বারুইপুর কাণ্ডে কড়া পদক্ষেপ প্রশাসনের: ইন্দ্রজিতের মৃত্যু 'পরিকল্পিত খুন', নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগে সরব মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু
সংক্ষিপ্তসার: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের সূর্যপুরে নাবালিকা নির্যাতন ও পরবর্তী উত্তেজনায় নির্দোষ অটোচালক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনায় কড়া প্রশাসনিক অবস্থান নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে এই ঘটনাকে নিছক 'গণপিটুনি' নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করেছেন তিনি। এই নৃশংস ঘটনার নেপথ্যে নির্বাচনে পরাজিত শক্তি, অতিবাম ও উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলির গভীর ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে অভিযোগ তাঁর। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে পুলিশ ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে মোট ৩৮ জনকে গ্রেফতার করেছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্য, পাকা বাড়ি মেরামত এবং সরকারি চাকরির একগুচ্ছ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন তিনি। পাশাপাশি, ফুলতলার অশান্তিতে মৃত প্রসেনজিৎ বিশ্বাসের পরিবারকেও ১০ লক্ষ টাকা সাহায্য দেওয়া হচ্ছে।
মানুষের ভাষা , নিজস্ব সংবাদদাতা, বারুইপুর: দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের সূর্যপুরে উন্মত্ত জনতার মারধরে নিহত অটোচালক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মৃত্যু নিছক কোনও স্বতঃস্ফূর্ত আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড। শনিবার নিহতের জীর্ণ বাসভবনে গিয়ে শোকার্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে এই বিস্ফোরক দাবি করেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে পরাজিত শক্তির উস্কানি এবং অতিবাম ও উগ্র মৌলবাদী শক্তিগুলির গভীর ষড়যন্ত্র এই নৃশংস ঘটনার নেপথ্যে সক্রিয় থাকতে পারে। রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাঁর ‘জিরো-টলারেন্স’ বা আপসহীন নীতির নজির স্থাপন করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, হাত-পা বেঁধে পিটিয়ে মারার এই জঘন্য অপরাধে যুক্ত থাকা খুনিদের সঙ্গে কোনওরকম আপস বা 'পেয়ার-মহব্বত' বরদাস্ত করা হবে না।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৪ জুলাই। সূর্যপুর এলাকা থেকে এক নাবালিকা আচমকা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ৫ জুলাই রবিবার সকালে স্থানীয় একটি পুকুর থেকে তার ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। অভিযোগ ওঠে, নাবালিকাকে নির্মমভাবে অত্যাচার ও খুন করা হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদে গোটা এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায় এবং রাস্তা অবরোধ করে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে উত্তেজিত জনতা। সেই চরম উত্তেজনার আবহে সম্পূর্ণ সন্দেহের বশে এবং ভুল বোঝাবুঝির জেরে স্থানীয় যুবক তথা অটোচালক ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলকে নৃশংসভাবে মারধর করে একদল উগ্র মানুষ, যার জেরে পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যু হয়। গত মঙ্গলবারই বারুইপুরে এসে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, নিহত ইন্দ্রজিৎ সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলেন। শনিবার তাঁর সেই বক্তব্যের রেশ টেনেই দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আশ্বাস দিলেন প্রশাসনিক প্রধান।
শনিবার বারুইপুরে ইন্দ্রজিতের জীর্ণ বাসভবনে পৌঁছে তাঁর প্রবীণ বাবা-মায়ের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি পরিবারটিকে সর্বতোভাবে সুরক্ষিত করতে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করেন তিনি। রাজ্য সরকারের তরফে এদিন নিহতের বাবা-মায়ের হাতে ২৫ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্যের চেক তুলে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি নিহতের দাদা বাপি মণ্ডলকে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি দেওয়া হয়েছে, যার পোস্টিং হবে স্থানীয় সূর্যপুর পুলিশ ফাঁড়িতেই। এর ফলে পরিবারটি নির্দিষ্ট মাসিক বেতনের মাধ্যমে একটি স্থায়ী আয়ের পথ পাবে।
প্রশাসনের মানবিক মুখ তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, দাঙ্গাকারীদের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইন্দ্রজিৎদের বাড়িটি ইতিমধ্যেই সরকারি খরচে সম্পূর্ণ মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া নিহতের বৃদ্ধ বাবার জন্য অবিলম্বে বার্ধক্যভাতা এবং মায়ের জন্য 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' প্রকল্পের সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এই পরিদর্শনের মাঝেই মুখ্যমন্ত্রী আরও একটি মানবিক ঘোষণা করেন। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফুলতলায় ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া অশান্তিতে নিহত প্রসেনজিৎ বিশ্বাসের পরিবারকেও রাজ্য সরকারের তরফে ১০ লক্ষ টাকার আর্থিক সাহায্য দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি।
নাবালিকা নির্যাতন ও পরবর্তী খুনের ঘটনায় রাজ্য পুলিশের তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ঘটনার তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খতিয়ে দেখে পুলিশ মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল-সহ মোট চারজনকে দ্রুত গ্রেফতার করে। এরপর ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য প্রভাসকে নিয়ে যাওয়া হলে সে পুলিশের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশের পাল্টা গুলিতে এনকাউন্টারে মৃত্যু হয় ওই মূল অভিযুক্তের।
অন্যদিকে, নির্দোষ ইন্দ্রজিৎকে পিটিয়ে মারার ঘটনাতেও পুলিশ অত্যন্ত সক্রিয় পদক্ষেপ করেছে। ঘটনার ভিডিও ও ছবি দেখে ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্তদের চিহ্নিত করা হয়েছে। অপরাধীরা গা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সাথে অভিযান চালিয়ে দীঘা ও বকখালি থেকে তাদের পাকড়াও করেছে। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ৩৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর কড়া ও সরাসরি নির্দেশেই বারুইপুর কাণ্ডে পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপ সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তিনি আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে পুলিশ প্রশাসনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রেখেছেন যে, কর্তব্যে এক শতাংশ গাফিলতিও বরদাস্ত করা হবে না। প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে তাঁর এই দৃঢ়তা, অপরাধীদের কঠোর শাস্তিদান এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দোরগোড়ায় পৌঁছে তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ এক দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল প্রশাসনের বার্তাই বহন করছে।
ট্যাগ: #বারুইপুর_কাণ্ড #শুভেন্দু_অধিকারী #মুখ্যমন্ত্রী #সূর্যপুর #প্রশাসনিক_পদক্ষেপ #আইনশৃঙ্খলা #পশ্চিমবঙ্গ #মানুষের_ভাষা #আর্থিক_সাহায্য
image- Duranta Barta

0 মন্তব্যসমূহ