রাজা প্রতাপাদিত্য : বাংলার মুক্তিসূর্য, হিন্দুত্বের রক্ষক ও মুঘল-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক অমর বীরগাথা (প্রথম অধ্যায়)
প্রথম অধ্যায়: সুন্দরবনে সূর্যোদয় (পর্ব - ১)
প্রবীর রায় চৌধুরী ( রাজা প্রতাপাদিত্যের উত্তরসূরী )
সময়কাল: ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দ
স্থান: সপ্তগ্রাম বন্দর ও গৌড়ের রাজদরবার
বাংলার আকাশ তখন ঘন কালো মেঘে ঢাকা, যেন প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর মানুষের ভাগ্যের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। শ্রাবণের বারিধারা অবিশ্রান্ত ঝরছে গৌড়ের প্রাচীন প্রাচীরের ওপর, কিন্তু সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে না মানুষের মনে জমে থাকা আতঙ্কের ছাপ। বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় ভেসে আসছে আসন্ন প্রলয়ের বার্তা।
দিল্লির মসনদে তখন মহামতি আকবর। তাঁর লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে সুজলা-সুফলা বাংলার ওপর। মোগল সেনাপতি মুনিম খান এক বিশাল পঙ্গপাল বাহিনী নিয়ে ধেয়ে আসছেন। খবর এসেছে, পাটনার পতন হয়েছে। মোগলদের অশ্বখুরের ধুলোয় বিহারের আকাশ অন্ধকার। এবার লক্ষ্য বাংলা। বাংলার শেষ স্বাধীন পাঠান সুলতান দাউদ খান কররানী তখন দিশেহারা। তাঁর প্রমোদভ্রমণ আর বিলাসব্যাসনের দিন শেষ, এখন কেবল অস্তিত্ব রক্ষার মরণপণ সংগ্রাম।
গৌড়ের রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সেই নিস্তব্ধতা মৃত্যুর চেয়েও ভারী। প্রাসাদের দীর্ঘ অলিন্দে পায়চারি করছেন দুজন মানুষ। তাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ, কিন্তু চোখে এক অদম্য দীপ্তি। এঁরা সাধারণ কেউ নন—এঁরা হলেন সুলতানের সবথেকে বিশ্বাসভাজন দুই মন্ত্রী, এবং সম্পর্কে দুই ভাই—শ্রীহরি এবং জানকীবল্লভ।
শ্রীহরি, যিনি পরবর্তীতে 'মহারাজ বিক্রমাদিত্য' নামে পরিচিত হবেন, তিনি হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। জানালার গরাদ ধরে তাকালেন বাইরের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অন্ধকারের দিকে। বিদ্যুতের ঝিলিক তাঁর ফর্সা মুখে এক অদ্ভুত ছায়া ফেলল।
গম্ভীর স্বরে তিনি বললেন, "জানকী, গৌড়ের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। দাউদ খান ভাবছেন তিনি মোগলদের রুখে দেবেন, কিন্তু তিনি জানেন না আকবরের কামানের খিদে কত সর্বগ্রাসী। এই প্রাসাদ, এই ঐশ্বর্য, সব ধুলোয় মিশে যাবে কয়েক প্রহরের মধ্যে।"
জানকীবল্লভ (যিনি পরে 'মহারাজ বসন্ত রায়' হবেন) দাদার দিকে তাকালেন। বয়সে ছোট হলেও তাঁর গায়ে অসুরের শক্তি আর বুদ্ধিতে চাণক্য। তিনি বললেন, "দাদা, তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমরা কি মোগলদের গোলামি মেনে নেব? আমাদের পূর্বপুরুষরা কি এই দিনের জন্যই কলম আর তলোয়ার ধরেছিলেন?"
শ্রীহরি ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক মৃদু হাসি ফুটে উঠল—যে হাসিতে মিশে ছিল এক গভীর রহস্য। "না ভাই। গোলামি আমাদের রক্তে নেই। কিন্তু এখন আবেগের সময় নয়, এখন সময় সংরক্ষণের। মনে রেখো, মোগলরা আসছে লুঠ করতে। সুলতানের এই বিপুল ধনরত্ন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত হয়েছে, তা যদি মোগলদের হাতে পড়ে, তবে বাংলা চিরকালের জন্য ভিখারি হয়ে যাবে। আমাদের এই সম্পদ বাঁচাতে হবে। আর বাঁচাতে হবে আমাদের ধর্ম, আমাদের জাতিসত্তা।"
"কোথায় যাব আমরা?" জানকীবল্লভ প্রশ্ন করলেন। "উত্তরে মোগল, পশ্চিমে পাহাড়। পালাবার পথ কই?"
