বিজেপির সাংগঠনিক বিপ্লব: নীতিন নবীনের হাতে ব্যাটন তুলে দিয়ে ‘জেন-জি’ প্রজন্মের মন জয়ের পথে মোদী-শাহ জুটি
প্রবীর রায় চৌধুরী , মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক, নয়াদিল্লি: ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায় দীর্ঘকাল ধরেই একটি অলিখিত ধারণা ছিল যে, বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে আসীন হতে গেলে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভারী হওয়া এবং চুলে পাক ধরা আবশ্যিক। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতেই সেই প্রথাগত ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করল ভারতীয় জনতা পার্টি। জগত প্রকাশ নাড্ডার উত্তরসূরি হিসেবে ৪৫ বছর বয়সী নীতিন নবীনকে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি পদে বসিয়ে বিজেপি কেবল একটি সাংগঠনিক রদবদলই করল না, বরং একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ভারতের রাজনীতির অভিমুখ বদলে দেওয়ার বার্তা দিল। নীতিন নবীনের এই নিয়োগ কেবল একটি নাম ঘোষণা নয়, এটি বিজেপির পক্ষ থেকে দেশের কোটি কোটি যুব সম্প্রদায় ও ‘জেন-জি’ (Gen-Z) প্রজন্মের ভোটারদের উদ্দেশ্যে এক জোরালো রাজনৈতিক ইশতেহার।
বয়স ও জাতপাতের ঊর্ধ্বে মেধা ও কর্মদক্ষতা
বিজেপির এই সিদ্ধান্তের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘বয়স’ এবং ‘জাতপাত’—এই দুই চিরাচরিত সমীকরণকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা। সাধারণত হিন্দিবলয়ের রাজনীতিতে কোনও নেতাকে বড় দায়িত্ব দেওয়ার আগে তাঁর জাতিগত পরিচয় বা কাস্ট ইকুয়েশনকে গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়। কিন্তু নীতিন নবীনের ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ জুটি যে বাজিটি খেললেন, তার মূল ভিত্তি হলো ‘পারফরম্যান্স’। বিহারের রাজনীতিতে দীর্ঘ লড়াই এবং ছত্তিশগড়ের মতো প্রতিকূল রাজ্যে বিজেপিকে একক শক্তিতে ক্ষমতায় ফেরানোর নেপথ্যে নীতিন নবীনের যে সাংগঠনিক মুন্সিয়ানা, তাকেই সর্বোচ্চ সম্মান জানাল কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বিজেপির এই সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দিল যে, আপনি কোন জাতি থেকে এসেছেন বা আপনার বয়স কত, তার চেয়েও বড় কথা হলো দলের জন্য আপনি কতটা কার্যকরী।
Image- Frontline - The Hindu
তরুণ প্রজন্মের ‘পালস’ বোঝার রণকৌশল
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর বিজেপি নেতৃত্ব অনুভব করেছিল যে, তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ বিশেষ করে যারা প্রথমবারের ভোটার বা ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী, তাঁদের চাহিদার সাথে দলের সংযোগের কোথাও একটি সূক্ষ্ম ফারাক তৈরি হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর সাম্প্রতিক মালদহ এবং সিঙ্গুর সভা থেকেও বারবার ‘জেন-জি’ ভোটারদের গুরুত্বের কথা বলছেন। নীতিন নবীন নিজে একজন তরুণ নেতা হওয়ায় যুব সমাজের ভাষা এবং তাঁদের প্রযুক্তি-নির্ভর জীবনযাত্রার সাথে সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন। ২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন রয়েছে। এই নির্বাচনে যুব সমাজকে বুথমুখী করা এবং তৃণমূল বা অন্যান্য আঞ্চলিক দলের যুব শক্তির মোকাবিলা করাই হবে নবীনের প্রধান অ্যাসিড টেস্ট।
সাংগঠনিক রদবদল ও ডিজিটাল রাজনীতির প্রসার
নীতিন নবীনের নিয়োগের সাথে সাথেই বিজেপির অন্দরে এক ব্যাপক রদবদলের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সূত্রের খবর, দলের আইটি সেল (IT Cell) এবং সোশ্যাল মিডিয়া উইংকে আরও শক্তিশালী করতে তরুণ প্রজন্মকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষপাতী নবীন। তিনি মনে করেন, রাজনীতির ময়দান এখন কেবল মেঠো সভায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং স্মার্টফোনের স্ক্রিনেও যুদ্ধ জয় করতে হয়। তাঁর নেতৃত্বে দলের কেন্দ্রীয় সংসদীয় বোর্ড এবং জাতীয় কার্যনির্বাহী সমিতিতে আরও বেশি করে তরুণ মুখদের অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে দলের প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নবীনদের উদ্ভাবনী শক্তির মেলবন্ধন ঘটাতে চাইছে বিজেপি।
Image- The New Indian Express
