১৪ই ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকা প্রকাশে অনিশ্চয়তা! জেলাশাসকদের আর্তির মাঝেই ‘স্বাভাবিক’ রাষ্ট্রপতি শাসনের বার্তা বিরোধী দলনেতার
মানুষের ভাষা ওয়েব ডেস্ক, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়া ঘিরে রাজ্য রাজনীতি এবং প্রশাসনিক মহলে চরম ডামাডোল সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময়সীমা মেনে ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে। একদিকে যখন একাধিক জেলার জেলাশাসকরা (DM) শুনানির সময়সীমা বাড়ানোর জন্য কমিশনের কাছে আর্জি জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ফের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে রাজ্যে ‘স্বাভাবিক নিয়মে’ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়ে যাবে।
এই ত্রিমুখী চাপে—প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক চাপানউতোর এবং আদালতের হস্তক্ষেপ—রাজ্যের নির্বাচনী প্রস্তুতি এক জটিল সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যেই কমিশনের সূত্রে পাওয়া এক চাঞ্চল্যকর খবরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে: শুনানিতে হাজির না হওয়ার কারণে প্রায় ৫০,০০০ ভোটারের নাম বাতিলের মুখে পড়েছে।
সময়সীমার চাপ ও জেলাশাসকদের আর্জি
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের নির্ঘণ্ট অনুযায়ী, গত ২৭ ডিসেম্বর থেকে রাজ্যে শুরু হয়েছিল SIR-এর শুনানি পর্ব। এই পর্ব শেষ হওয়ার কথা আগামীকাল, অর্থাৎ ৭ ফেব্রুয়ারি। এবং সব ঠিক থাকলে ১৪ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার কথা।
কিন্তু বাস্তবের চিত্রটি বেশ ভিন্ন। রাজ্যের একাধিক জেলা, বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভোটার তালিকায় ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতির সংখ্যা অত্যধিক বেশি। এই জেলাগুলিতে শুনানির জন্য বিপুল সংখ্যক মানুষকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। ফলে নির্ধারিত ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সমস্ত শুনানি শেষ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কমিশন সূত্রে খবর, এই প্রথমবার একাধিক জেলাশাসক (যাঁরা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা DEO-র দায়িত্বেও রয়েছেন), কমিশনের কাছে লিখিতভাবে সময়সীমা বাড়ানোর আর্জি জানিয়েছেন। মালদহ ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসকরা এই প্রস্তাব দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গত সপ্তাহেই উপ-নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার এই চার জেলা এবং নদিয়া পরিদর্শনে এসেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল, নথি আপলোডের ক্ষেত্রেও নানা গরমিল দেখা যাচ্ছে।
শুনানিতে গড়হাজির: ৫০ হাজার নাম বাতিলের মুখে!
এই প্রশাসনিক চাপের মাঝেই নির্বাচন কমিশন সূত্রে পাওয়া একটি তথ্য রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন করে ঘি ঢেলেছে। কমিশনের এক বরিষ্ঠ আধিকারিক জানিয়েছেন, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ ক্যাটাগরিতে থাকা প্রায় ৫০,০০০ ভোটারকে শুনানির জন্য ডাকা হলেও তাঁরা উপস্থিত হননি। ফলে ইলেকট্রোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসাররা (ERO) এই কেসগুলি প্রাথমিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, শুনানির পরেই এই নামগুলি চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক মানুষ কেন শুনানিতে এলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে বৈধ ভোটারদেরও নানা অজুহাতে হয়রান করা হচ্ছে বা নোটিস ঠিক সময়ে পৌঁছচ্ছে না।
কমিশনের তথ্য আরও বলছে, ৩১ লক্ষেরও বেশি ‘আনম্যাপড’ (unmapped) কেসের মধ্যে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ শুনানিতে হাজির হননি। এই পরিসংখ্যান যদি সঠিক হয়, তবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে কয়েক লক্ষ নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যা নিয়ে ভবিষ্যতে বড়সড় রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে তরজা ও ৭০ লক্ষের হিসাব
ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। বুধবার শীর্ষ আদালতে এই মামলার শুনানিতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, এখনও রাজ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ লক্ষ ভোটারের শুনানি বাকি রয়েছে। তাঁর যুক্তি, মাত্র চার দিনে এই বিপুল সংখ্যক শুনানি শেষ করা অসম্ভব।
যদিও নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী আদালতে জানান, ১ কোটির বেশি মানুষের শুনানি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে এবং সেই তথ্য আপলোডও করা হয়েছে। কমিশনের হাতে কিছু ‘বাফার’ সময় রয়েছে এবং বিচারব্যবস্থাও খোলা আছে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তও উল্লেখ করেন যে তাঁরা সময় বাড়িয়েছিলেন। আগামী সোমবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি, সেখানেই হয়তো নির্ধারিত হবে ১৪ ফেব্রুয়ারির ভাগ্য।
এক নজরে SIR-এর বর্তমান পরিস্থিতি (কমিশনের তথ্য অনুযায়ী):
| বিবরণ | পরিসংখ্যান |
| শুনানি সম্পন্ন ও আপলোড | ১ কোটি ৬ লক্ষ+ |
| তৃণমূলের দাবি অনুযায়ী বাকি শুনানি | ৭০-৭৫ লক্ষ |
| শুনানিতে অনুপস্থিতির জন্য বাতিলের মুখে | ৫০,০০০ (প্রায়) |
| আনম্যাপড কেসে অনুপস্থিতি | ১০-১৫% |
| সর্বাধিক চাপযুক্ত জেলা | মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উঃ ও দঃ ২৪ পরগনা |
শুভেন্দুর ‘রিমাইন্ডার’: রাষ্ট্রপতি শাসনের জুজু
প্রশাসনিক এই জটিলতাকে হাতিয়ার করে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে দেরি করেননি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সংবিধানের দোহাই দিয়ে রাজ্য সরকারকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, “সংবিধানে পরিষ্কার লেখা আছে, ৬০ মাসের মধ্যে নির্বাচিত সরকার তৈরি হতে হবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৫ মে। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করতে গেলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।”
তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, “যদি নির্দিষ্ট সময়ে তালিকা প্রকাশ না হয় এবং নির্বাচন না করা যায়, তবে ৫ মে রাত ১২টার পর কাউকে চাইতে হবে না, কেউ বাধা দিলেও কিছু হবে না। রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন অটোমেটিক কার্যকর হবে। কোনও জায়গায় হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।”
বিজেপির কৌশল স্পষ্ট—ভোটার তালিকা নিখুঁত করার দাবিতে অনড় থাকা এবং সময়মতো তা না হলে সাংবিধানিক সংকটের কথা তুলে ধরে শাসক দলকে চাপে রাখা।
বিশেষ ব্যবস্থা ?
পরিস্থিতি সামাল দিতে কমিশন কিছু বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছে। যেমন, মেটিয়াবুরুজ এবং কার্শিয়াং বিধানসভা কেন্দ্রে শুনানি প্রক্রিয়া দ্রুত করতে ৫০ জন অতিরিক্ত সহকারী ইলেকট্রোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (AERO) নিয়োগ করা হয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জ পাহাড়প্রমাণ। একদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের শুনানি বাকি, অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের সময় বাড়ানোর আর্জি। তার ওপর ৫০ হাজার নাম বাতিলের সম্ভাবনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ। সব মিলিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্ভুল চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা এখন নির্বাচন কমিশনের কাছে সবচেয়ে বড় অগ্নিপরীক্ষা। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট কী নির্দেশ দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের নির্বাচনী প্রস্তুতির পরবর্তী ধাপ। যদি সময়সীমা বাড়ানো হয়, তবে নির্বাচনের নির্ঘণ্টও পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যা শুভেন্দু অধিকারীর ‘রাষ্ট্রপতি শাসনে’র যুক্তিকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে।

0 মন্তব্যসমূহ