মানুষের ভাষা | নিউজ ডেস্ক
কলকাতা: আসন্ন মহাযুদ্ধের প্রস্তুতিতে সরগরম গোটা বাংলা। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই জাতীয় নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India) যে এবার এক অভূতপূর্ব কড়া মেজাজে রয়েছে, তা পদে পদে প্রমাণিত হচ্ছে। রাজ্যে অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে কমিশনের আতশকাঁচের নিচে এখন খোদ রাজ্য পুলিশের ভূমিকা। আর সেই নজরদারিতেই এবার উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) নেতা, মন্ত্রী এবং কর্মী-সমর্থকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য নাকি সরকারি কোষাগারের টাকায় নিযুক্ত রয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি পুলিশ কর্মী!
এই অভাবনীয় পুলিশি প্রটোকল বা ভিআইপি সংস্কৃতির বহর দেখে কার্যত হতবাক খোদ জাতীয় নির্বাচন কমিশন। কেন শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাদের জন্য পুলিশ বাহিনীর এত বড় একটি অংশকে পাহারায় বসিয়ে রাখা হবে? এই মোক্ষম প্রশ্ন তুলেই এবার রাজ্য পুলিশের মহানির্দেশক বা ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (DGP)-কে কড়া নির্দেশ দিল কমিশন। পাশাপাশি, ভবানীপুরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের হাই-ভোল্টেজ রোড শো ঘিরে অশান্তি এবং মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দপ্তরের সামনে লাগাতার বিক্ষোভের ঘটনায় একাধিক এফআইআর দায়ের ও শোকজের জেরে রাজ্য রাজনীতিতে এখন রীতিমতো অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি।
নেতাদের পাহারায় ২,১৮৫ পুলিশ! কমিশনের চরম অসন্তোষ
গণতন্ত্রে পুলিশ এবং প্রশাসনের মূল কাজ হলো সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের হাতে যে পরিসংখ্যান এসে পৌঁছেছে, তা রাজ্যের সাধারণ পুলিশি কাঠামোর ওপর এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিচ্ছে। কমিশন ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে ৮৩২ জন তৃণমূল নেতা-কর্মী এবং অন্তত ১৪৪ জন দলীয় সমর্থককে সরকারিভাবে পুলিশি নিরাপত্তা বা 'প্রোটেকশন' দেওয়া হচ্ছে। আর এই বিপুল সংখ্যক নেতা-সমর্থককে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত রয়েছেন মোট ২,১৮৫ জন পুলিশ কর্মী!
ভোটের মুখে যখন রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভোটকেন্দ্রগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, তখন পুলিশ বাহিনীর এত বড় একটি অংশকে শুধুমাত্র শাসকদলের নেতাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কাজে ব্যবহার করা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের প্রশ্ন, রাজ্যের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং অবাধ ভোটগ্রহণের জন্য যেখানে বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং রাজ্য পুলিশের প্রয়োজন, সেখানে একটি বিশেষ দলের প্রতি এই নজিরবিহীন 'দাক্ষিণ্য' কেন?
ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের তরফে রাজ্য পুলিশের ডিজি-কে আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এই গোটা নিরাপত্তা ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার (Review) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথায়, কাকে এবং কীসের ভিত্তিতে এই বিপুল পুলিশি প্রটোকল দেওয়া হয়েছে, তার একটি বিস্তারিত 'স্ট্যাটাস রিপোর্ট' বা পর্যালোচনা রিপোর্ট অবিলম্বে কমিশনে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ডিজি-কে।
দাগি নেতাদের নিরাপত্তা প্রত্যাহার: কমিশনের 'জিরো টলারেন্স' নীতি
শুধুমাত্র নিরাপত্তা পর্যালোচনাই নয়, দাগি বা অপরাধমূলক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকা রাজনৈতিক নেতাদের পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়েও চরম কড়া অবস্থান গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের তরফে স্পষ্ট নির্দেশিকা জারি করে বলা হয়েছে, যে সমস্ত নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর ফৌজদারি মামলা (Criminal Cases), তোলাবাজি, বোমাবাজি বা হিংসা ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে এবং যাঁরা এই মুহূর্তে জামিনে বা প্যারোলে মুক্ত রয়েছেন, তাঁদের কোনও অবস্থাতেই সরকারি পুলিশি নিরাপত্তা দেওয়া যাবে না।
সাধারণত দেখা যায়, ভোট এলেই অনেক ক্ষেত্রে দাগি অপরাধীরা পুলিশি নিরাপত্তাকে কার্যত স্ট্যাটাস সিম্বল বা নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ ভোটারদের মনে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করে। আসন্ন নির্বাচনে এই ধরনের কোনও অনৈতিক সুবিধা বা 'পেশিশক্তির আস্ফালন' যাতে কেউ দেখাতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই কমিশনের এই জিরো টলারেন্স নীতি। অবিলম্বে পুলিশ প্রশাসনকে এমন দাগি রাজনৈতিক নেতা ও বাহুবলীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের নিরাপত্তা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। কমিশনের এই কড়া পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই শাসকদলের বহু নিচুতলার নেতা ও পেশিশক্তি নির্ভর প্রভাবশালীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

0 মন্তব্যসমূহ