শ্রীহরি নিচু স্বরে বললেন, "দক্ষিণে। ভাটি অঞ্চলে। যেখানে গঙ্গা শতধারায় বিভক্ত হয়ে সাগরে মিশেছে। যেখানে মাটি আর জল একাকার। সেই সুন্দরবন। মোগলদের ঘোড়া সমতলে দৌড়াতে পারে, কিন্তু সুন্দরবনের লোনা কাদা আর শ্বাসমূলের জঙ্গলে তারা অচল। ওটাই হবে আমাদের দুর্গ। ওটাই হবে স্বাধীন বাংলার শেষ নিঃশ্বাস।"
সেই রাতেই এক ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটল, যা ইতিহাসের পাতায় খুব গোপনে লেখা আছে। সুলতান দাউদ খান তখন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে উন্মাদপ্রায়। শ্রীহরি তাঁকে বোঝালেন, "জাহাপনা, যুদ্ধের রসদ আর রাজকোষ নিরাপদ রাখা প্রয়োজন। আপনি নিশ্চিন্তে যুদ্ধ করুন, আমি রাজকোষ এমন জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাব যেখানে মোগলদের ছায়াও পড়বে না।"
সরল বিশ্বাসে সুলতান রাজি হলেন। সপ্তগ্রামের ঘাটে সাজানো হলো শত শত বিশাল 'ডিঙি' আর 'বজরা'। রাতের অন্ধকারে, মশাল নিভিয়ে, সেই নৌকাগুলোতে তোলা হলো সোনা, হিরে, জহরত, আর প্রাচীন নথিপত্র। কিন্তু শ্রীহরি কেবল জড়বস্তু নিলেন না। তিনি সাথে নিলেন বাংলার সেরা পণ্ডিত, কারিগর, কামার, কুমার এবং একদল দুর্ধর্ষ লাঠিয়াল বাহিনী। তিনি জানতেন, নতুন রাজ্যে শুধু সোনা দিয়ে হয় না, মানুষ লাগে।
ইছামতী নদী তখন ফুঁসছে। সেই উত্তাল নদীতে ভাসল শ্রীহরির নৌবহর। গন্তব্য অজানা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত—নৌকা চলছে তো চলছেই। দুপাশে ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে বাঘের গর্জনে নাবিকরা শিউরে উঠছে। কুমিরের লেজের ঝাপটায় নৌকা দুলে উঠছে। কিন্তু শ্রীহরি অবিচল। তিনি নৌকার গলুইয়ে বসে তাকিয়ে আছেন সামনের দিকে। তিনি খুঁজছেন এমন এক ভূমি, যা হবে দুর্ভেদ্য।
অবশেষে কালিন্দী আর যমুনা নদীর সঙ্গমস্থলে এক বিশাল ভূখণ্ড চোখে পড়ল। তিনদিকে নদী বেষ্টিত, আর একদিকে দুর্গম জঙ্গল। প্রকৃতি যেন নিজেই এখানে এক দুর্গ তৈরি করে রেখেছে।
শ্রীহরি নৌকার মাঝিদের নির্দেশ দিলেন, "এখানেই নোঙর ফেলো।"
মাটিতে পা রেখে তিনি এক মুঠো মাটি তুলে কপালে ছোঁয়ালেন। জানকীবল্লভকে বললেন, "এই সেই স্থান। এর নাম হবে 'যশোহর'। কারণ, এ রাজ্য একদিন গৌড়ের যশ হরণ করবে। এখান থেকেই একদিন মোগলদের আস্ফালনের জবাব দেওয়া হবে।"
শুরু হলো এক মহাযজ্ঞ। জঙ্গল কেটে তৈরি হলো জনপদ। দেখতে দেখতে সেই শ্বাপদসংকুল অরণ্যে মাথা তুলে দাঁড়াল এক নতুন রাজধানী—'ধূমঘাট'। কারিগরদের হাতুড়ির শব্দে বাঘের গর্জন চাপা পড়ে গেল। তৈরি হলো মন্দির, তৈরি হলো কাছারি, আর তৈরি হলো অস্ত্রাগার।
শ্রীহরি নিজেকে ঘোষণা করলেন 'মহারাজ বিক্রমাদিত্য' আর ভাই জানকীবল্লভ হলেন 'মহারাজ বসন্ত রায়'। তাঁরা মোগলদের বশ্যতা স্বীকার করলেন না, আবার সরাসরি বিদ্রোহও করলেন না। তাঁরা কেবল সময়ের অপেক্ষা করতে লাগলেন।
