ষ ৬৬ হাজার ৭৫ জন।
২৮শে ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত তালিকায় বিবেচনাধীন নাম: প্রায় ৬০ লক্ষ।
শুক্রবার পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া নামের সংখ্যা: ২৭ লক্ষ ২৩ হাজার।
এখনও নিষ্পত্তি না হওয়া নামের সংখ্যা: প্রায় ৩৩ লক্ষ।
প্রথম তালিকায় নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা: কমিশন সূত্রে খবর, যে ২৭ লক্ষের বেশি নামের নিষ্পত্তি হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ ভোটারের নাম বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে চিরতরে বাদ যেতে পারে।
এই ১০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়া নিয়েই আগামী দিনে ট্রাইবুনালে সবচেয়ে বেশি ভিড় উপচে পড়বে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা
ভোটার তালিকা নিয়ে কমিশনের এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই ময়দানে নেমে পড়েছে রাজ্যের যুযুধান দুই রাজনৈতিক শিবির। তৃণমূল বনাম বিজেপির রাজনৈতিক তরজায় সরগরম রাজ্য রাজনীতি।
শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে ইচ্ছাকৃতভাবে এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে সাধারণ মানুষকে চরম হয়রানির মুখে ফেলা হচ্ছে। তৃণমূলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, "ইলেকশন আসা পর্যন্ত কি এই প্রসেস কমপ্লিট হবে? এটা কি জাস্টিস বা ন্যায়বিচার দেওয়ার নামে নির্বাচন কমিশনের একটা ইনজাস্টিস বা অন্যায় চলছে না?" তৃণমূলের তরফ থেকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের দিকে আঙুল তুলে এক মারাত্মক অভিযোগ করা হয়েছে। ঘাসফুল শিবিরের দাবি, "নরেন্দ্র মোদীর অফিস থেকে ফোন করে করে যাকে পারছে থ্রেট (হুমকি) করছে, যাতে তারা ভয় পেয়ে যায়।"
অন্যদিকে, তৃণমূলের এই সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং 'হতাশার প্রলাপ' বলে উড়িয়ে দিয়েছে প্রধান বিরোধী দল বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের বক্তব্য, মানুষ ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বিজেপির এক রাজ্য নেতার কথায়, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে ইতিমধ্যে গৃহীত, পরীক্ষিত এবং পরিত্যক্ত। বাংলার মানুষ আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশ্বাস করেন না। এসব কথাবার্তা বলে উনি বাজার গরমের চেষ্টা করছেন, কিন্তু এগুলো আর হবে না।"
বিজেপি নেতৃত্বের চরম আত্মবিশ্বাসী দাবি, সাধারণ মানুষ তৃণমূলের এই কথায় আর কান দিচ্ছে না। মানুষ এই সবে আর আগ্রহী নয়। বিজেপির ওই নেতার ভাষায়, "মানুষ এখন শুধু অপেক্ষা করছে ইলেকশনের দিন ঘোষণার। কখন তাঁরা ভোটের লাইনে ঠেলে গিয়ে ইভিএম (EVM) মেশিনের সামনে দাঁড়াবেন এবং পদ্মফুল চিহ্নে বোতাম টিপে এই দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল সরকারটিকে বিসর্জন দেবেন। ২০২৬-এর নির্বাচন আসলে তৃণমূলের বিসর্জনের নির্বাচন।"
সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে, আগামী সোমবারের প্রথম সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ আরও কয়েক গুণ চড়তে চলেছে। যাদের নাম তালিকায় উঠবে, তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। কিন্তু যাঁদের নাম বাদ যাবে, তাঁদের জন্য ট্রাইবুনালের দরজা খোলা থাকলেও, ভোটের আগে সেই আইনি লড়াই কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রাক্তন বিচারপতিদের নিয়ে গঠিত এই ১৯টি ট্রাইবুনাল কি পারবে দ্রুততার সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষের আবেদনের নিষ্পত্তি করতে? নির্বাচন কমিশন কি পারবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে একটি ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা রাজ্যের মানুষকে উপহার দিতে? আর সর্বোপরি, এই লাখো ভোটারের ভবিষ্যৎ কি বাংলার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলকে সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেবে? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আগামী কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে। সাধারণ মানুষের চোখ এখন সোমবারের তালিকার দিকে।
(আপনার ভোটার তালিকায় নাম আছে কিনা, বা আপিল সংক্রান্ত কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে নির্বাচন কমিশনের টোল-ফ্রি নম্বর ১৯৫০-এ যোগাযোগ করতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের যেকোনো রাজনৈতিক খবর এবং নিখাদ বিশ্লেষণের জন্য চোখ রাখুন 'মানুষের ভাষা'-র নিউজ ডেস্কে।)
Tags: #WestBengalElection2026 #VoterListWB #ElectionCommission #CalcuttaHighCourt #VoterTribunal #SupplementaryVoterList #TMCvsBJP #BengalPolitics #VoterCardCorrection #ManusherBhasha #NewsDesk
0 মন্তব্যসমূহ