মাঝ-আকাশে ছুরির আঘাতেও হার মানেননি মুম্বইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার, ককপিটের দরজা খুলে বাঁচালেন ১৭৪ জনের প্রাণ
মানুষের ভাষা (ওয়েব ডেস্ক)
সারাংশ: দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটে ককপিটের ভেতর সহকর্মী পাইলটের ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হয়েও বিমানটিকে বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। আহত অবস্থাতেই তিনি ককপিটের দরজা খুলে দেন। যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা ভেতরে ঢুকে অভিযুক্ত কো-পাইলটকে আটকান। বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করে। ক্যাপ্টেন এখন হাসপাতালে, অবস্থা স্থিতিশীল। ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে।
বিশ্বজুড়ে ভারতীয় বীরের বন্দনা : ৩৫ হাজার ফুট উঁচুতে রক্তক্ষয়ী লড়াই: জীবন বাজি রেখে ১৭৪ প্রাণ বাঁচালেন মুম্বইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার
আকাশে ওঠার পর একটি যাত্রীবিমানের শত শত মানুষ ভরসা রাখেন সামনের ককপিটে বসা দুজন মানুষের ওপর। বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর সেই ককপিটের ভেতরেই ঘটে গেল এমন এক ঘটনা, যা বিশ্বের বিমান চলাচলের ইতিহাসে বিরল। দুবাই থেকে ইজরায়েলের তেল আভিভের উদ্দেশে রওনা দেওয়া ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড ১০৭৩ ফ্লাইটে ছুরিকাহত হয়েও বিমানকে নিয়ন্ত্রণে রেখে শত শত প্রাণ বাঁচালেন মুম্বইয়ের ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ভারত, ইজরায়েল ও আমেরিকার শীর্ষ নেতারা তাঁকে 'নায়ক' বলে অভিবাদন জানাচ্ছেন।
বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটিতে সেদিন ছিলেন ১৭৪ জন যাত্রী, যাঁদের মধ্যে ২৭ জন শিশু। দুবাই থেকে ওড়ার পর কয়েক ঘণ্টা সবকিছু স্বাভাবিকই চলছিল। বিমান যখন জর্ডনের আকাশসীমার কাছাকাছি, তখন আচমকা বিমানের ভেতর থেকে বিপদসংকেত যেতে শুরু করে। এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোলের রাডারে প্রথমে ধরা পড়ে সাধারণ জরুরি অবস্থার কোড '৭৭০০'। তার পরেই ফুটে ওঠে '৭৫০০', যা আন্তর্জাতিকভাবে বিমান ছিনতাই বা বেআইনি হস্তক্ষেপের সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাই পরে নিশ্চিত করেছে যে ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে হাতাহাতি বা সংঘর্ষের সময়েই এই সংকেত চালু হয়। সংস্থার বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ফ্লাইট ডেকের ভেতরের 'অল্টারকেশন' বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ককপিটে থাকা ফার্স্ট অফিসার অর্থাৎ কো-পাইলট তাঁকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন এবং তারপর বিমানটি ভূপাতিত করার চেষ্টা চালান। ইজরায়েলের বিমানবাহিনীর বরাত দিয়ে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ওই কো-পাইলট ওমানের নাগরিক। আঘাতের পরেই বিমানটি দ্রুত নিচের দিকে নামতে শুরু করে। আই-টোয়েন্টিফোর নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম জরুরি সংকেত পাঠানোর আগেই বিমানটি ৩০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে ১৪ হাজার ফুটেরও বেশি নেমে যায়। তবে অন্য কিছু প্রতিবেদনে উচ্চতার হিসেব কিছুটা ভিন্ন। সেগুলিতে বলা হয়েছে, বিমান প্রায় ৩৪ হাজার ফুট থেকে নেমে প্রায় ৯০ সেকেন্ডে ১৯ হাজার ফুটের কাছে পৌঁছয়। নিখুঁত তথ্য মিলবে সরকারি তদন্ত রিপোর্টে। কেবিনের ভেতরে তখন কী অবস্থা, তা এক যাত্রীর বর্ণনায় উঠে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, বিমান হঠাৎ নামতে শুরু করায় চারদিকে চিৎকার, ছোটাছুটি আর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এই সংকটের মুহূর্তেই নির্ণায়ক ভূমিকা