মেখলিগঞ্জ (১): ২০২৬-এর নির্বাচনী কুরুক্ষেত্র
মানুষের ভাষা বিশেষ রিপোর্ট
তারিখ: ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬
ব্লগ: মানুষের ভাষা (Manusher Bhasha)
আসন নম্বর: ১ (তফসিলি জাতি সংরক্ষিত)
জেলা: কোচবিহার
ভূমিকা: সীমান্তের বাতাসে পরিবর্তনের সুর
কোচবিহারের মেখলিগঞ্জ—নামের মধ্যেই মিশে আছে রাজবংশী আভিজাত্য এবং ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অস্থির ভৌগোলিক বাস্তবতা। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মেখলিগঞ্জের রাজনৈতিক সমীকরণ ততই জটিল হচ্ছে। এককালে বামেদের এই দুর্ভেদ্য দুর্গ এখন তৃণমূলের দখলে থাকলেও, সেই দখলের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে সাম্প্রতিক SIR (Special Intensive Revision)-এর বিতর্কিত ভোটার তালিকা এবং রাজবংশী আবেগ। ৫৪ শতাংশ ভোটারের সমর্থন কি আজও অটুট, নাকি ১৯ শতাংশ ভোটারের নাম উধাও হওয়ার ক্ষত এক নয়া মহাপ্রলয়ের সংকেত? মানুষের ভাষায় আজ মেখলিগঞ্জের রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদ।
নির্বাচনী ইতিহাস: ২০১১ থেকে ২০২৪ (একনজরে)
মেখলিগঞ্জের রাজনৈতিক ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল:
| বছর | বিজয়ী প্রার্থী | দল | নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী | দল | ব্যবধান |
| ২০১১ | পরেশ চন্দ্র অধিকারী | ফরওয়ার্ড ব্লক | জয়ন্ত কুমার রায় | কংগ্রেস | ৩২,৬৩২ |
| ২০১৬ | অর্ঘ্য রায় প্রধান | তৃণমূল (TMC) | পরেশ চন্দ্র অধিকারী | ফরওয়ার্ড ব্লক | ৬,৬৩৭ |
| ২০২১ | পরেশ চন্দ্র অধিকারী | তৃণমূল (TMC) | দধিরাম রায় | বিজেপি (BJP) | ১৪,৬৮৫ |
২০২৪ লোকসভা সমীকরণ:
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে জলপাইগুড়ি লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত মেখলিগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় বিজেপি বড়সড় লিড বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ রাজবংশী ভোট ব্যাংকে তৃণমূলের তুলনায় বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।
গভীর বিশ্লেষণ: SIR ১-ম পর্যায় ও ভোটার বিয়োজনের প্রভাব
২০২৬-এর নির্বাচনের আগে মেখলিগঞ্জে সবথেকে বড় আলোচনার বিষয় হলো SIR (বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনী)। খসড়া রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, কোচবিহারের এই সীমান্তবর্তী আসনে ভোটার তালিকায় নাম বিয়োজনের হার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
আতঙ্ক: রাজ্যজুড়ে প্রায় ৫৮ লক্ষ নাম উধাও হওয়ার তালিকায় মেখলিগঞ্জও পিছিয়ে নেই।
প্রভাব: সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এখানে 'ডিজিটাল এনআরসি'র জুজু কাজ করছে। তবে মজার বিষয় হলো, যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের বড় অংশই সেই সব মানুষ যারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
বিজেপি ফ্যাক্টর: বিজেপি এই ভোটার তালিকা বিভ্রাটকে 'তৃণমূলের ষড়যন্ত্র' হিসেবে প্রচার করছে। তাদের দাবি, সচেতনভাবে বিরোধী ভোটারদের নাম ছেঁটে ফেলার চেষ্টা চলছে। এই প্রচারটি রাজবংশী এবং হিন্দু ভোটারদের মধ্যে এক প্রবল মেরুকরণ তৈরি করেছে, যা পক্ষান্তরে বিজেপির শক্তি বৃদ্ধি করছে।
জনতাত্ত্বিক সমীকরণ ও মুসলিম ভোট ব্যাংকের গতিপ্রকৃতি
