Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

মেগা লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ভবানীপুর: "মমতাকে হারালেই বাংলায় পরিবর্তনের শর্টকাট", শুভেন্দুর হয়ে প্রচারে হুঙ্কার অমিত শাহের


 মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: আগামী ২০২৬ সালের হাই-ভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনকে  কেন্দ্র করে এখন থেকেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে বঙ্গ রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের ঘুঁটি সাজাতে শুরু করেছে। তবে সমস্ত জল্পনা এবং রাজনৈতিক সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে এবার উঠে এল কলকাতার প্রাণকেন্দ্র— ভবানীপুর। মুখ্যমন্ত্রীর নিজের খাসতালুকে এবার তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে পদ্ম শিবিরের হয়ে নির্বাচনী ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। আর সেই মেগা লড়াইয়ের দামামা বাজাতে, খোদ শুভেন্দু অধিকারীর নমিনেশন বা মনোনয়ন পেশের আগে এক বিশাল শোভাযাত্রা এবং জনসভায় উপস্থিত হয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে কার্যত রণহুঙ্কার দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ।

শহরের রাজপথে দাঁড়িয়ে অমিত শাহের স্পষ্ট বার্তা, "পুরো বাংলায় পরিবর্তনের জন্য ১৭০টি আসন জেতার দরকার নেই। আমার কাছে একটা 'শর্টকাট' আছে। ভবানীপুরের মানুষ যদি শুধুমাত্র এই একটি আসনে মমতাকে হারিয়ে দেন, তবে গোটা বাংলায় আপনা থেকেই পরিবর্তন চলে আসবে!" অমিত শাহের এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

'আধুনিক চাণক্য' অমিত শাহ এবং শুভেন্দুর হুঙ্কার

ভবানীপুরে আয়োজিত এই মেগা জনসভায় অমিত শাহের বক্তব্য রাখার ঠিক আগেই মঞ্চে ওঠেন নন্দীগ্রামের বিধায়ক তথা ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর গলায় শোনা যায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি অগাধ আস্থা এবং ভূয়সী প্রশংসা। ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অমিত শাহকে 'আধুনিক চাণক্য' আখ্যা দিয়ে শুভেন্দু বলেন, "আমাদের গর্বিত ভারতবর্ষের রাজনীতিতে আধুনিক চাণক্য হলেন মাননীয় অমিত শাহ জি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঠিক পথপ্রদর্শনে আজ দেশের ২১টি রাজ্যে এনডিএ (NDA) সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।"

শুভেন্দু আরও বলেন, "আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় নেতা, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ছিল, তা পূরণ করে কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা বিলোপ করেছেন এই অমিত শাহ। আজ তিনি আমাদের মধ্যে এসেছেন তাঁর আশীর্বাদ দিতে। যিনি পশ্চিমবঙ্গকে অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে বাঁচাবেন, নারী সুরক্ষার ব্যবস্থা করবেন এবং কট্টরপন্থী জামাতের কালো ছায়া থেকে বাংলার মাটিকে মুক্ত করবেন।"

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামের মেগা ফাইট এবং সেই ঐতিহাসিক ফলাফলের প্রসঙ্গ টেনে এনে শুভেন্দু অধিকারী প্রবল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করেন, "সেদিন যেমন নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরেছিলেন, এবার ঠিক তেমনই ভবানীপুরেও তিনি হারবেন। পরিবর্তন নিশ্চিত। মোদী জির নেতৃত্বেই বাংলায় সরকার গড়বে ভারতীয় জনতা পার্টি।"

"১৫ দিন বাংলাতেই থাকব": শাহের প্রত্যয়ী ঘোষণা

শুভেন্দু অধিকারীর বক্তৃতার পর প্রবল হর্ষধ্বনি এবং 'ভারত মাতা কি জয়', 'জয় শ্রী রাম' স্লোগানের মধ্যে দিয়ে মঞ্চে মাইক হাতে নেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঞ্চে তখন উপস্থিত বিজেপির রাজ্য সভাপতি-সহ দলের চার হেভিওয়েট প্রার্থী— ভবানীপুর থেকে শুভেন্দু অধিকারী, রাসবিহারী থেকে ডঃ স্বপন দাশগুপ্ত, বালিগঞ্জ থেকে শত্রুঘ্ন ঘোষ এবং চৌরঙ্গী থেকে সন্তোষ পাঠক।

বক্তব্যের শুরুতেই অমিত শাহ স্পষ্ট করে দেন যে তিনি এই মুহূর্তে লম্বা রাজনৈতিক ভাষণ দিতে আসেননি, বরং তাঁর লক্ষ্য অনেক গভীরে। তিনি বলেন, "আমি আজ এখানে লম্বা ভাষণ দেব না। কারণ, আসন্ন নির্বাচনের আগে টানা ১৫ দিন আমি এই বাংলাতেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকব। আপনাদের সকলের সঙ্গে আমার বারবার দেখা হবে, কথা হবে। আজ আমি মূলত এসেছি আমাদের চার প্রার্থীর, বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পেশের এই পবিত্র লগ্নে তাঁদের আশীর্বাদ ও শুভকামনা জানাতে।"

শাসকদলের বিরুদ্ধে তোপ: তোলাবাজি, অনুপ্রবেশ ও দুর্নীতি

অমিত শাহ তাঁর ভাষণে রাজ্যের বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনেন। তাঁর নিশানায় ছিল মূলত রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দুর্নীতি এবং বেআইনি অনুপ্রবেশের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুগুলি।