নেন ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। গুরুতর জখম এবং প্রচুর রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও তিনি প্রতিরোধ চালিয়ে যান এবং ককপিটের দরজা খুলে দেন। ৯/১১-র পর বিমানের ককপিটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ রাখার নিয়ম আরও কড়া করা হয়েছে, ফলে ভেতর থেকে খুলে না দিলে বাইরের কারও পক্ষে ঢোকা প্রায় অসম্ভব। ক্যাপ্টেনের এই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় পরিস্থিতি। দরজা খুলতেই যাত্রী ও কেবিন ক্রুরা ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং সম্মিলিত চেষ্টায় অভিযুক্ত কো-পাইলটকে আটকে ফেলেন। ইজরায়েলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজন ইজরায়েলি যাত্রী এই কাজে এগিয়ে এসেছিলেন। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই যাত্রীদের সাহসের প্রশংসা করেছেন। বিমানে সাধারণ যাত্রী হিসেবে থাকা ফ্লাইদুবাইয়ের আরও কয়েকজন পাইলট পরে বিমানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন। তাঁদের হাতেই বিমানটি স্থিতিশীল হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে ইজরায়েলের সামরিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলি দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিমানটিকে ঘুরিয়ে নেওয়া হয় উত্তর-পশ্চিম সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরের দিকে, যেখানে সেটি নিরাপদে অবতরণ করে। অবতরণের পর সৌদি কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত কো-পাইলটকে গ্রেপ্তার করে। আহত ক্যাপ্টেন এবং কো-পাইলট দুজনকেই ভর্তি করা হয় তাবুকের হাসপাতালে। ক্যাপ্টেন স্মিতের অস্ত্রোপচার হয়েছে বলে জানা গেছে। রিয়াধে ভারতীয় দূতাবাস ও জেড্ডার কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, তিনি স্থিতিশীল আছেন এবং চিকিৎসা চলছে। তাঁর পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ফ্লাইদুবাই তাবুকে একটি বিকল্প বিমান পাঠায় এবং সেটিতে চড়ে যাত্রীরা বুধবারই নিরাপদে তেল আভিভে পৌঁছন।
Image- Lokmat.comপ্রশংসার বন্যা বয়ে গেছে দেশে-বিদেশে। বৃহস্পতিবার ভোরে এক্স-এ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লেখেন, 'ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার একজন নায়ক।' তিনি আরও লেখেন, চরম বিপদের মুখে এবং গুরুতর আহত হয়েও ক্যাপ্টেন যে সাহস ও মানুষের প্রাণ বাঁচানোর সংকল্প দেখিয়েছেন, তাতে শত শত প্রাণ রক্ষা পেয়েছে এবং এক বড় ট্র্যাজেডি এড়ানো গেছে। বৃহস্পতিবারই প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেনের স্ত্রী ও বাবা-মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলে সূত্রের খবর। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এক্স-এ ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে স্যালুট জানিয়ে তাঁর 'অসাধারণ সাহসের' প্রশংসা করেন। তাঁর অফিসের বিবৃতিতে বলা হয়, ছুরিকাহত হয়েও ক্যাপ্টেন প্রতিরোধ করেছেন, ককপিটের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং তাতেই যাত্রী ও ক্রুরা হামলাকারীকে কাবু করতে পেরেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাঁকে 'নায়ক' বলেছেন। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং ভারতে ইজরায়েলের রাষ্ট্রদূত রুভেন আজারও ক্যাপ্টেনের প্রশংসা করেছেন। ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় সাংবাদিক, অভিনেতা ও ক্রীড়াব্যক্তিত্বরা একযোগে তাঁকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কেন এমন ঘটনা ঘটল। এ নিয়ে এখনও কোনও সরকারি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। ইজরায়েলি কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে একে সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হামলা বলে মনে করছেন। