Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

কড়া মেজাজে নির্বাচন কমিশন: ভবানীপুরে নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং 'সোনা পাপ্পু' কাণ্ডে সাসপেন্ড ডিসি, ওসি-সহ একাধিক পুলিশ কর্তা



মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: আসন্ন ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বেজে গিয়েছে। আর ভোট ঘোষণার পর থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন যে এবার রাজ্যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে আক্ষরিক অর্থেই 'জিরো টলারেন্স'  নীতি গ্রহণ করেছে, তা এবার হাতেনাতে প্রমাণ মিলল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চূড়ান্ত গাফিলতি এবং দাগি অপরাধীকে আড়াল করার মারাত্মক অভিযোগে রাজ্য পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকদের ওপর আছড়ে পড়ল নির্বাচন কমিশনের কড়া চাবুক।

হাই-ভোল্টেজ ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে (১৫৯-ভবানীপুর এসি) রোড-শো এবং মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় নজিরবিহীন অশান্তি এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায়ে কলকাতা পুলিশের সাউথ ডিভিশনের ডিসি-টু (DC-II) এবং আলিপুর থানার ওসি-সহ চারজন পুলিশ আধিকারিককে সরাসরি সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিল কমিশন। শুধু তাই নয়, পাশাপাশি কসবার কুখ্যাত দুষ্কৃতী তথা এলাকার ত্রাস 'সোনা পাপ্পু'-র নাম অপরাধীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অপরাধে কসবা থানার ওসি -কেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের এই অভাবনীয় কড়া পদক্ষেপে কার্যত ভূমিকম্প শুরু হয়েছে লালবাজার থেকে নবান্নের অন্দরে।

ভবানীপুরে চরম নিরাপত্তা ব্যর্থতা: কোপ পড়ল চার অফিসারের ওপর

মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক বলে পরিচিত ভবানীপুর বরাবরই রাজ্য রাজনীতির একটি অন্যতম ভরকেন্দ্র। সদ্য এই এলাকাতেই একটি মেগা রোড-শো এবং রাজনৈতিক প্রার্থীদের মনোনয়ন পেশের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেই হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুলিশ প্রশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতার ছবি প্রকাশ্যে আসে। রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে কলকাতা পুলিশ কার্যত ব্যর্থ হয়।

এই ঘটনার জেরে গত ৪ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সচিব সুজিত কুমার মিশ্র  সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে একটি কড়া চিঠি পাঠান (চিঠি নং: No.464/WB-LA/ES-II/2026)। চিঠির বিষয়বস্তুতেই স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে: "ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে রোড-শো এবং মনোনয়ন পর্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা— পুলিশ আধিকারিকদের সাসপেনশন এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।"

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের রিপোর্টের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন রাজ্যের মুখ্যসচিবকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় যে, অবিলম্বে এই ঘটনার দায়ভার গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট চার পুলিশ আধিকারিককে সাসপেন্ড করতে হবে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া শাস্তিমূলক বা বিভাগীয় পদক্ষেপ (Disciplinary Proceedings) শুরু করতে হবে।

যে চার পুলিশ আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে, তাঁরা হলেন:

১. শ্রী সিদ্ধার্থ দত্ত, ডিসি-টু, সাউথ ডিভিশন, কলকাতা পুলিশ (DC-II, South Division)

২. শ্রী প্রিয়ঙ্কর চক্রবর্তী, ওসি, আলিপুর থানা (OC, Alipore)

৩. শ্রী চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অ্যাডিশনাল ওসি, আলিপুর থানা (Additional OC, Alipore)

৪. শ্রী সৌরভ চট্টোপাধ্যায়, সার্জেন্ট, আলিপুর থানা (Sergeant, Alipore)

কমিশনের নির্দেশিকা এতটাই কড়া ছিল যে, চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়, ৫ এপ্রিল ২০২৬ সকাল ১১টার মধ্যে এই নির্দেশ কার্যকর করে কমিশনে 'কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট' (Compliance Report) জমা দিতে হবে। একইসঙ্গে এই শূন্য পদগুলি পূরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে নতুন আধিকারিকদের নামের প্রস্তাব পাঠাতেও বলা হয়েছে রাজ্য সরকারকে।



কসবার ওসি অপসারিত: নেপথ্যে সেই 'সোনা পাপ্পু'

ভবানীপুরের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নির্বাচন কমিশনের নজর গিয়ে পড়ে দক্ষিণ কলকাতার কসবা থানার ওপর। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনের একটি অত্যন্ত কড়া এবং স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকে যে, প্রতিটি থানাকে নিজেদের এলাকার সমস্ত দাগি অপরাধীদের একটি বিস্তারিত এবং আপডেটেড তালিকা  'হিস্ট্রি শিট' তৈরি করে কমিশনে জমা দিতে হবে। উদ্দেশ্য একটাই— ভোটের সময় এই সমস্ত বাহুবলী এবং দুষ্কৃতীরা যাতে কোনওভাবেই সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখাতে না পারে বা ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, তার আগাম ব্যবস্থা করা।

কিন্তু লালবাজার এবং কমিশন সূত্রে খবর, কসবা থানার ওসি এই নির্দেশিকা পালনে চরম গাফিলতি দেখিয়েছেন। শুধু গাফিলতিই নয়, একটি মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। কসবা, বালিগঞ্জ এবং ঢাকুরিয়া এলাকার অঘোষিত 'ত্রাস' এবং কুখ্যাত সিন্ডিকেট মাফিয়া বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে 'সোনা পাপ্পু'-র নাম কসবা থানার ওই অপরাধীদের তালিকা থেকে সম্পূর্ণভাবে উধাও ছিল!