বছর ঘুরল। রাজ্যের পত্তন হলো ঠিকই, কিন্তু রাজপ্রাসাদে কোনো শিশুর কলকাকলি নেই। বিক্রমাদিত্যের মনে সুখ নেই। অবশেষে, বহু যজ্ঞ আর প্রার্থনার পর, এক ঝড়ের রাতে রানিমহল থেকে উলুধ্বনি শোনা গেল। দাসীরা খবর আনল—মহারাজের পুত্রসন্তান হয়েছে।
পুরো ধূমঘাটে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
পরদিন সকালে রাজজ্যোতিষী ধ্রুবানন্দ শর্মা এলেন শিশুর কোষ্ঠী বিচার করতে। রাজসভায় তখন তিল ধারণের জায়গা নেই। সবাই উদ্গ্রীব হয়ে আছে ভবিষ্যৎ জানার জন্য। বৃদ্ধ জ্যোতিষী প্রদীপের আলোয় পুঁথির পাতা উল্টাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর হাত কেঁপে উঠল। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তিনি থমকে গেলেন।
মহারাজ বিক্রমাদিত্য ও বসন্ত রায় উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, "কী হলো আচার্যদেব? আপনি থামলেন কেন? কী দেখছেন গ্রহের অবস্থানে?"
ধ্রুবানন্দ শর্মা কম্পিত কণ্ঠে, প্রায় ফিসফিস করে বললেন, "মহারাজ, ক্ষমা করবেন। এই শিশুর জন্মলগ্নে গ্রহের যে অবস্থান, তা আমি আমার দীর্ঘ জীবনে দেখিনি। এ এক প্রলয়।"
"প্রলয়?" বিক্রমাদিত্য চমকে উঠলেন।
"হ্যাঁ মহারাজ। এই শিশু হয় একচ্ছত্র চক্রবর্তী সম্রাট হবে, যার ভয়ে দিল্লিও কম্পমান হবে... অথবা..." জ্যোতিষী থামলেন।
"অথবা কী? নির্ভয়ে বলুন।" বসন্ত রায় ধমক দিয়ে উঠলেন।
"অথবা এ হবে পিতৃঘাতী! এর কারণে রাজবংশের ধ্বংস নেমে আসতে পারে। এ মোগলদের ত্রাস হবে ঠিকই, কিন্তু নিজের পরিবারের জন্যও এ এক কালান্তক ধূমকেতু। এর হাতেই হয়তো আপনজনের রক্ত ঝরবে।"
রাজসভায় পিনপতন নিস্তব্ধতা। পিতৃঘাতী! সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে এমন ভয়ংকর ভবিষ্যৎবাণী?
মহারাজ বিক্রমাদিত্য সিংহাসনে বসে পড়লেন। তাঁর চোখেমুখে হতাশা। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, শিশুটি দোলনায় কেঁদে উঠল না—সে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল সভার দিকে।
বসন্ত রায় এগিয়ে গেলেন। তিনি দোলনা থেকে শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন। শিশুটি কান্না থামিয়ে তাঁর দাড়ি ধরে টান দিল। বসন্ত রায় হো হো করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে রাজসভার স্তব্ধতা ভেঙে গেল।
তিনি বললেন, "দাদা, কোষ্ঠী যা-ই বলুক, আমি এর চোখে আগুন দেখছি। এ ধ্বংসের আগুন নয়, এ পবিত্র যজ্ঞের আগুন। এ যদি আমাদের ধ্বংসও করে, তবুও এ মোগলদের বাংলা ছাড়া করবে। এর তেজ সূর্যের মতো। আজ থেকে এর নাম প্রতাপ। প্রতাপাদিত্য। এ হবে সুন্দরবনের সূর্য।"
সেই দিন, সেই মুহূর্তে নির্ধারিত হয়ে গেল বাংলার ভবিষ্যৎ। এক ধূমকেতুর জন্ম হলো, যে জ্বালিয়ে দেবে মোগল অহংকার। কিন্তু সেই আগুনের আঁচ যে নিজের ঘরেও লাগবে, তা সেদিন কেউ বোঝেনি—শুধুমাত্র সেই বৃদ্ধ জ্যোতিষী ছাড়া।
(চলবে...)
