নিউজ ডেস্ক | মানুষের ভাষা
ভোটের দামামা বাজতেই রাজনীতির পারদ চরমে পৌঁছেছে বঙ্গভূমিতে। একদিকে শাসকদলের দুর্গ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের ক্ষমতা দখলের মরিয়া লড়াই। আর এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার সরাসরি চলে এল ‘পরিবারতন্ত্র’ বনাম ‘ভূমিপুত্র’ বিতর্ক। একদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যের শাসকদলকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে দাবি করলেন, তৃণমূল নেত্রীর একমাত্র লক্ষ্য নিজের ‘ভাইপো’কে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। ঠিক তখনই অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, "বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়া হবে না।" রাজনৈতিক তরজা, আক্রমণ ও পালটা আক্রমণের এই হাই-ভোল্টেজ নাটকীয়তা কার্যত প্রমাণ করে দিচ্ছে, আসন্ন নির্বাচন কতটা মহারণের চেহারা নিতে চলেছে।
শাহের নিশানায় ‘পরিবারতন্ত্র’, প্রতিশ্রুতি ‘ভূমিপুত্র’ মুখ্যমন্ত্রীর
বীরভূমের মাটি, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত, সেখান থেকেই নির্বাচনী প্রচারে ঝড় তোলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর ভাষণের ছত্রে ছত্রে ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ। রাজ্যের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ এবং শাসকদলের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টানার চেষ্টা করেন তিনি।
মঞ্চ থেকে বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে অমিত শাহ বলেন, "ভাই ও বোনেরা, দিদি চান তাঁর ভাইপো মুখ্যমন্ত্রী হোক। আপনারা আমাকে জোর গলায় বলুন, ভাইপোকে কি মুখ্যমন্ত্রী করা উচিত?" উপস্থিত জনতার গগনভেদী চিৎকারের মাঝেই তিনি নিজের বক্তব্যকে আরও ধারালো করে তোলেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি নাম না করলেও অমিত শাহের এই আক্রমণের নিশানায় যে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শাহের দাবি, তৃণমূল নেত্রী এবং তাঁর ভাইপো কখনোই বাংলার প্রকৃত উন্নয়ন করতে পারবেন না, কারণ তাঁদের ধ্যানজ্ঞান কেবল ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা। এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি নরেন্দ্র মোদীর ‘ভিশন’-এর কথা তুলে ধরেন। শাহের কথায়, "নরেন্দ্র মোদীজির লক্ষ্য হলো বাংলার যুবসমাজকে সমৃদ্ধ করা, আর দিদির লক্ষ্য নিজের ভাইপোকে মুখ্যমন্ত্রী করা।"
শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বহিরাগত’ তত্ত্ব খাড়া করে নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে আসছে। তৃণমূলের দাবি, দিল্লি বা গুজরাত থেকে আসা নেতারা বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বোঝেন না। এই বহুচর্চিত ‘বহিরাগত’ তত্ত্বের মোক্ষম জবাব এদিন বীরভূমের মাটি থেকেই দেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে এই প্রচারকে নস্যাৎ করে দিয়ে ঘোষণা করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কোনো ‘বহিরাগত’ হবেন না।
অমিত শাহ দৃপ্তকণ্ঠে বলেন, "অনেকে মিথ্যে রটাচ্ছে যে বাংলা নাকি দিল্লি থেকে চালানো হবে। আজ আমি গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুণ্যভূমি বীরভূমে দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছি, বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী বাংলাতেই জন্ম নেওয়া, বাংলায় পড়াশোনা করা এবং বাংলাভাষী একজন ভূমিপুত্রই হবেন।" এরপরই তৃণমূল নেত্রীর উদ্দেশে কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়ে তিনি বলেন, "তবে দিদি, আপনি খুশি হবেন না। সেই মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেস থেকে হবেন না, আপনার ভাইপোও হবেন না। তিনি হবেন ভারতীয় জনতা পার্টির একজন একনিষ্ঠ কর্মী।" শাহের এই ঘোষণার পর বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে প্রবল উন্মাদনা তৈরি হয়, তা রাজনৈতিক সমীকরণে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
‘বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও নয়’, প্রত্যাঘাত মমতার
অমিত শাহ যখন বীরভূম থেকে পরিবর্তনের ডাক দিচ্ছেন, তখন রাজ্যের অন্য প্রান্ত থেকে রীতিমতো রণংদেহী মূর্তিতে পালটা গর্জে ওঠেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর প্রতিটি শব্দে ছিল আপসহীন লড়াইয়ের বার্তা। মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তিনি কোনোভাবেই মাথা নত করবেন না।
জনসভা থেকে এক ইঞ্চি জমিও না ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি জমিও কাউকে ছাড়া হবে না। কোনো আপস নয়, মাথা নত করাও নয়।" তাঁর এই বক্তব্যের নিশানায় কেবল বিজেপি ছিল না, বরং সমান্তরালভাবে সিপিএম এবং কংগ্রেসকেও তীব্র আক্রমণ করেন তিনি। রাজ্যে বিরোধী জোটকে ‘জগাই-মাধাই-গদাই’ বলে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, "জগাই, মাধাই, গদাই—বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস, এদের কথা মাথায় রাখবেন। আর নির্দল বলে যাদের দেখছেন, মনে রাখবেন তাদের কোনো দল নেই, তারা আসলে ব্ল্যাক মানি হোয়াইট করার জন্য দাঁড়িয়েছে।"
রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সতর্কবার্তার নেপথ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক অঙ্ক। নির্বাচনে অনেক ক্ষেত্রেই নির্দল প্রার্থীরা শাসকদলের ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরায়। সেই ভোট কাটাকাটির অঙ্ক রুখতেই মমতা সাধারণ মানুষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি আবেদন করেন, "অনেকে অনেক সময় প্ররোচনা দেয়, কিন্তু সেই প্ররোচনায় পা দেবেন না। এই নির্বাচন একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ। এখানে কোনো মাথা নত হবে না, কোনো কম্প্রোমাইজ হবে না। মানুষের স্বার্থের কাছেই কেবল মাথা নত হবে। মনে রাখবেন, আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দলের স্বার্থ, আর দলের স্বার্থের চেয়ে মানুষের স্বার্থ অনেক বড়।"
ময়ূরেশ্বরে বোমার কারখানার অভিযোগ ও তৃণমূলকে হুঁশিয়ারি
রাজনৈতিক বাগযুদ্ধের পাশাপাশি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও এদিন সুর চড়ান অমিত শাহ। বিশেষ করে বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করার গুরুতর অভিযোগ আনেন।
অমিত শাহ দাবি করেন, "বিজেপি ও সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করার জন্য তৃণমূল কংগ্রেস ময়ূরেশ্বরকে বোমা ও বারুদের কারখানায় পরিণত করেছে।" ২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিজেপির কর্মীদের ওপর শাসকদলের তরফ থেকে অবর্ণনীয় অত্যাচার চালানো হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এরপরই রীতিমতো হুঁশিয়ারির সুরে তিনি তৃণমূলের ‘গুন্ডা’দের উদ্দেশে কড়া বার্তা দেন।
আসন্ন ২৩ এপ্রিলের ভোটগ্রহণের দিনের কথা উল্লেখ করে শাহ বলেন, "আমি আজ তৃণমূলের গুন্ডাদের স্পষ্ট বলে যাচ্ছি, ২৩ এপ্রিল নিজেদের ঘরের ভেতর বন্দি থাকবেন। তা না হলে ৫ মে প্রতিটি অপরাধীকে বেছে বেছে জেলের গরাদের পেছনে ঢোকানোর কাজ করা হবে।" কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চরম হুঁশিয়ারি রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন এই বক্তব্য বিজেপি কর্মীদের মনোবল বাড়াতে সাহায্য করেছে, অন্যদিকে শাসকদল এটিকে ‘ভীতি প্রদর্শন’ এবং ‘এজেন্সির অপব্যবহারের হুমকি’ হিসেবেই দেখছে।
বিশ্লেষণ: রাজনৈতিক সমীকরণ ও ভোট-ভবিষ্যৎ
‘মানুষের ভাষা’ নিউজ ডেস্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বাকযুদ্ধ নিছকই নির্বাচনী উত্তাপ নয়, বরং এটি দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং আখ্যানের সরাসরি সংঘাত।
প্রথমত, বিজেপির ‘পরিবারতন্ত্র’ তত্ত্ব বনাম তৃণমূলের ‘জননেত্রী’ ভাবমূর্তি। অমিত শাহ অত্যন্ত সুচারুভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে শাসকদলের অন্দরে এবং সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করতে চাইছেন। ভারতবর্ষের রাজনীতিতে ‘পরিবারতন্ত্র’ বিরোধী হাওয়া তুলে বিজেপি এর আগে বহু রাজ্যে সাফল্য পেয়েছে। বাংলাতেও সেই একই তাস খেলতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
দ্বিতীয়ত, ‘বহিরাগত’ বনাম ‘ভূমিপুত্র’ বিতর্ক। তৃণমূলের বহিরাগত তত্ত্ব বিজেপির জন্য যে একটি বড় অস্বস্তির কারণ ছিল, তা অমিত শাহের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট। সেই অস্বস্তি কাটাতেই তিনি তড়িঘড়ি বাংলার ভূমিপুত্রকে মুখ্যমন্ত্রী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছেন—একদিকে বাঙালির আবেগকে ছোঁয়া, অন্যদিকে দলের অন্দরে থাকা স্থানীয় নেতাদের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নকে উসকে দিয়ে দলকে আরও ঐক্যবদ্ধ করা।
তৃতীয়ত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিনা যুদ্ধে সূচ্যগ্র মেদিনী’ না ছাড়ার প্রতিজ্ঞা প্রমাণ করে যে, শাসকদল এবারের নির্বাচনকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবেই দেখছে। বাম-কংগ্রেস জোট এবং নির্দল প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তাঁর কড়া অবস্থান বুঝিয়ে দেয় যে, সংখ্যালঘু এবং নিজস্ব ভোটব্যাঙ্কে কোনো ধরনের বিভাজন তিনি বরদাস্ত করবেন না।
সব মিলিয়ে, নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, বাংলার রাজনৈতিক আকাশ তত বেশি মেঘাচ্ছন্ন এবং বিদ্যুৎগর্ভ হয়ে উঠছে। একদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির জুজু এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি, অন্যদিকে রাজ্যের জননেত্রীর আপসহীন লড়াইয়ের হুঙ্কার—আগামী দিনগুলিতে এই কুরুক্ষেত্রে শেষ হাসি কে হাসবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ইভিএমের বাক্সে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, বাংলার মানুষের রায় যে দিকেই যাক না কেন, এই বারের নির্বাচন স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্যতম মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
0 মন্তব্যসমূহ