Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোটের মুখে দেশজুড়ে আইপ্যাকের দপ্তরে ইডির মেগা তল্লাশি: নিশানায় কি কয়লা পাচারের কালো টাকা?


 

মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: একদিকে রাজ্যে বাজতে শুরু করেছে লোকসভা নির্বাচনের রণডঙ্কা। রাজনৈতিক উত্তাপ কার্যত চরমে। হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রগুলিতে চলছে জোরদার প্রচার ও মনোনয়ন পেশের পর্ব। খোদ শহর কলকাতায় যখন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পারদ চড়াচ্ছেন এবং স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর নির্বাচনী প্রচারের ময়দানে ব্যস্ত, ঠিক সেই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।

তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী কৌশলী বা 'ভোট-কৌশলী' সংস্থা হিসেবে পরিচিত আইপ্যাক (I-PAC)-এর দেশের তিন বড় শহরের দপ্তরে একযোগে আচমকা হানা দিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। মঙ্গলবার সকাল থেকে হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং দিল্লির আইপ্যাক কার্যালয়ে শুরু হয়েছে ইডির এই ম্যারাথন তল্লাশি। একইসঙ্গে এই সংস্থার অন্যতম শীর্ষ ডিরেক্টর ঋষিরাজ সিংয়ের বাসভবনেও কড়া পাহারায় চলছে জোরদার চিরুনি অভিযান।

নির্বাচনের ঠিক মুখেই ভোট-কৌশলী সংস্থার দপ্তরে ইডির এই মেগা তল্লাশি রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটি নিছক কোনো রুটিন তল্লাশি নয়, বরং এর শিকড় লুকিয়ে রয়েছে এ রাজ্যের বহুল চর্চিত কয়লা কেলেঙ্কারি বা কোল স্ক্যামের গভীরে।

হাওলা, হুন্ডি এবং কয়লা কেলেঙ্কারির ভূত

ইডি সূত্রে খবর, আইপ্যাকের দপ্তরে এই দেশজোড়া তল্লাশি অভিযানের মূল ভিত্তি হলো প্রায় চার বছর ধরে চলতে থাকা কয়লা পাচার মামলা। গোয়েন্দাদের দাবি, আসানসোল-রানিগঞ্জ খনি অঞ্চল থেকে বেআইনিভাবে তোলা কয়লা পাচারের হাজার হাজার কোটি টাকা হাওলা এবং হুন্ডির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিদেশেও পাচার করা হয়েছে। এই মানি লন্ডারিং বা আর্থিক তছরুপের বিশাল চক্রের তদন্ত করতে গিয়েই আইপ্যাকের নাম উঠে এসেছে তদন্তকারীদের স্ক্যানারে।

প্রাথমিক তদন্তে ইডির আধিকারিকরা সন্দেহ করছেন যে, কয়লা পাচারের অন্যতম মূল চক্রী অনুপ মাঝি ওরফে লালা এবং তার সাগরেদদের হাত ঘুরে আসা এই কালো টাকার একটি বড় অংশ প্রভাবশালীদের মাধ্যমে রাজনৈতিক ফান্ডিং হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। ভোট পরিচালনার বিপুল ব্যয়ভার বহন করার ক্ষেত্রে ওই বেআইনি অর্থের কোনো লেনদেন আইপ্যাকের মাধ্যমে হয়েছিল কি না, মূলত সেই তথ্য বা 'মানি ট্রেল' (Money Trail) খুঁজতেই তিন শহরের দপ্তরে হানা দিয়েছেন ইডি কর্তারা। সংস্থার আর্থিক লেনদেনের হিসেব, ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্ট এবং ডিজিটাল রেকর্ডগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

সল্টলেকে সংঘাত এবং মুখ্যমন্ত্রীর বেনজির হস্তক্ষেপ

আইপ্যাক এবং ইডির মধ্যে এই সংঘাত কিন্তু আজকের নয়। এর আগেও আইপ্যাকের শীর্ষ কর্ণধার প্রতীক জৈনের সল্টলেক সেক্টর ফাইভের অফিস এবং বাসভবনে ইডি আচমকা তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল। সেই তল্লাশি ঘিরে যে বেনজির নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে কার্যত বিরল।

সেদিন ইডির তল্লাশি চলাকালীন সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে আইপ্যাকের দপ্তরে এবং প্রতীক জৈনের বাড়িতে সশরীরে হাজির হয়েছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডির তরফ থেকে পরবর্তীতে আদালতে অভিযোগ জানানো হয় যে, তল্লাশি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী সেখানে প্রবেশ করে ইডির কাজে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন। শুধু তাই নয়, আইপ্যাকের দপ্তর থেকে বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, হার্ড ড্রাইভ এবং গোপন নথিপত্র সমেত ফাইল তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে যান বলে অভিযোগ করে কেন্দ্রীয় সংস্থা।

ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এরপর মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি ইডির দপ্তরেও পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কিছু নথি নিয়ে তিনি বেরিয়ে আসেন বলে ইডির তরফে দাবি করা হয়। একটি স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের এহেন হস্তক্ষেপ দেশের আইনি ব্যবস্থায় এক বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। সেই সংঘাতের রেশ গড়িয়েছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত।

শীর্ষ আদালতে ইডির সওয়াল: 'পশ্চিমবঙ্গের পরিবেশ বৈরী'