প্রথম অধ্যায়: (পর্ব - ২)
সময়কাল: ১৫৭৫ - ১৫৭৭ খ্রিস্টাব্দ
স্থান: ধূমঘাট, যশোর
ধূমঘাটের মাটিতে তখন নতুন প্রাণের স্পন্দন। ইছামতী নদীর লোনা বাতাস আর সুন্দরবনের গহীন অরণ্যের রহস্যময় ছায়ায় বেড়ে উঠছেন কিশোর প্রতাপাদিত্য। রাজপ্রাসাদের বিলাসিতা তাঁকে কখনোই সেভাবে টানত না। বরং তাঁর আকর্ষণ ছিল বাইরের ওই উদ্দাম প্রকৃতির প্রতি। যে বয়সে অন্য রাজপুত্ররা নর্তকীদের ঘুঙুরের শব্দে মোহিত থাকে, সেই বয়সে প্রতাপের কান পেতে থাকে কামারের হাপরের শব্দের দিকে, যেখানে তৈরি হচ্ছে নতুন তলোয়ার, নতুন বর্শা।
মহারাজ বিক্রমাদিত্য রাজ্য শাসনে ব্যস্ত, কিন্তু প্রতাপের প্রকৃত অভিভাবক হয়ে উঠলেন তাঁর কাকা—মহারাজ বসন্ত রায়। বসন্ত রায় ছিলেন এক বিচিত্র মানুষ। একদিকে তিনি পরম বৈষ্ণব, দিনে বহুবার নামজপ করেন; অন্যদিকে তিনি এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা, যাঁর তলোয়ারের ঝিলিক দেখলে শত্রুও পথ ছাড়ে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রতাপ সাধারণ মাটির মানুষ নন। এই ছেলের ধমনীতে বইছে আগ্নেয়গিরির লাভা। তাকে সঠিক পথে চালিত করতে না পারলে সে যেমন সব ধ্বংস করতে পারে, তেমনি গড়তেও পারে এক নতুন ইতিহাস।
ভোর না হতেই বসন্ত রায় প্রতাপকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। গন্তব্য—নদীর পাড় বা গভীর জঙ্গল।
একদিন প্রতাপ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন, "কাকামণি, আমরা কেন রোজ এই কাদা আর জলের মধ্যে কুস্তি লড়ি? আমাদের তো হাতি আছে, ঘোড়া আছে। আমরা কি তাদের পিঠে চড়ে যুদ্ধ করব না?"
বসন্ত রায় মুচকি হাসলেন। প্রতাপের কপালে লেগে থাকা কাদা মুছিয়ে দিয়ে বললেন, "প্রতাপ, ভালো করে দেখো এই মাটিকে। এ মাটি দিল্লির শক্ত পাথর নয়, এ বাংলার পলিমাটি। এখানে মোগলদের আরবি ঘোড়া দৌড়াতে পারবে না, তাদের চাকা বসে যাবে কাদায়। কিন্তু আমরা? আমরা এই মাটির সন্তান। আমরা জানি কীভাবে এই কাদায় দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে হয়। মনে রেখো বাবা, মোগলদের হারাতে হলে তাদের মতো করে নয়, আমাদের মতো করে লড়তে হবে।"
প্রতাপের কিশোর মনে এই কথাগুলো গেঁথে গেল। তিনি শিখলেন 'লুকোচুরি যুদ্ধ' বা গেরিলা রণকৌশল। শিখলেন কীভাবে নিঃশব্দে জলের নিচে ডুব দিয়ে শত্রুর নৌকার তলায় ছিদ্র করে দেওয়া যায়। শিখলেন বাঁশ দিয়ে লাঠিখেলা আর তলোয়ার চালনা।
কিন্তু বসন্ত রায় জানতেন, কেবল দেশি বিদ্যায় মোগলদের হারানো যাবে না। মোগলদের আছে এক ভয়ংকর মারণাস্ত্র—আগ্নেয়াস্ত্র বা বন্দুক। আর আছে কামানের গোলা। তিনি ঠিক করলেন, প্রতাপকে আধুনিক যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী করতে হবে।
