Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোটার তালিকা সংশোধনে যুগান্তকারী পদক্ষেপ: এসআইআর-এর দশম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ, নিষ্পত্তি ৫৭ লক্ষ নামের, বাকি ৩ লক্ষ


 মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: শিয়রে নির্বাচন, আর তার আগেই রাজ্যের ভোটার তালিকা  নিয়ে সমস্ত রকম জল্পনা, অভিযোগ এবং বিতর্কের অবসান ঘটাতে বদ্ধপরিকর জাতীয় নির্বাচন কমিশন । রাজ্যে অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ নির্বাচন সুনিশ্চিত করার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হলো একটি ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা। সেই লক্ষ্যেই দেশজুড়ে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার কাজ চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। এবার সেই প্রক্রিয়ারই এক বিরাট মাইলফলক পার করল কমিশন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, এসআইআর-এর দশম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা  ইতিমদধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে এবং এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫৭ লক্ষ 'বিবেচনাধীন'  নামের ভাগ্য নির্ধারণ বা নিষ্পত্তি সম্পন্ন হয়েছে।

এই বিশাল পরিসংখ্যান একদিকে যেমন নির্বাচন কমিশনের তৎপরতাকে প্রমাণ করে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যের ভোটার তালিকা নিয়ে যে কতটা জটিলতা ছিল, সেই দিকটিও সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে। নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ আধিকারিকদের বয়ান এবং সুপ্রিম কোর্টের  কড়া নির্দেশিকাকে পাথেয় করে এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ার একটি বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্কের হাতে।

পরিসংখ্যানের নিরিখে এসআইআর: ৫৭ লক্ষ নিষ্পত্তি, বাকি ৩ লক্ষ

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়ার অধীনে রাজ্যে মোট প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম 'বিবেচনাধীন' বা 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন'  তালিকায় রাখা হয়েছিল। এই ভোটারদের নাগরিকত্ব, স্থায়ী ঠিকানা বা ভোটাধিকারের বৈধতা নিয়ে বিভিন্ন স্তরে সংশয় বা অভিযোগ ছিল।

কমিশনের এক শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন, "আমরা এসআইআর-এর দশম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ করেছি। একটি অত্যন্ত দীর্ঘ এবং জটিল আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫৭ লক্ষ বিবেচনাধীন নামের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি  করা সম্ভব হয়েছে। এই মুহূর্তে নিষ্পত্তির জন্য বাকি রয়েছে আর মাত্র প্রায় ৩ লক্ষ নাম।"

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই করে তার নিষ্পত্তি করা ভারতীয় নির্বাচনী ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। বাকি থাকা এই ৩ লক্ষ নামের ভবিষ্যৎও আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে যাবে বলে আশাবাদী কমিশন।

কেন জুডিশিয়াল অফিসার? সুপ্রিম কোর্টের নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ

এসআইআর প্রক্রিয়ায় এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া বা বিবেচনাধীন তালিকায় থাকা নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সম্প্রতি তুমুল বিক্ষোভ এবং অশান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকেই অভিযোগ তুলেছিলেন যে, স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাজ করছেন এবং বৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিচ্ছেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই হস্তক্ষেপ করে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।

নির্বাচন কমিশনের ওই আধিকারিক বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, "যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে বা বিবেচনাধীন ছিল, সেই পুরো বিষয়টিই এখন 'জুডিশিয়াল অ্যাডজুডিকেশন'-এর মাধ্যমে হচ্ছে। এর আগে আমাদের যে নির্দেশিকা ছিল, সেই অনুযায়ী কাজ হচ্ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে একাধিক মানুষ এই বিষয়ে অভিযোগ জানাতে গিয়েছিলেন। সুপ্রিম কোর্ট গোটা পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে।"

আধিকারিক আরও জানান, সুপ্রিম কোর্ট উপলব্ধি করেছিল যে রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ নয়, বরং এটি একটি 'এক্সট্রা অর্ডিনারি'  বা নজিরবিহীন পরিস্থিতি। সাধারণ সরকারি অফিসার বা বিএলও -দের র‍্যাঙ্ক এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে যখন বারবার প্রশ্ন উঠছিল এবং ভুরি ভুরি অভিযোগ জমা পড়ছিল, তখন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। শীর্ষ আদালত নির্দেশ দেয় যে, সাধারণ অফিসারদের দিয়ে নয়, এই গোটা অ্যাডজুডিকেশন বা আইনি নিষ্পত্তির কাজ সম্পন্ন করতে হবে জুডিশিয়াল অফিসারদের অর্থাৎ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের দিয়ে।

'ল অফ দ্য ল্যান্ড' এবং 'জুডিশিয়াল মাইন্ড'-এর প্রয়োগ

সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পরেই নির্বাচন কমিশন গোটা প্রক্রিয়ার খোলনলচে বদলে ফেলে। জুডিশিয়াল অফিসাররা কীভাবে এই এসআইআর প্রক্রিয়ার কাজ করবেন, তার জন্য সুপ্রিম কোর্টের তরফ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা নির্দেশিকাও বেঁধে দেওয়া হয়।

নির্বাচন কমিশনের আধিকারিক অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন, "অ্যাডজুডিকেশনের পর যে কিছু নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তা সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়্যামাফিক হয়েছে। জুডিশিয়াল অফিসাররা নিজেদের বিচারবিভাগীয় প্রজ্ঞা বা 'জুডিশিয়াল মাইন্ড' প্রয়োগ করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁরা যে কাজ করেছেন তা সম্পূর্ণভাবে দেশের আইন বা 'ল অফ দ্য ল্যান্ড' অনুযায়ী করা হয়েছে। এখানে কারোর ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি বা রাজনৈতিক স্বার্থের কোনো জায়গা নেই।"