"আমি ইতিমধ্যেই বাংলার কোণায় কোণায় ঘুরেছি। কলকাতা থেকে শুরু করে দুর্গাপুর, উত্তরবঙ্গ— সর্বত্র মানুষের মুখে একটাই আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। সবাই বলছেন, এই সরকার বদলে দাও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'বাই-বাই, টাটা' করে দাও," চরম কটাক্ষের সুরে বলেন শাহ।

তিনি অভিযোগ করেন যে, বাংলার সাধারণ মানুষ আজ তৃণমূলের 'তোলাবাজি' এবং সিন্ডিকেট রাজের কারণে চরম ত্রস্ত। তিনি বলেন, "তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের নিত্যদিনের গুন্ডামি মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। মহিলারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত। প্রতিদিন বোমাবাজি, গুলি চলার ঘটনা ঘটছে। রাজ্যের যুবসমাজ বেকারত্বের জ্বালায় জর্জরিত।"

সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে শাহ অনুপ্রবেশের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, "বিনা বাধায়, অবাধে অনুপ্রবেশ ঘটে চলেছে এই রাজ্যে। এর ফলে বাংলার ডেমোগ্রাফি বা জনবিন্যাস সম্পূর্ণভাবে বদলে যাচ্ছে। পশ্চিমবাংলার অস্তিত্ব আজ গভীর সঙ্কটের মুখে। আর এর পাশাপাশি রয়েছে দুর্নীতির পাহাড়। দুর্নীতির যত রেকর্ড মমতা জি তৈরি করেছেন, তাতে সারা বাংলার মানুষ আজ ক্ষুব্ধ এবং অবিলম্বে পরিবর্তন চাইছে।"

'শর্টকাট' তত্ত্ব: ভবানীপুরেই লুকিয়ে পরিবর্তনের চাবিকাঠি

অমিত শাহের এই মেগা সভার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চমকটি ছিল তাঁর 'শর্টকাট' তত্ত্ব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করতেই অত্যন্ত সুকৌশলে এই চাল চেলেছেন 'আধুনিক চাণক্য'।

ভবানীপুরের ভোটারদের সরাসরি উদ্দেশ্য করে শাহ বলেন, "পুরো বাংলা তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিদায় জানাতে প্রস্তুত হয়েই বসে আছে। কিন্তু ভবানীপুরের ভাই ও বোনেরা, আপনারা কি জানেন যে পুরো বাংলায় পরিবর্তন আনার আসল ক্ষমতা আপনাদেরই হাতে? সাধারণত, নিয়ম হলো একটা একটা করে আসন জিতে অন্তত ১৭০টি আসনে পৌঁছাতে হবে, তবেই সরকার পরিবর্তন হবে। তাই তো? কিন্তু আমার কাছে একটা জাদুকরী শর্টকাট আছে।"

তিনি আরও যোগ করেন, "যদি শুধুমাত্র ভবানীপুরের মানুষ একজোট হয়ে এই একটিমাত্র আসনে পদ্মফুল ফুটিয়ে দেন এবং মমতাকে হারিয়ে দেন, তবে বাংলায় পরিবর্তন নিজের থেকেই হয়ে যাবে। শুভেন্দু দা তো নিজের এলাকা নন্দীগ্রাম থেকেই লড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমিই তাঁকে বলেছিলাম যে, শুধু নন্দীগ্রামে নয়, এবার মমতার নিজের ঘরে ঢুকে তাঁকে হারিয়ে আসতে হবে।"

ভয়মুক্ত নির্বাচনের ডাক এবং 'সোনার বাংলা' গড়ার স্বপ্ন

রাজ্যের নির্বাচন এলে বারবার যে হিংসা এবং রক্তপাতের ছবি উঠে আসে, সেই বিষয়েও কড়া বার্তা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, "আজ সকালে কয়েকজন সাংবাদিক আমাকে ফোন করে বলছিলেন যে, 'পরিবেশ তো খুব ভালো, বাংলার মানুষ পরিবর্তন চাইছে ঠিকই, কিন্তু তৃণমূলের গুন্ডারা তো ভোটই দিতে দেবে না।' আমি তাঁদের স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছি, এবার আর কাউকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কোনো গুন্ডার এমন কোনো ক্ষমতা বা ঔদ্ধত্য নেই যে তারা বাংলার ভোটারদের আটকে রাখতে পারে।"

সাধারণ মানুষকে সাহস জুগিয়ে তাঁর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা, "এবার সম্পূর্ণ ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটদান হবে। টিএমসি-কে শুধু হারানো নয়, তাদেরকে শিকড় সমেত উপড়ে ফেলে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলতে হবে।"

বক্তৃতার শেষ পর্বে অমিত শাহ বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ডাক দেন। ২০১৪ সাল থেকে যে যে রাজ্যে মানুষ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ওপর ভরসা করে বিজেপি সরকার এনেছে, সেই রাজ্যগুলি আজ উন্নয়নের শিখরে পৌঁছেছে বলে তিনি দাবি করেন।

"এবার আমাদের বাংলার পালা। অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে চিরতরে তাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের বর্ডার সম্পূর্ণ সিল করে দেওয়া হবে। স্বামী বিবেকানন্দ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের যে কল্পনার 'সোনার বাংলা' ছিল, আমরা সেই সোনার বাংলাই নতুন করে গড়ে তুলব," প্রতিশ্রুতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code