সেসময় বাংলার উপকূলে পর্তুগিজ বা ফিরিঙ্গিদের খুব দাপট। তারা দুর্ধর্ষ জলদস্যু, কিন্তু তাদের কাছে আছে উন্নতমানের মাস্কেট (বন্দুক) আর দ্রুতগামী জাহাজ। বসন্ত রায় গোপনে যোগাযোগ করলেন রডা নামের এক পর্তুগিজ সর্দারের সাথে। অনেক স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে রডা রাজি হলো প্রতাপকে শিক্ষা দিতে।
শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। সুন্দরবনের এক গোপন আস্তানায় প্রতাপ শিখতে লাগলেন বন্দুক চালানো। বারুদের গন্ধে তাঁর নাসিকা অভ্যস্ত হয়ে উঠল। তিনি দেখলেন, কীভাবে কামানের মুখ সামান্য ঘুরিয়ে দিলে গোলার গতিপথ বদলে যায়। তিনি শিখলেন পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলতে, যাতে শত্রুর ঘরের খবর সহজেই নেওয়া যায়।
দিন যায়, বছর গড়ায়। প্রতাপ এখন আর কিশোর নন, তিনি এক টগবগে যুবক। তাঁর প্রশস্ত বক্ষ, পেশিবহুল বাহু আর চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি দেখলে মনে হয় যেন সাক্ষাৎ কার্তিক। কিন্তু এই বীরত্বের আড়ালে তাঁর মনে দানা বাঁধছিল এক গভীর ক্ষোভ।
তিনি দেখছিলেন, পিতা বিক্রমাদিত্য কীভাবে মোগল সম্রাট আকবরের নাম শুনলেই তটস্থ হয়ে পড়েন। বছর বছর দিল্লি থেকে আসা রাজকর্মচারীরা (মনসবদাররা) কীভাবে অপমানজনকভাবে রাজস্ব দাবি করে। তারা আসে, লুঠ করে, আর যাওয়ার সময় নিয়ে যায় বাংলার সেরা সম্পদ।
একদিন রাজদরবারে এক মোগল দূত এসেছে। তার আচরণ অত্যন্ত উদ্ধত। সে মহারাজ বিক্রমাদিত্যকে সম্মান না জানিয়েই সিংহাসনের দিকে আঙুল তুলে উচ্চস্বরে কথা বলছে। প্রতাপ দরবারের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর হাত চলে গেল তলোয়ারের বাঁটে। চোখ জ্বলে উঠল। তিনি এক পা এগোতে চাইলেন, কিন্তু বসন্ত রায় খপ করে তাঁর হাত ধরলেন।
ফিসফিস করে বললেন, "এখন না প্রতাপ। সাপ মারতে হলে আগে তার বিষদাঁত কোথায় তা জানতে হয়। উত্তেজনা সংবরণ করো।"
প্রতাপ দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করলেন। কিন্তু সেই রাতেই তিনি কাকার কাছে গিয়ে ফেটে পড়লেন। "কেন কাকামণি? কেন আমরা এই অপমান সহ্য করব? আমাদের কি শক্তি নেই? আমাদের কি লোকবল নেই?"
বসন্ত রায় শান্ত গলায় বললেন, "শক্তি আছে, কিন্তু কৌশল নেই। মোগল সাম্রাজ্য এক বিশাল অক্টোপাস। তার একটা শুঁড় কাটলে আরও দশটা এগিয়ে আসবে। তাকে মারতে হলে আঘাত করতে হবে মাথায়। আর তার জন্য তোমাকে যেতে হবে সেই মাথার কাছে।"
"কোথায়?" প্রতাপ অবাক হয়ে তাকালেন।
"আগ্রায়।" বসন্ত রায় বললেন। "দিল্লির দরবারে। তোমাকে সেখানে যেতে হবে রাজস্ব দিতে। কিন্তু আসলে তুমি যাবে তাদের শক্তি আর দুর্বলতা মাপতে। তুমি দেখবে তাদের সেনাবাহিনী কীভাবে সাজানো, তাদের সেনাপতিদের মধ্যে কোনো বিবাদ আছে কি না। তুমি হবে আমাদের গুপ্তচর, আমাদের চোখ।"
প্রতাপের রক্তে শিহরণ খেলে গেল। আগ্রা! মোগলদের ডেরা!