অর্থাৎ, কমিশন স্পষ্ট করে দিতে চাইছে যে, যে ৫৭ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হয়েছে, তা কোনো সাধারণ আমলার নির্দেশে হয়নি। বরং প্রতিটি কেস খুঁটিয়ে দেখে, উপযুক্ত প্রমাণ এবং আইনি মাপকাঠিতে বিচার করার পরেই নাম রাখা বা বাদ দেওয়ার মতো চূড়ান্ত এবং কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বিচারকরা।

বিক্ষোভ বা 'অ্যাজিটেশন' নয়, খোলা রয়েছে আপিল ট্রাইব্যুনাল

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন ব্লকে বিডিও অফিস ঘেরাও, বিক্ষোভ প্রদর্শন বা আধিকারিকদের হেনস্থা করার মতো যে ঘটনাগুলি সম্প্রতি ঘটেছে, সেই বিষয়েও কড়া বার্তা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের বক্তব্য, একটি আইনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখানোটা সম্পূর্ণ অর্থহীন এবং অপ্রয়োজনীয়।

আধিকারিকের কথায়, "জুডিশিয়াল অফিসারদের কাজের ওপর এই ধরনের অ্যাজিটেশন বা বিক্ষোভ দেখানোর কোনো যৌক্তিকতা বা প্রয়োজন নেই। কারণ এটি একটি বিচারবিভাগীয় সিদ্ধান্ত। সুপ্রিম কোর্ট নিজেই এই কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে।"

তবে কি কোনো বৈধ নাগরিকের নাম ভুলবশত বাদ গেলে তাঁর আর কোনো উপায় নেই? কমিশন এই প্রশ্নেরও একটি সদুত্তর দিয়েছে। যদি কোনো নাগরিক মনে করেন যে তিনি উপযুক্ত এবং বৈধ ভোটার  হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নাম ভুলবশত বাদ গিয়েছে, অথবা ইসিআই -এর নজরে এমন কোনো নাম থেকে যায় যা আদৌ তালিকায় থাকার যোগ্য নয়, তবে তার জন্য আইনি পথ খোলা রয়েছে।

কমিশনের আধিকারিক আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, "যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে এবং যাঁরা মনে করছেন তাঁদের প্রতি অবিচার হয়েছে, তাঁরা সরাসরি আপিল করতে পারেন। এর জন্য আপিল ট্রাইব্যুনালের  কাজ আগামী এক থেকে দু'দিনের মধ্যেই পুরোদমে শুরু হয়ে যাচ্ছে।" অর্থাৎ, বিক্ষোভের রাস্তায় না হেঁটে সাধারণ মানুষকে আইনি পথে ট্রাইব্যুনালে নিজেদের প্রমাণ জমা দিয়ে ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন।

ভোটমুখী বাংলায় ভোটার তালিকা ঘিরে রাজনৈতিক তরজা

এসআইআর প্রক্রিয়ার এই দশম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষিত রয়েছে। গত কয়েক মাস ধরেই রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে ভোটার তালিকা নিয়ে তীব্র দড়ি টানাটানি চলছে। বিরোধী দলগুলির— বিশেষ করে বিজেপি, সিপিএম এবং কংগ্রেসের— দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, শাসকদল নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত রাখতে সীমান্ত লাগোয়া জেলাগুলি থেকে শুরু করে খাস কলকাতাতেও লক্ষ লক্ষ 'ভুয়ো ভোটার', মৃত ব্যক্তি এবং অনুপ্রবেশকারীর নাম ভোটার তালিকায় ঢুকিয়ে রেখেছে।

অন্যদিকে, রাজ্যের শাসকদলের পালটা অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে বিরোধী দলগুলি ছলেবলে কৌশলে বেছে বেছে নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের এবং রাজ্যের আদি বাসিন্দাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র করছে।

এই চরম রাজনৈতিক অবিশ্বাসের আবহে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ এবং জুডিশিয়াল অফিসারদের দিয়ে এই ৫৭ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি কার্যত একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারকদের নজরদারিতে হওয়া এই 'ক্লিনআপ ড্রাইভ' বা শুদ্ধিকরণ অভিযান রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনের স্বচ্ছতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এতে ভুয়ো ভোট পড়ার সম্ভাবনা যেমন কমবে, তেমনই প্রকৃত নাগরিকদের অধিকারও সুনিশ্চিত হবে।

বাকি ৩ লক্ষ নামের দিকে নজর

৫৭ লক্ষ নামের নিষ্পত্তি হলেও এখনও যে ৩ লক্ষ নাম বিবেচনাধীন রয়েছে, তাদের দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে যে, অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বাকি কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। আপিল ট্রাইব্যুনালগুলি কাজ শুরু করলে, যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে তাঁরা পুনরায় নিজেদের দাবি জানানোর সুযোগ পাবেন।

সব মিলিয়ে, আসন্ন হাই-ভোল্টেজ নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই এসআইআর প্রক্রিয়া প্রমাণ করছে যে, গণতন্ত্রের এই লড়াইয়ে নির্বাচন কমিশন এবার বিন্দুমাত্র জমি ছাড়তে নারাজ। 'ল অফ দ্য ল্যান্ড' বা দেশের আইনের শাসনকে সামনে রেখে একটি নির্ভুল ভোটার তালিকা উপহার দেওয়াই এখন কমিশনের একমাত্র লক্ষ্য।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code