Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ভোটের মুখে ফের শাসানির সুর! ২৪ ঘণ্টায় জামিন পেয়েই '২৩ তারিখের পর দেখে নেওয়ার' হুঁশিয়ারি তৃণমূল নেতার


মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক

কলকাতা: শিয়রে নির্বাচন। আর ভোট এলেই বঙ্গ রাজনীতির আকাশ কালো করে নেমে আসে ভয়, হুমকি আর পেশিশক্তির আস্ফালনের চেনা ছবি। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎসবে সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় এক শ্রেণির রাজনৈতিক নেতার দাদাগিরি। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ভোটারদের সরাসরি ভয় দেখিয়ে গ্রেফতার হওয়ার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যক্তিগত বন্ডে জামিন পেয়ে গেলেন এক তৃণমূল নেতা। আর জেল থেকে বেরিয়েই তাঁর গলায় শোনা গেল আরও মারাত্মক হুমকি— “যা হবে ২৩ তারিখের পর!” এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে জোর তরজা। বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন এবং পুলিশ প্রশাসনের নাকের ডগাতেই শাসকদলের নেতারা সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করার লাইসেন্স পেয়ে গিয়েছেন।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের এক দাপুটে ওয়ার্ড সভাপতি, রাজু মণ্ডল। একটি ভাইরাল ভিডিওর জেরে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। কিন্তু যেভাবে তিনি তড়িঘড়ি জামিন পেলেন এবং বেরিয়ে এসে ফের বুক ফুলিয়ে হুমকি দিলেন, তা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত: ‘বাড়িতে রসগোল্লা ও ছানাবড়া পাঠিয়ে দেব’

ভোটের দিন যত এগোচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলির প্রচারের পারদ ততই চড়ছে। কিন্তু প্রচারের আড়ালে যে কীভাবে সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখানো হচ্ছে, তা রাজু মণ্ডলের একটি বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয় , যেখানে তৃণমূলের ওই ওয়ার্ড সভাপতিকে প্রকাশ্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষকে কার্যত শাসাতে দেখা যায়।

ভিডিওতে রাজু মণ্ডলকে বলতে শোনা যায়, "কখনো ভোট দেওয়া যাবে না। যদি ভোট গন্ডগোল হয়েছে, তাহলে ভোট দিতে যাওয়ার দরকার নাই। বাড়িতে আমি রসগোল্লা ছানাবড়া  পাঠিয়ে দেব।" রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘রসগোল্লা’ ও ‘ছানাবড়া ’ নিছক মিষ্টিমুখের প্রস্তাব নয়। এটি আসলে ভোটারদের প্রতি এক প্রচ্ছন্ন হুমকি। এর সোজা অর্থ হলো— ভোটের দিন যদি এলাকায় অশান্তি হয়, তবে বাড়ি থেকে বেরোনোর কোনো প্রয়োজন নেই। চুপচাপ ঘরে বসে থাকাই শ্রেয়, নচেৎ বিপদে পড়তে হতে পারে।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক নাগরিকের ভোট দেওয়ার অধিকার একটি সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু একজন রাজনৈতিক নেতার মুখে এই ধরনের কথা সরাসরি সেই অধিকার খর্ব করার শামিল। তিনি আরও বলেন, "এ বছর যেন ভোট নষ্ট না হয়, পরিষ্কারভাবে বলে দিচ্ছি।" অর্থাৎ, দলের বাইরে অন্য কাউকে ভোট দেওয়া যে তিনি কোনওভাবেই বরদাস্ত করবেন না, তা তাঁর শরীরী ভাষা এবং কথাতেই স্পষ্ট ছিল।

‘পাড়ার ছেলে’ তত্ত্ব এবং সিন্ডিকেট রাজের ছায়া

রাজু মণ্ডলের বক্তব্যে উঠে এসেছে আরও একটি পরিচিত রাজনৈতিক কৌশল— ‘পাড়ার ছেলে’ তত্ত্ব। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "আর আমাদেরকে জিতিয়ে যদি কাজ করাতে হয়, প্রত্যেকটা বিষয়ে পাড়ার ছেলে পাড়ার লোক যারা তৃণমূল করে, মানুষের পাশে থাকে ২৪ ঘণ্টা, তাদেরকে ভোট দিতে হবে।"

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই ‘পাড়ার ছেলে’ বা স্থানীয় দাদাদের দাপট নতুন কিছু নয়। অভিযোগ, এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে এই পাড়ার নেতারাই কার্যত ছড়ি ঘোরান। রাজু মণ্ডলের এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সেই সিন্ডিকেট রাজ এবং অলিখিত দাদাগিরির ছবিটাই যেন আরও একবার পরিষ্কার হয়ে গেল। বিরোধীদের দাবি, সাধারণ মানুষকে এটা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, তৃণমূলকে ভোট না দিলে এলাকায় শান্তিতে বসবাস করা বা কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

গ্রেফতারি এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নাটকীয় জামিন

ভিডিওটি ভাইরাল হতেই স্বাভাবিকভাবে রাজ্যজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। বিরোধী দলগুলি নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয় এবং অবিলম্বে অভিযুক্ত নেতার গ্রেফতারের দাবি তোলে। চাপে পড়ে পুলিশ পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং রাজু মণ্ডলকে গ্রেফতার করে। কিন্তু এই গ্রেফতারি যে নেহাতই আইওয়াশ বা লোক দেখানো ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে যায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই।

আদালতে পেশ করার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ব্যক্তিগত বন্ডে (Personal Bond) জামিন পেয়ে যান তৃণমূলের এই ওয়ার্ড সভাপতি। আইনি মহলের একাংশের মতে, নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পুলিশের তরফে হয়তো এমন লঘু ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল, যার ফলে সহজেই জামিন পেয়ে যান অভিযুক্ত নেতা। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষায় প্রশাসন যতটা তৎপর হওয়ার কথা, বাস্তবে ততটা দেখা যাচ্ছে না।

‘যা হবে ২৩ তারিখের পর’: ভোট পরবর্তী হিংসার ইঙ্গিত?