মেখলিগঞ্জের ভোটার বিন্যাস যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য মাথাব্যথার কারণ:
তফসিলি জাতি (SC): এই কেন্দ্রের প্রায় ৭১.২৪% ভোটার তফশিলি জাতিভুক্ত, যাদের সিংহভাগ রাজবংশী সম্প্রদায়ভুক্ত।
রাজবংশী আবেগ: কামতাপুর বা গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলন মেখলিগঞ্জের রাজনীতিতে সবসময়ই অক্সিজেন যোগায়। বিজেপি কেন্দ্রীয়ভাবে রাজবংশী ভাবাবেগকে সম্মান দেওয়ায় এখানে তাদের পাল্লা ভারী।
মুসলিম ভোট (১৯.২৬%): মেখলিগঞ্জের প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার সংখ্যালঘু, গত নির্বাচনে এই ভোট নিরেটভাবে তৃণমূলের পক্ষে গেলেও, ২০২৬-এর সমীকরণ সম্পূর্ণ আলাদা।
নওশাদ-হুমায়ুন ফ্যাক্টর ও মুসলিম ভোটের ভাঙন:
নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ (ISF) এবং বিদ্রোহী হুমায়ুন কবীরের ‘মুসলিম ঐক্য’-এর প্রভাব এখন উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত পৌঁছেছে। মেখলিগঞ্জের তরুণ মুসলিম ভোটাররা আর কেবল ‘বিজেপির ভয়’ দেখে তৃণমূলকে ভোট দিতে রাজি নয়। যদি আইএসএফ এবং বাম-কংগ্রেস জোট এখানে প্রার্থী দেয়, তবে সংখ্যালঘু ভোট অন্তত তিন ভাগে বিভক্ত হবে। আর এই বিভাজনের সরাসরি লাভ ঘরে তুলবে বিজেপি।
বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জোট সমীকরণ
পরেশ অধিকারী ফ্যাক্টর: শিক্ষা নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় নাম জড়ানোর পর প্রাক্তন মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর ভাবমূর্তি ড্যামেজ হয়েছে। তৃণমূলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমছে।
বিজেপির ‘নীরব’ সংগঠন: বিজেপি এখানে আগের মতো হইচই না করে ‘বুথ টু বুথ’ লড়াইয়ে মন দিয়েছে। সীমান্তের মানুষের সমস্যা—যেমন বিএসএফ-এর কড়াকড়ি বনাম চোরাচালান—নিয়ে তারা সুকৌশলে প্রচার চালাচ্ছে।
বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট: যদি সিপিআই(এম), কংগ্রেস এবং আইএসএফ-এর মধ্যে কোনো অঘোষিত বোঝাপড়া হয়, তবে মেখলিগঞ্জে তৃণমূলের ২০২৪-এর অবশিষ্ট গড়ও ধসে যেতে পারে।
ওপিনিয়ন পোল ও পূর্বাভাস (মানুষের ভাষা সমীক্ষা)
আমাদের সমীক্ষা এবং বর্তমান পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ করে মেখলিগঞ্জের চিত্রটা নিম্নরূপ:
বিজেপি (BJP): ৪৬% (রাজবংশী ভোট এবং SIR ক্ষোভের কারণে এগিয়ে)
তৃণমূল (TMC): ৩৮% (প্রশাসনের সুবিধা থাকলেও নিয়োগ দুর্নীতি ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জর্জরিত)
বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট: ১৪% (মুসলিম ভোট কাটার প্রধান মাধ্যম)
অন্যান্য: ২%
ফাইনাল প্রোবাবিলিটি (কে জিততে পারে?)
বিজেপির জয়ের সম্ভাবনা: ৭০%
তৃণমূলের জয়ের সম্ভাবনা: ৩০%
যুক্তি: মেখলিগঞ্জ ১ নম্বর আসনে বিজেপি ২০২৪-এর লোকসভা লিড বজায় রাখতে তো পারবেই, উল্টে SIR-পরবর্তী হিন্দু মেরুকরণ এবং সংখ্যালঘু ভোটের বিভাজনের ফলে জয়ের ব্যবধান বাড়াতে পারে। যদি বিজেপি রাজবংশী সম্প্রদায়ের কোনো প্রভাবশালী মুখকে টিকিট দেয়, তবে তৃণমূলের পরাজয় কেবল সময়ের অপেক্ষা।
ট্যাগসমূহ (Viral Tags):
#MekhliganjElection2026 #WestBengalPolitics #BJPBengal #TMC #SIRListControversy #NawsadSiddiqui #HumayunKabir #CoochBeharNews #ManusherBhasha #BengalVote2026 #RajbanshiPride

0 মন্তব্যসমূহ