পরের সপ্তাহেই আয়োজন শুরু হলো। মহারাজ বিক্রমাদিত্য ছেলেকে পাঠাতে রাজি হলেন এই ভেবে যে, হয়তো সম্রাটের সান্নিধ্যে থাকলে প্রতাপের উগ্র মেজাজ কিছুটা ঠান্ডা হবে। তিনি জানতেন না, তিনি ছেলেকে পাঠাচ্ছেন বারুদে আগুন দিতে।
যাত্রার দিন সকালে মা যশেশ্বরী দেবীর মন্দিরে পূজা দিলেন প্রতাপ। কপালে রক্তজবার মতো সিঁদুরের তিলক। তিনি ঘোড়ায় চড়লেন। পেছনে চলল হাতি, ঘোড়া আর পাইক-বরকন্দাজের এক দীর্ঘ শোভাযাত্রা। সাথে চলল বকেয়া রাজস্বের সিন্দুক।
বসন্ত রায় এগিয়ে এসে প্রতাপকে জড়িয়ে ধরলেন। কানে কানে বললেন, "সাবধানে থেকো। মনে রেখো, তুমি একা নও। পুরো বাংলা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। ফিরে এসো বীরের মতো, দাসের মতো নয়।"
প্রতাপ ঘোড়ায় চাবুক মারলেন। ধুলো উড়িয়ে তিনি মিলিয়ে গেলেন দিগন্তে। শুরু হলো এক দীর্ঘ পথচলা। বাংলা থেকে বিহার, বিহার থেকে উত্তর প্রদেশ। প্রতাপ দেখলেন শস্যহীন মাঠ, কঙ্কালসার মানুষ। মোগল শোষণের এই নগ্ন রূপ তাঁর প্রতিজ্ঞাকে আরও কঠোর করে তুলল।
অবশেষে একদিন যমুনা নদীর তীরে দেখা গেল লাল পাথরের বিশাল প্রাচীর। আগ্রা দুর্গ। প্রতাপ ঘোড়ার রাস টেনে ধরলেন। তাঁর চোখের সামনে মোগল সাম্রাজ্যের ক্ষমতার প্রতীক।
তিনি মনে মনে বললেন, "দেখে নাও আগ্রা, ভালো করে দেখে নাও এই বাঙালি যুবককে। আজ আমি এসেছি মাথা নত করে রাজস্ব দিতে। কিন্তু একদিন আসব, সেদিন আমার হাতে থাকবে না রাজস্বের থলি, থাকবে উন্মুক্ত তরবারি। সেদিন তোমার এই লাল পাথর আমার কামানের আঘাতে চূর্ণ হবে।"
প্রতাপাদিত্য প্রবেশ করলেন আগ্রায়। কিন্তু তিনি জানতেন না, সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে এক নতুন পরীক্ষা, এক নতুন জীবন, যা তাঁকে এক সাধারণ জমিদার-পুত্র থেকে করে তুলবে ইতিহাসের মহানায়ক।
(চলবে...)
প্রথম অধ্যায়: (পর্ব - ৩)
সময়কাল: ১৫৭৮ - ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দ
স্থান: আগ্রা, মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী
আগ্রা। জাঁকজমকপূর্ণ, কোলাহলময়, এবং একই সাথে ষড়যন্ত্রের আঁতুড়ঘর। প্রতাপাদিত্য যখন আগ্রার রাজপথে প্রবেশ করলেন, তখন তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলার সবুজ প্রকৃতির কোলে বড় হওয়া প্রতাপের চোখে এই পাথুরে শহরকে মনে হলো এক বিশাল কারাগার। চারদিকে কেবল লাল পাথর, মার্বেল আর সোনা-রুপার আস্ফালন। কিন্তু সেই জৌলুসের আড়ালে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ে আছে, তা প্রতাপের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়াতে পারল না।
যশোহরের রাজপ্রতিনিধি হিসেবে প্রতাপের থাকার ব্যবস্থা হলো এক সুরম্য প্রাসাদে। কিন্তু প্রতাপ তো এখানে আরাম করতে আসেননি। তিনি এসেছেন শিকারি বাজের মতো পর্যবেক্ষণ করতে। দিনের বেলা তিনি রাজদরবারে যান, বকেয়া রাজস্বের হিসেব দেন, আর বিনীতভাবে সম্রাট ও আমলাদের কথা শোনেন। কিন্তু তাঁর কান খাড়া থাকে অন্য জায়গায়।
