BENGAL তো ঠিক আছে, বাংলা লইয়া কী করিব?
আমন্ত্রিত সম্পাদকীয়
লেখক - মুকুল রায় চৌধুরী , (শিক্ষক )
২১ শে ফেব্রুয়ারি , মাতৃভাষা দিবসে মানুষের ভাষা- র বিশেষ সম্পাদকীয় নিবন্ধ
সারাবছর এবং একুশে ফেব্রুয়ারির দিন বিশেষ করে এই কথাটা আলোচিত হয় যে, নতুন প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা বাংলা সাহিত্য পড়ে না। কথাটা পুরোপুরি ঠিক নয়।নতুন প্রজন্মের অনেকেই সিরিয়াস সাহিত্য পাঠক। আরও অনেকেই হতে পারত, সেই সম্ভাবনা নষ্ট করেছি আমরা বড়রাই। বিশেষ করে যাঁদের বয়স মোটামুটি ৫০-৬০, যাঁদের সন্তানদের বয়স কমবেশি ১৫-২৫ , তাঁরা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক ক্ষতি করলেন। এঁরা নিজেরা আট-নয়ের দশক জুড়ে সুকুমার,উপেন্দ্রকিশোর, সুনীল,সমরেশ,বুদ্ধদেব পড়ে বড় হলেন আর সন্তানকে শুধু রস্কিন বন্ড, সুধা মূর্তি, জে কে রাউলিং পড়ালেন। সত্যজিৎকে উপেক্ষা করা অসম্ভব বলে ফেলুদা পড়ালেন ইংরেজি অনুবাদে।
সন্তানকে ইংরাজি মাধ্যমে পড়ানোয় কোনও অন্যায়ই নেই, কিন্তু সন্তানের ইংরাজি বিদ্যায় দক্ষতার চেয়ে বেশি গর্বিত হলেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে চেষ্টকৃত অজ্ঞতায়। ইংরাজি শেখানোয় যত উদ্যোগ নিলেন, তার চেয়ে বেশি নিলেন বাংলা না শেখানোয়।ফলে, শিকড়হীন ভাসমান শ্যাওলার মত একটা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা সাহিত্যের মাধ্যমে ইউরোপের সমাজকে কিছুটা চেনে,অথচ নিজের সমাজ সম্পর্কে অজ্ঞ।দেশের মাটিতে এদের পা প্রোথিত নয়। সাহিত্য ছাড়া সমাজকে চেনা যায়না।
এঁদের নকল করছেন সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা অভিভাবকরা। তাঁরা শুনেছেন,সমাজে প্রচণ্ড কম্পিটিশন,তাই ৩০০--৩৫০ টাকা মূল্যের যতখুশি বাজার চলতি সহায়িকা কিনে দিতে প্রস্তুত,কিন্তু ২০ - ৩০ টাকার আনন্দমেলা,শুকতারা কেনা মানে অর্থ ও সময়ের অপচয়! ওসব পড়ে কি দুটো নম্বর বেশি পাবে বন্ধুর (না না ক্লাসমেট) চেয়ে ?
ইংরাজি জানা চকচকে ছেলে/মেয়েটার বাবা মা পাড়ার বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়েই শিক্ষার মই বেয়ে সমাজের ওপরের স্তরে উঠেছিলেন, কিন্তু আজ সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলো কার্যত রেশনদোকান,জামা জুতো, চাল,ডাল --- অনেক কিছুই সেখানে পাওয়া যায়,শুধু শিক্ষাটুকু বাদ।
ফলে, বাঙালিদের নতুন প্রজন্ম আড়াআড়ি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে : উচ্চকোটির বেঙ্গল আর নিম্নবর্গীয় বাংলায়। সমাজের উঁচুস্তরের একদল ঝকঝকে ছেলেমেয়ে, যারা বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষিত,দক্ষ,পড়াশোনাও বিস্তর কিন্তু বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন। অপর দিকে, এই বৃত্তের বাইরে রয়েছে কোটি কোটি ছেলেমেয়ে যারা অভিভাবকের কাছ থেকে জেনেছে, বাংলা সাহিত্য পড়ে,বাংলা মাধ্যমে পড়ে কিছুই হয়না,অথচ ইংরেজি পড়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি।এরা না ঘরের,না ঘাটের। মাথাকাটা সংখ্যামাত্র হয়ে মাঝখানে ঝুলে আছে এক কবন্ধপ্রজন্ম কেবল স্মার্ট ফোন, মোবাইল ডাটা আর ভিডিও গেমের ক্রেতা হয়ে।
এই চেতনাহীন স্কিলহীন কোটি কোটি জনসংখ্যা নিয়ে সমাজ স্ফীতউদর। এদের একমাত্র উপায় দৈহিক শ্রম। এদিকে প্রযুক্তি-উন্নত নতুন বিশ্বে যন্ত্র মানুষের দৈহিক শ্রমকে গ্রাস করতে দুয়ারে উপস্থিত।
তাহলে এখন উপায় ?

0 মন্তব্যসমূহ