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাটজ একে জঙ্গি হামলার চেষ্টা বলে বর্ণনা করেছেন। তবে সংবাদ সংস্থা সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দাবির সমর্থনে তিনি কোনও প্রমাণ দেননি। এখনও পর্যন্ত কোনও দেশ বা সংগঠন ঘটনার দায় স্বীকার করেনি। ইজরায়েলের মোসাদ, শিন বেট, সেনাবাহিনী ও পরিবহণ মন্ত্রক তদন্তে যুক্ত। ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মুখপাত্র জানিয়েছেন, সৌদি আরবের তদন্তও চলছে। নেতানিয়াহু বলেছেন, অভিযুক্তকে শিগগিরই দুবাইতে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, অভিযুক্ত একা কাজ করেছিলেন কি না এবং তাঁর আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।
ফ্লাইদুবাই জানিয়েছে, এই ঘটনার কারণ ও উদ্দেশ্য এখনও অজানা এবং তা আনুষ্ঠানিক তদন্তের বিষয়। সংস্থা সবাইকে অকারণ জল্পনা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছে। তদন্তের সুবিধার জন্য ইজরায়েলগামী ও ইজরায়েল থেকে আসা সব ফ্লাইদুবাই ফ্লাইট আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ফ্লাইদুবাইয়ের মালিকানা দুবাই সরকারের হাতে। ফলে বিমান নিরাপত্তা নিয়ে এই ঘটনা শুধু ইজরায়েল-যাত্রার প্রশ্ন নয়, গোটা বিমান শিল্পের কাছেই একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। পাইলটদের মানসিক ও পেশাগত যাচাই, ককপিটে আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি অবস্থায় ককপিটে প্রবেশের নিয়ম, এসব নিয়ে বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কে এই স্মিত মাচ্ছার? প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি মুম্বইয়ে জন্মানো ভারতীয় বাণিজ্যিক পাইলট। তাঁর পরিবার মুম্বইয়ের ঘাটকোপার পূর্ব এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে স্নাতক হওয়ার পর পাইলট হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তিনি নিউজিল্যান্ডে উড়ান প্রশিক্ষণ নেন। পরে ভারতে ফিরে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় স্পাইসজেটে কাজ করেন। সেখানে তিনি কমান্ডার পদে উন্নীত হন এবং বোয়িং ৭৩৭ উড়িয়ে হাজার হাজার ঘণ্টার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ২০২২ সালে তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগ দেন। একাধিক প্রতিবেদনে তাঁর মোট উড়ানের অভিজ্ঞতা প্রায় ৯,৭৫০ ঘণ্টা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্পাইসজেট তাদের এই প্রাক্তন কমান্ডারকে 'গর্বের' বলে অভিবাদন জানিয়েছে। প্রতিবেশী ও পরিচিতদের কাছে তিনি শান্ত ও অমায়িক মানুষ হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিমানচালনায় একটি কথা প্রায়ই বলা হয়, ক্যাপ্টেনের প্রথম ও শেষ দায়িত্ব যাত্রীদের নিরাপত্তা। নিজের শরীরে গভীর আঘাত নিয়েও সেই দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি স্মিত মাচ্ছার। একটিমাত্র সিদ্ধান্ত, ককপিটের দরজা খুলে দেওয়া, আর তার পরেই যাত্রী ও ক্রুদের সম্মিলিত সাহস। ১৭৪ জন মানুষ পরিবারের কাছে ফিরলেন এই দুইয়ের জোরেই। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা ক্যাপ্টেনের জন্য এখন গোটা দেশের প্রার্থনা, তিনি যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। তদন্তের পরবর্তী তথ্য প্রকাশ্যে এলে এই প্রতিবেদন হালনাগাদ করা হবে।
ট্যাগস: #FlyDubai #FZ1073 #CaptainSmitMachchhar #SmitMachchhar #IndianPilotHero #DubaiTelAviv #TabukEmergencyLanding #Boeing737MAX8 #NarendraModi #Netanyahu #MumbaiPilot #AviationSafety #CockpitIncident #ManusherBhasha



0 মন্তব্যসমূহ