তিনি দেখলেন, সম্রাট আকবরের দরবার এক বিচিত্র জায়গা। সেখানে যেমন বীরবলের মতো জ্ঞানী আছেন, টোডরমলের মতো দক্ষ প্রশাসক আছেন, তেমনি আছে মানসিংহের মতো দুর্ধর্ষ সেনাপতি। প্রতাপ বুঝতে পারলেন, মোগল শক্তির আসল উৎস তাদের তরবারি নয়, তাদের সংগঠন । তারা হাজার হাজার মানুষকে এক সুতোর বাঁধনে বেঁধে রাখতে জানে।
কিন্তু ফাটলও আছে। প্রতাপ লক্ষ্য করলেন, মোগল দরবারে তুর্কি, ইরানি, আফগান এবং রাজপুত—এই চার শক্তির মধ্যে এক সূক্ষ্ম রেষারেষি চলছে। পাঠানরা মোগলদের সহ্য করতে পারে না, তারা কেবল সুযোগের অপেক্ষায় আছে। প্রতাপের মনে হলো, "শত্রুর শত্রু তো আমার মিত্র।" তিনি গোপনে আফগান সর্দারদের সাথে যোগাযোগ শুরু করলেন। রাতের অন্ধকারে ছদ্মবেশে তিনি যেতেন শহরের সরাইখানাগুলোতে, যেখানে আফগান সৈন্যরা মদ্যপান করে নিজেদের দুঃখ আর ক্ষোভের কথা বলাবলি করত। সেখান থেকে প্রতাপ সংগ্রহ করতেন অমূল্য সব তথ্য—মোগল বাহিনীর দুর্বলতা কোথায়, তাদের বারুদখানা কোথায়, তাদের রসদ কোথা থেকে আসে।
একদিন এক নাটকীয় ঘটনা ঘটল, যা প্রতাপের নাম পৌঁছে দিল স্বয়ং সম্রাট আকবরের কানে।
আগ্রার রাজপথ দিয়ে একদিন এক বিশাল শোভাযাত্রা যাচ্ছিল। হঠাৎ কোথা থেকে এক মদমত্ত হাতি শেকল ছিঁড়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল। মাহুত ছিটকে পড়েছে আগেই। হাতিটি শুঁড় দিয়ে দোকানপাট ভাঙছে, মানুষজন ভয়ে দিগ্বিদিক পালাচ্ছে। এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। মোগল রক্ষীরাও ভয়ে পিছু হটছে।
প্রতাপ তখন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন ঘোড়ায় চড়ে। চোখের সামনে এক অসহায় বৃদ্ধাকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হতে দেখে তাঁর রক্ত গরম হয়ে উঠল। তিনি মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়া ছোটালেন। ক্ষিপ্রগতিতে হাতির সামনে গিয়ে ঘোড়া থেকে এক লাফে তিনি হাতির শুঁড় জড়িয়ে ধরলেন।
সবাই ভয়ে চোখ বন্ধ করল। এই বুঝি যুবক পিষে মারা গেল! কিন্তু প্রতাপ ছিলেন মল্লযুদ্ধে পারদর্শী। তিনি হাতির কানের কাছে এমন এক বিশেষ কায়দায় আঘাত করলেন এবং অঙ্কুশ বিঁধিয়ে দিলেন যে, বিশাল পশুটি ব্যথায় আর্তনাদ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। প্রতাপের এই অসামান্য বাহুবল দেখে জনতা জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল।
খবরটি বাতাসের বেগে প্রাসাদে পৌঁছাল। আকবর কৌতূহলী হয়ে তলব করলেন এই সাহসী যুবককে।
দরবারে প্রতাপ প্রবেশ করলেন। তাঁর দৃষ্টি নত, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা। আকবর তাঁর সিংহাসন থেকে ঝুঁকে দেখলেন প্রতাপকে। বললেন, "শুনলাম তুমি নাকি খালি হাতে এক মত্ত হাতিকে বশ করেছ! তুমি কে যুবক?"
