সেই সিঙ্গুরে মমতা —বাংলার প্রাপ্তি কি শুধুই ‘জমি হাঙ্গর’ আর কাল্পনিক শিল্প?
সম্পাদকীয়: মানুষের ভাষা
প্রবীর রায়চৌধুরী, সম্পাদক, মানুষের ভাষা:
আজকের দিনটি বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এর প্রধান কারণ, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘ ১৫ বছর পর পুনরায় সিঙ্গুরে এক জনসভা করলেন এবং সেখান থেকে বেশ কিছু নতুন প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেন। সিঙ্গুর আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আমাদের সকলেরই জানা। বাম আমলের সেই জমি রক্ষা আন্দোলন ২০০৬ সালে শুরু হয়ে ২০০৮ সালের অক্টোবরে এক মর্মান্তিক পরিণতির দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। যার ফলস্বরূপ রতন টাটার ন্যানো কারখানা সিঙ্গুর থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন, মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর মধ্যস্থতায় একাধিকবার আলোচনা হলেও কোনো স্থায়ী সুরাহা মেলেনি। সেই ২৬ দিনের ঐতিহাসিক অনশন এবং উত্তাল আন্দোলনের দীর্ঘ ১৫ বছর পর প্রশ্ন উঠছে—সিঙ্গুর কী পেল? আমাদের এই বাংলা ঠিক কী পেল?
সিঙ্গুরের আজকের জনসভায় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে, কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সেখানে ৮ একর জমির ওপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক’ গড়ে তোলা হয়েছে। ২৮টি প্লটের মধ্যে ইতিমধেই ২৫টি বরাদ্দ হয়ে গেছে। এ ছাড়াও ৭৭ একর জমিতে একটি বেসরকারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হচ্ছে এবং অ্যামাজন ও ফ্লিপকার্ট সেখানে বড় ওয়ারহাউস তৈরি করছে। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, "আমরা মুখে বলি না, কাজে করি।"
তবে এখানে একটি বিশেষ বিষয় লক্ষ্য করার মতো। সিঙ্গুর থেকে টাটাকে সরানোর দীর্ঘ ১৫ বছর পর কি তবে এই ‘নতুন সম্ভাবনা’র জন্ম হলো? ৮ একর জমির ওপর একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক? আমি এই বিষয়ে কিছু বিশেষজ্ঞ, প্রখ্যাত আইনজীবী এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলছেন যে, ৮ একর জমিতে একটি আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের শৌচাগার তৈরির জায়গাটুকুও হয়তো সংকুলান হবে না। সেখানে কোন মাপের শিল্প হবে? টাটার ন্যানো কারখানার বিকল্প কি কেবলই অ্যামাজন বা ফ্লিপকার্টের ওয়ারহাউস হতে পারে? ওয়ারহাউস তো মূলত পণ্য মজুত করার গুদাম; তাকে কি আক্ষরিক অর্থে উৎপাদনশীল শিল্প বলা যায়? মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেছেন যে, কৃষিজমি দখল না করেই শিল্প হবে। অর্থাৎ কৃষি এবং শিল্প—উভয়ই সহাবস্থান করবে। বাস্তবতার নিরিখে এ যেন এক অদ্ভুত ‘বকচ্ছপ’ কল্পনা। সাধারণ মানুষ হাটে-মাটে-ঘাটে আজ এই প্রশ্নগুলোই তুলছে।
সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী কেবল সিঙ্গুর নয়, বরং রাজ্যের বিভিন্ন জেলার জন্য ১০০০ কোটি টাকারও বেশি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। যদিও এর বেশিরভাগই সিঙ্গুরের বাইরের প্রকল্প। সেখানে উপস্থিত সাংসদ ও অভিনেতা দীপক অধিকারী (দেব) দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর কথা রেখেছেন। ২০২৪-এ দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি আজ ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের শুভ উদ্বোধন করেছেন। দেবের মতে, এর আগে কেউ কথা রাখেনি। অথচ ২০১১ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ে ঘাটালবাসী শুধু বন্যার পর বন্যার সাক্ষী থেকেছে। আজ ভোটের মাত্র তিন মাস আগে এই মেগা উদ্বোধনগুলো নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে। অনেকে প্রশ্ন করছেন—বিরোধী দলনেতারা যখন ভোটের মুখে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সমালোচনা করেন, তখন রাজ্যের এই শেষ মুহূর্তের ঘোষণার নেপথ্যে কি ভোট বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল নেই?
তবে সিঙ্গুর আন্দোলনের সবথেকে বড় ‘সাফল্য’ বা ফলাফল সম্ভবত অন্য কিছু। এই আন্দোলন জন্ম দিয়েছে এক বিশেষ শ্রেণির—যাঁদের আমরা ‘জমি হাঙ্গর’ নামে চিনি। গত ১৫ বছরে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে-শহরে অসংখ্য জমি হাঙ্গর তৈরি হয়েছে। বিএলআরও (BLRO), এসডিএলআরও (SDLRO) বা রেজিস্ট্রি অফিসে খোঁজ নিলে দেখা যাবে, কীভাবে জাল দলিল ও পর্চা তৈরি করে সাধারণ মানুষের জমির স্বত্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে জমি দখল করে সেখানে হোটেল বা ফ্ল্যাট তৈরি হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ধরণের প্রেশার এবং জমি হাতিয়ে নেওয়ার চক্রান্তের একজন ভুক্তভোগী।
সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক হলো আইনি জটিলতা। যদি বিএলআরও অফিস থেকে আপনার নাম কেটে দেওয়া হয়, তবে সেটি প্রমাণের দায় সম্পূর্ণ আপনার ওপর বর্তায়। জমি লুট হওয়ার পর আপনাকে আইনজীবী ধরে বছরের পর বছর কোর্টে দৌড়াতে হবে। জমি হাঙ্গররা প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছে— "থানা, আদালত, বিএলআরও অফিস সবই আমাদের নিয়ন্ত্রণে; তুমি যে আইনজীবীই ধরো না কেন, আমরা তাকে কিনে নেব।" সাধারণ মানুষের লড়াই করার ক্ষমতা সীমিত, তাই তারা বাধ্য হয়ে মাথা নিচু করে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে ভিটেমাটি ছাড়ছে।
আজ সিঙ্গুরের সেই কৃষি জমি বন্ধ্যা হয়ে গেছে। কৃষকরা বলছেন, ১২ ফুট খুঁড়লেও সেখানে আর চাষাবাদ সম্ভব নয়। না হলো শিল্প, না থাকল কৃষি। সন্দেশখালি, দেগঙ্গা, বসিরহাট বা হাসনাবাদ—বিগত বছরগুলোতে জমি লুটের মাধ্যমে এক বৃহৎ ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করেছি। আজ না হোক কাল, এই টাকার উৎস এবং জমি হাঙ্গরদের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালীদের তদন্ত হতেই হবে। ১৫ বছর পর সিঙ্গুরে গিয়ে প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়তো রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের হাহাকার একদিন সুনামির মতো ভোটবাক্সে আছড়ে পড়বে। চিরদিন কারও সমান যায় না—বাংলার রাজনীতিতে বাম জমানার অবসানই তার সবথেকে বড় প্রমাণ।
আমাদের প্রতিবেদন সম্পর্কে আপনার মতামত কমেন্টে জানান। মানুষের ভাষা সব সময় মানুষের মনের কথা বলে। নজরে রাখুন মানুষের ভাষায়।

0 মন্তব্যসমূহ