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং আতঙ্কজনক পর্বটি শুরু হয় রাজু মণ্ডলের জামিন পাওয়ার পর। জেল থেকে বেরিয়ে অনুশোচনা তো দূর অস্ত, বরং তাঁর চোখেমুখে ছিল চরম দম্ভ। বুক ফুলিয়ে, কলার তুলে তিনি ফের সংবাদমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি দেন, "যা হবে ২৩ তারিখের পর!"

এই একটি বাক্যই গোটা রাজ্যের মানুষকে নতুন করে আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ‘২৩ তারিখ’ বলতে এখানে নির্বাচন বা ফল ঘোষণার পরবর্তী সময়ের দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, নির্বাচন পর্ব মিটে যাওয়ার পর ভোট পরবর্তী হিংসা (Post-poll violence) এক ভয়াল আকার ধারণ করে। গত বিধানসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর বিরোধী দলের বহু কর্মী-সমর্থককে ঘরছাড়া হতে হয়েছিল, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছিল।

রাজু মণ্ডলের এই ‘২৩ তারিখের পর’ দেখে নেওয়ার হুমকি আসলে সেই ভোট পরবর্তী হিংসারই একটি আগাম সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন বিরোধীরা। অর্থাৎ, ভোটের দিন যদি কেউ শাসকদলের নির্দেশ অমান্য করে ভোটকেন্দ্রে যান বা বিরোধীদের ভোট দেন, তবে নির্বাচনের রেশ কাটলেই তাঁদের ওপর চরম নেমে আসবে প্রতিশোধের খাঁড়া।

বিরোধীদের কড়া প্রতিক্রিয়া এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছে রাজ্যের বিরোধী শিবির। বিরোধী দলনেতা থেকে শুরু করে বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্ব, প্রত্যেকেই রাজ্য পুলিশ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন।

বিরোধীদের প্রশ্ন, "যেখানে একজন নেতা প্রকাশ্য দিবালোকে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন, সেখানে প্রশাসন নীরব দর্শক কেন? কিসের ভিত্তিতে তাঁকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জামিন দেওয়া হলো?" বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্য পুলিশ সম্পূর্ণভাবে শাসকদলের দলদাসে পরিণত হয়েছে। তাই নির্বাচন কমিশনের কড়া নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কর্তারা তৃণমূল নেতাদের গায়ে আঁচড় লাগতে দিচ্ছেন না।

নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মনে অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যে আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি (Model Code of Conduct) লাগু হয়ে যায়। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে কমিশনের হাতে। কিন্তু খোদ কমিশনের নাকের ডগায় যদি এমন হুমকির রাজনীতি চলতে থাকে এবং অভিযুক্তরা পার পেয়ে যায়, তবে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট কীভাবে সম্ভব, তা নিয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই ঘটনার রিপোর্ট তলব করতে হবে এবং অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আতঙ্ক

গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো নির্ভয়ে এবং স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। কিন্তু রাজু মণ্ডলের মতো নেতাদের এই ধরনের আস্ফালন সাধারণ ভোটারদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে বয়স্ক ভোটার, মহিলা এবং প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষরা এই ধরনের হুমকির ফলে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন।

ভোটের দিন বুথে গেলে যদি মার খেতে হয়, অথবা ভোটের পর যদি ভিটেমাটি হারাতে হয়— এই ভয়ে অনেকেই নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। আর ঠিক এটাই হলো এই ধরনের বাহুবলী নেতাদের আসল উদ্দেশ্য। ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ভোটদানে বাধা দেওয়া এবং নিজেদের রাজনৈতিক জমি শক্ত করা।

উপসংহার

রাজু মণ্ডলের এই দম্ভোক্তি বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অন্ধকার দিককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। একদিকে যখন রাজনৈতিক দলগুলি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করছে, তখন অন্যদিকে পেশিশক্তি এবং হুমকির মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের এক নগ্ন খেলা চলছে।

আগামী দিনে নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন যদি এই ধরনের বাহুবলী নেতাদের শক্ত হাতে দমন না করে, তবে 'অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন' কথাটি কেবল খাতায়-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সাধারণ মানুষকেও তাঁদের ভোটাধিকার রক্ষায় আরও সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ভয়কে জয় করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করাটাই হবে এই ধরনের হুমকির মোক্ষম জবাব। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনে এই ঘটনার জল ঠিক কতদূর গড়ায় এবং নির্বাচন কমিশন সত্যিই কোনো কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে কি না।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code