প্রতাপ মাথা উঁচু করে বললেন, "আমি বাংলার যশোহরের যুবরাজ, প্রতাপাদিত্য। হাতি বশ করা আমার কাছে কোনো খেলা নয় জাঁহাপনা, আমাদের দেশে বাঘের সাথেও লড়তে হয়।"
আকবর প্রতাপের উত্তরে মুগ্ধ হলেন। তিনি ভাবলেন, এই যুবককে কাজে লাগানো যেতে পারে। তিনি প্রতাপকে সম্মানসূচক উপাধি দিলেন এবং দরবারে তাঁর পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আকবর জানতে পারলেন না, তিনি যার প্রশংসা করছেন, সেই যুবক মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছেন—"আজ হাতি বশ করলাম, কাল তোমার সাম্রাজ্যকে এভাবেই হাঁটু গেড়ে বসাব।"
প্রায় তিন বছর আগ্রায় থাকলেন প্রতাপ। এই সময়ে তিনি কেবল মোগলদের যুদ্ধকৌশলই শিখলেন না, তিনি বুঝলেন কূটনীতির মারপ্যাঁচ। তিনি দেখলেন কীভাবে তোষামোদ আর উপঢৌকন দিয়ে বড় বড় কাজ হাসিল করা যায়। তিনি কৌশলে মোগল আমলাদের হাতে প্রচুর উৎকোচ দিয়ে নিজের রাজ্যের জন্য এমন এক 'সনদ' বা ফরমান আদায় করে নিলেন, যা কার্যত যশোহরকে এক স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদা দেয়।
অবশেষে বাড়ি ফেরার দিন এল। প্রতাপ এখন আর সেই আবেগপ্রবণ কিশোর নন, তিনি এখন এক পরিপক্ব রাজনীতিবিদ এবং যোদ্ধা। তাঁর সাথে ফিরছে একদল অভিজ্ঞ কারিগর, যারা আগ্রার অস্ত্রাগারে কাজ করত। প্রতাপ তাদের প্রচুর অর্থের লোভ দেখিয়ে নিজের সাথে নিয়ে নিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য—যশোহরে কামানের কারখানা তৈরি করা।
যাওয়ার আগে তিনি যমুনার দিকে শেষবারের মতো তাকালেন। মনে মনে বললেন, "বিদায় আগ্রা। তুমি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছ। তুমি শিখিয়েছ কীভাবে শাসন করতে হয়, কীভাবে দমন করতে হয়। আমি ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রেখো, আমি আবার আসব না—আমার কামানের গোলারা আসবে তোমার খবর নিতে।"
প্রতাপ যখন বাংলায় ফিরলেন, তখন তিনি সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। তাঁর চোখে এখন আর কেবল স্বপ্ন নেই, আছে এক সুস্পষ্ট পরিকল্পনা (Masterplan)।
ধূমঘাটের প্রাসাদে ফিরে তিনি দেখলেন, পিতা বিক্রমাদিত্য আরও বেশি ধর্মকর্মে মন দিয়েছেন। রাজ্য কার্যত অভিভাবকহীন। প্রতাপ বুঝলেন, সময় হয়েছে।
প্রতাপ সরাসরি রাজসভায় প্রবেশ করলেন। সেনাপতিদের ডেকে তিনি এক নতুন মানচিত্র খুললেন। বললেন, "এই দেখো বাংলা। আজ থেকে আমরা আর করদ রাজ্য নই। আজ থেকে আমরা প্রস্তুত হব যুদ্ধের জন্য।"
সেনাপতিরা অবাক হয়ে তাকালেন। একজন বৃদ্ধ মন্ত্রী বললেন, "যুবরাজ, মোগলদের সাথে যুদ্ধ? এ যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত!"
প্রতাপ টেবিলে ঘুষি মেরে বললেন, "দাস হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বীরের মতো মরা অনেক ভালো। আমি এমন এক বাহিনী গড়ব, যার নাম শুনলে মোগলরা কাঁপবে। আমি চাই পদাতিক, আমি চাই নৌবহর। আর সবথেকে বড় কথা—আমি চাই বারো ভুঁইয়াদের ঐক্য।"
সেই দিন থেকে যশোহরের আকাশে-বাতাসে কেবল যুদ্ধের প্রস্তুতি। কামারশালায় দিনরাত আগুন জ্বলছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন কামান—'যশোহর-জিত', 'কালী-রূপা'। প্রতাপ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছেন।
কিন্তু প্রতাপ জানতেন, তাঁর প্রথম পরীক্ষা মোগলদের সাথে হবে না। তাঁর প্রথম পরীক্ষা হবে নিজের পরিবারের সাথে। কারণ, পিতা বিক্রমাদিত্য ছেলের এই বিদ্রোহ মেনে নিতে পারবেন না। এক প্রবল পিতা-পুত্রের সংঘাত আসন্ন।
(প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত)



0 মন্তব্যসমূহ