উল্লেখ্য, এই সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে খুন, তোলাবাজি, বোমাবাজি-সহ একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রয়েছে। সম্প্রতি বেআইনি আর্থিক লেনদেন এবং রিয়েল এস্টেট সিন্ডিকেটে কালো টাকার খোঁজে এই সোনা পাপ্পুর বালিগঞ্জের বিলাসবহুল প্রাসাদ 'পোদ্দার হাউস'-এ দীর্ঘক্ষণ ম্যারাথন তল্লাশি চালিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। অথচ, এমন একজন হাই-প্রোফাইল দাগি অপরাধীর নামই কি না স্থানীয় থানার খাতায় নেই!

এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই চরম ক্ষুব্ধ হয় নির্বাচন কমিশন। একজন দাগি অপরাধীকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনও চাপের বশবর্তী হয়ে পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করার চেষ্টা করছে, এই সন্দেহ জোরালো হতেই কসবা থানার ওসি-কে তাঁর পদ থেকে অবিলম্বে অপসারণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

লালবাজারের অন্দরে তীব্র কম্পন এবং প্রশাসনিক অস্বস্তি

নির্বাচন কমিশনের এই জোড়া পদক্ষেপে এই মুহূর্তে কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর লালবাজারে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছে। সাধারণত নির্বাচনের আগে পুলিশ আধিকারিকদের বদলি (Transfer) একটি রুটিন প্রক্রিয়া। কিন্তু সাসপেনশন (Suspension) এবং তার সঙ্গে 'শাস্তিমূলক ব্যবস্থা' (Disciplinary Action) গ্রহণের নির্দেশ সচরাচর দেখা যায় না।

রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সাউথ ডিভিশনের ডিসি পদমর্যাদার একজন আইপিএস (IPS) স্তরের আধিকারিককে এভাবে সরাসরি সাসপেন্ড করার নির্দেশ দিয়ে নির্বাচন কমিশন আসলে রাজ্যের নিচুতলার পুলিশ কর্মীদের কাছে একটি অত্যন্ত কড়া বার্তা পৌঁছে দিল। বার্তাটি হলো— ভোটের সময় পুলিশের ইউনিফর্মের আড়ালে কোনও রকম দলদাসত্ব, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব বা কর্তব্যে গাফিলতি বিন্দুমাত্র বরদাস্ত করা হবে না।

ভবানীপুরের মতো ভিভিআইপি এলাকায় যেখানে খোদ হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনা, সেখানে রোড-শোয়ের আগে কেন পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যারিকেড বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হলো না? কেন স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা গোয়েন্দা দপ্তর আগে থেকে অশান্তির আঁচ করতে পারল না? এই প্রশ্নগুলোই এখন পুলিশ মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। অন্যদিকে, কসবা থানার ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, স্থানীয় স্তরে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মদতে কীভাবে দাগি দুষ্কৃতীরা পুলিশের খাতায় 'নির্দোষ' সেজে ঘুরে বেড়ায়।

অবাধ নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশনের কড়া বার্তা

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী পঞ্চায়েত নির্বাচনে হিংসার যে ভয়াবহ রূপ বাংলা দেখেছিল, ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে তার পুনরাবৃত্তি যাতে কোনোভাবেই না ঘটে, সে বিষয়ে বদ্ধপরিকর নির্বাচন সদন।

দিল্লি থেকে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের সচিবের সই করা চিঠি রাজ্যের মুখ্যসচিবের টেবিলে পৌঁছনো এবং ডেডলাইন বেঁধে দিয়ে অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট তলব করা প্রমাণ করছে যে, রাজ্য প্রশাসনের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাটন থাকলেও, রাশ যে পুরোপুরি কমিশনের হাতেই রয়েছে।

বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছিল যে, রাজ্যের একাংশ পুলিশ আধিকারিক শাসকদলের ক্যাডারের মতো আচরণ করছেন। দাগি দুষ্কৃতীদের দিয়ে ভোট করানোর একটি অলিখিত নকশা তৈরি করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ বিরোধীদের সেই অভিযোগকেই যেন সিলমোহর দিল। বিরোধী দলগুলির দাবি, নির্বাচন কমিশনের এই সাহসী পদক্ষেপে সাধারণ ভোটারদের মনে পুলিশ এবং প্রশাসনের ওপর হারানো আস্থা কিছুটা হলেও ফিরে আসবে।

পরিশেষ: সাধারণ মানুষের মনে প্রত্যাশা

কলকাতা শহরের বুকে একদিনে এত বড় স্তরের পুলিশ কর্তাদের বিরুদ্ধে এমন কড়া পদক্ষেপ এর আগে খুব কমই দেখা গিয়েছে। ডিসি, ওসি এবং সার্জেন্ট র‍্যাঙ্কের আধিকারিকদের এই পরিণতি দেখে রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তের পুলিশ আধিকারিকরাও যে এখন অনেক বেশি সতর্ক হয়ে পা ফেলবেন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন, এই কড়াকড়ি কি নির্বাচনের দিন পর্যন্ত বজায় থাকবে? সোনা পাপ্পুর মতো বাহুবলীদের পুলিশের খাতায় নাম তুলে তাদের কি ভোটের আগে গারদে পোরা হবে? ভবানীপুরের মতো হাই-ভোল্টেজ কেন্দ্রে কি সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন?

উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের গর্ভে। তবে নির্বাচন কমিশন যে এবার মাঠে নেমে 'ফ্রন্টফুট'-এ খেলছে, তা এই প্রশাসনিক রদবদল এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। আগামী দিনগুলোতে কমিশনের নজরদারিতে রাজ্য রাজনীতি এবং পুলিশ প্রশাসনে আর কী কী রদবদল আসে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর থাকবে গোটা বাংলার।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code