পশ্চিমবঙ্গের জন্য নীতিন নবীন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বঙ্গ বিজেপির কাছে নীতিন নবীনের এই নতুন ভূমিকা অত্যন্ত ইতিবাচক। বিহারে কাজ করার সুবাদে তিনি বাংলা ও বাঙালির মানসিকতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে বিহার ও হিন্দিভাষী ভোটারদের যে বিশাল সংখ্যা রয়েছে, সেখানে নীতিন নবীন অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ। এছাড়া, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ নেত্রীর বিরুদ্ধে যখন বিজেপি একজন ৪৫ বছর বয়সী লড়াকু সভাপতিকে সামনে রাখছে, তখন তা ভোটারদের মনে এক ‘নতুন বাংলা, নতুন নেতৃত্ব’-এর ছবি তুলে ধরতে সাহায্য করবে। বঙ্গ বিজেপির কোন্দল মেটানো এবং নিচুতলার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতেও নবীনের ‘বিহার মডেল’ কাজ দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
বিরোধী শিবিরের প্রতিক্রিয়া ও চ্যালেঞ্জ
নীতিন নবীনের নিয়োগে স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়েছে বিরোধী শিবির। কংগ্রেস বা তৃণমূলের মতো দলগুলি যখন পারিবারিক উত্তরাধিকার বা অভিজ্ঞতার ভারে ন্যুব্জ, তখন বিজেপি এক সাধারণ ঘর থেকে উঠে আসা তরুণকে শীর্ষ পদে বসিয়ে ‘পরিবারবাদ’-এর বিরুদ্ধে জোরালো প্রচার শুরু করেছে। তবে নবীনের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দলের প্রবীণ নেতাদের সাথে সমন্বয় বজায় রাখা এবং বিভিন্ন রাজ্যের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব মিটিয়ে ২০২৬-এর নির্বাচনে সাফল্য এনে দেওয়া তাঁর বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে যেখানে বিজেপির সংগঠন এখনও ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নীতিন নবীন কতটা সফল হন, তার ওপরেই নির্ভর করবে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের পটভূমি।
নীতিন নবীন: এক লড়াকু রাজনীতিকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
নীতিন নবীন কেবল একজন তরুণ মুখ নন, তিনি রাজনীতির ময়দানে পোড় খাওয়া এক যোদ্ধা। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার সংক্ষিপ্ত খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:
জন্ম ও আদি নিবাস: নীতিন নবীনের জন্ম বিহারের এক রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর পিতা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহা ছিলেন বিহার বিজেপির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা এবং বিধায়ক। পিতার মৃত্যুর পর তাঁর ছেড়ে যাওয়া জুতোতেই পা রাখেন নীতিন।
ছাত্র রাজনীতি থেকে উত্থান: নীতিন নবীনের রাজনৈতিক হাতেখড়ি হয়েছিল অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (ABVP) থেকে। ছাত্র রাজনীতির মাঠ থেকেই তিনি নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের নজর কাড়তে সক্ষম হন।
বিধায়ক হিসেবে সাফল্য: তিনি পাটনা সাহিব বিধানসভা কেন্দ্র থেকে একাধিকবার বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। বিহারের নীতিশ কুমার সরকারের পথ নির্মাণ মন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজ সর্বজনবিদিত। বিহারের সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়নে তিনি যে গতি এনেছিলেন, তা তাঁকে প্রশাসনিক স্তরেও প্রশংসিত করেছিল।
ছত্তিশগড়ের ‘গেম চেঞ্জার’: ২০২১ সালে তাঁকে ছত্তিশগড়ের সহ-প্রভারী (Co-incharge) করা হয়। সেই সময় ছত্তিশগড়ে বিজেপি কার্যত কোণঠাস ছিল। নীতিন নবীন নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে সংগঠনকে চাঙ্গা করেন এবং ২০২৪-এর নির্বাচনে ছত্তিশগড়ে বিজেপির অভাবনীয় জয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন।
ব্যক্তিত্ব ও কর্মপদ্ধতি: নীতিন নবীন অত্যন্ত মৃদুভাষী কিন্তু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হন না। সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রযুক্তির ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর সবথেকে বড় গুণ হলো তিনি দলের অতি সাধারণ কর্মীর সাথেও সরাসরি যোগাযোগ রাখতে পছন্দ করেন, যা তাঁকে ‘মাটির নেতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নীতিন নবীনের হাতে বিজেপির এই ব্যাটন তুলে দেওয়া আসলে এক যুগের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর পাশাপাশি এবার ‘সবকা ইয়ুথ’ স্লোগান নিয়ে এগোতে চাইছে গেরুয়া শিবির। নীতিন নবীন কি পারবেন মোদী-শাহের আস্থার মর্যাদা রাখতে? ২০২৬-এর নির্বাচনের ফলাফলই দেবে সেই চূড়ান্ত উত্তর।
ট্যাগ (Tags):
#NitinNabin #BJPPresident #YouthInPolitics #BJPGenZ #IndianPolitics2026 #BiharToDelhi #NarendraModi #AmitShah #BengalElection2026 #PoliticalAnalysis #ManusherBhashaSpecial #NitinNabinHistory #NewIndiaBJP


0 মন্তব্যসমূহ