আইপ্যাকের দপ্তরে মুখ্যমন্ত্রীর প্রবেশ এবং নথি নিয়ে যাওয়ার ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইডি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কাকতালীয়ভাবে, যেদিন হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং দিল্লিতে আইপ্যাকের দপ্তরে ইডির তল্লাশি চলছে, ঠিক সেদিনই সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি ছিল।

শুনানি চলাকালীন ইডির আইনজীবীরা শীর্ষ আদালতে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর সওয়াল করেন। তাঁরা আদালতকে জানান যে, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে যে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির জন্য অত্যন্ত 'বৈরী' (Hostile)। রাজ্যে ইডি আধিকারিকরা নিরাপদে এবং স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারছেন না।

এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই ইডি সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানিয়েছে যে, আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈন বা অন্য আধিকারিকদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কলকাতার বদলে পশ্চিমবঙ্গের বাইরে, বিশেষ করে ইডির দিল্লির সদর দপ্তরে তলব করার অনুমতি দেওয়া হোক। ইডির আশঙ্কা, কলকাতায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে ফের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হতে পারে তদন্তপ্রক্রিয়া।

ভোটের মুখে রাজনৈতিক অভিসন্ধি? তৃণমূলের পাল্টা তোপ

নির্বাচনের ঠিক এক মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে আইপ্যাকের মতো একটি ভোট-কৌশলী সংস্থার ওপর ইডির এই সাঁড়াশি আক্রমণ স্বাভাবিকভাবেই শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষোভের আগুন ঘৃতাহুতি দিয়েছে।

তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই অভিযোগ করে আসছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এবং বিরোধীদের নির্বাচনী কৌশল ভেস্তে দিতে ইডি-সিবিআইয়ের মতো এজেন্সিকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করছে। তৃণমূলের বক্তব্য, আইপ্যাক তৃণমূলের আসন্ন নির্বাচনের সমস্ত রূপরেখা, প্রার্থী তালিকা এবং প্রচারের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছে। ইডি তল্লাশির নামে আসলে সেই গোপন রাজনৈতিক কৌশল এবং আগামী দিনের প্ল্যানিং হাতিয়ে নিতে চাইছে, যাতে ভোটের ময়দানে বিজেপি অন্যায্য সুবিধা পেতে পারে।

বিরোধী শিবির, বিশেষত রাজ্য বিজেপির দাবি সম্পূর্ণ উল্টো। তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, শাসকদলের মদতেই কয়লা কেলেঙ্কারির মতো বিশাল দুর্নীতি সংঘটিত হয়েছে এবং সেই কালো টাকা দিয়েই ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার ছক কষা হয়েছে। আইন আইনের পথে চলছে এবং দুর্নীতিগ্রস্তরা নির্বাচনের দোহাই দিয়ে পার পেতে পারে না বলে পাল্টা দাবি গেরুয়া শিবিরের।

শহরের বুকে ইডির ধারাবাহিক তৎপরতা

শুধুমাত্র আইপ্যাক নয়, গত কয়েকদিন ধরে খোদ কলকাতা শহরেও ইডির অতিসক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। সম্প্রতি বালিগঞ্জ, কসবা এবং ঢাকুরিয়া এলাকার 'ত্রাস' বলে পরিচিত বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর বিলাসবহুল প্রাসাদ এবং তার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত একাধিক ঠিকানায় তল্লাশি চালিয়েছে ইডি। উদ্ধার হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকার কাছাকাছি নগদ অর্থ এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো প্রক্রিয়া যখন চলছে এবং নির্বাচন কমিশন যখন রাজ্যে কড়া হাতে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময়ে ইডির এই ধারাবাহিক অভিযানগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট বার্তা রয়েছে। ভোটের আগে কালো টাকার ব্যবহার এবং মানি লন্ডারিং চক্রের কোমর ভেঙে দিতে যে কেন্দ্রীয় সংস্থা বদ্ধপরিকর, এই পদক্ষেপগুলি তারই ইঙ্গিতবাহী।

ভবিষ্যতের রূপরেখা

আইপ্যাকের দপ্তরে চলা এই মেগা তল্লাশির নির্যাস ঠিক কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন। হায়দ্রাবাদ, বেঙ্গালুরু বা দিল্লির দপ্তর থেকে ইডি আধিকারিকরা কয়লা কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত কোনো বিস্ফোরক নথি বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ উদ্ধার করতে পারলেন কি না, তার ওপর নির্ভর করছে এই মামলার ভবিষ্যৎ।

তবে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট— সুপ্রিম কোর্ট যদি ইডির আবেদনে সাড়া দিয়ে প্রতীক জৈন বা আইপ্যাকের শীর্ষ কর্তাদের দিল্লিতে তলব করার অনুমতি দেয়, তবে ভোটের ঠিক মুখে তা তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য একটি বড়সড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোট-কৌশলীদের যদি তদন্তের গেরোয় দিল্লিতে গিয়ে বসে থাকতে হয়, তবে তা শাসকদলের নির্বাচনী প্রচার এবং রণকৌশলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

রাজ্য রাজনীতি বর্তমানে এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাজনৈতিক প্রচারের কোলাহল, অন্যদিকে আদালতের নির্দেশে তদন্তকারী সংস্থার নিঃশব্দ অথচ ধারালো পদক্ষেপ। এই দ্বিমুখী লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কার রাজনৈতিক ফায়দা হবে এবং কারা কোণঠাসা হবে, তা জানার জন্য আগামী কয়েকটি সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। মানুষের ভাষা ব্লগের নিউজ ডেস্ক নজর রাখছে প্রতি মুহূর্তের আপডেটে।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code