2026-র আগে মালদহে ‘মৌসম’ বদল! তৃণমূলে মোহভঙ্গ না কি পরিবারের টান? কোতোয়ালি বাড়িতে ফিরল কংগ্রেসের ঝাণ্ডা
নিজস্ব প্রতিবেদন, নয়াদিল্লি: বাংলার রাজনীতিতে ‘জানুয়ারি’ মাসটি যেন দলবদলের এক অদ্ভুত ইতিহাস বহন করে। সাত বছর আগে, ২০১৯ সালের এক জানুয়ারি মাসেই কংগ্রেসের হাত ছেড়ে ঘাসফুল শিবিরে নাম লিখিয়েছিলেন গণিখান চৌধুরীর ভাগ্নি মৌসম বেনজির নূর। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে, সেই জানুয়ারি মাসেই দিল্লিতে কংগ্রেসের সদর দফতরে গিয়ে ফের পুরনো দলে ফিরলেন তিনি। রাজ্যসভার সাংসদ মৌসমের এই পদক্ষেপে মালদহের ‘কোতোয়ালি’ পরিবারের রাজনৈতিক সমীকরণ যেমন একবিন্দুতে মিলল, তেমনই উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের ওপর এক বড়সড় চাপ সৃষ্টি হলো।
১. কেন হঠাৎ এই ‘ঘরওয়াপসি’? পরিবারের সিদ্ধান্তই কি শেষ কথা?
দিল্লির ২৪ নম্বর আকবর রোডে কংগ্রেসের পতাকা হাতে নিয়ে মৌসম নূর যখন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন, তখন তাঁর চোখেমুখে ছিল এক স্বস্তি। তিন দিন আগেই তৃণমূল কংগ্রেস তাঁকে মালদহের চারটি বিধানসভা কেন্দ্রের কো-অর্ডিনেটর করার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেই দায়িত্ব গ্রহণ না করেই তাঁর এই প্রস্থান। মৌসমের কথায়, "তৃণমূলে কোনো মোহভঙ্গের ব্যাপার নেই। মমতাদি আমাকে অনেক সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু পরিবারের সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে শেষ কথা। আমরা কংগ্রেস পরিবার, বরকত সাহেবের উত্তরাধিকার বহন করছি।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অবশ্য মনে করছেন, ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে মালদহ উত্তর থেকে তাঁকে টিকিট না দেওয়া এবং একুশের নির্বাচনেও ব্রাত্য থাকা মৌসমের মনে অভিমানের পাহাড় তৈরি করেছিল। বর্তমানে গণিখান পরিবারের আর এক সদস্য ঈশা খান চৌধুরী কংগ্রেসের টিকিটে দক্ষিণ মালদহের সাংসদ। পরিবারের দুই প্রধান মুখ আলাদা শিবিরে থাকায় মালদহের ‘গণিখান মিথ’ দুর্বল হচ্ছিল। তাই ২০২৬-এর আগে ঘর গোছাতে একজোট হলো কোতোয়ালি পরিবার।
২. রাজ্যসভায় ইস্তফা ও তৃণমূলের ভবিষ্যৎ
মৌসম নূর জানিয়েছেন, তিনি ইতিমধ্যেই তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। আগামী সোমবার তিনি রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দেবেন। মৌসমের এই দলত্যাগকে অবশ্য তৃণমূল বিশেষ গুরুত্ব দিতে রাজি নয়। দলের বর্ষীয়ান সাংসদ সৌগত রায়ের মতে, "এটা স্রেফ রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা। দল তাঁকে লোকসভায় হেরে যাওয়ার পরেও রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল।" তবে তৃণমূল যাই বলুক, মালদহের সংখ্যালঘু ভোটে মৌসমের এক বিশেষ প্রভাব রয়েছে। মালদহ উত্তর লোকসভা কেন্দ্রে ২০১৯-এ মৌসম তৃণমূলে আসায় ভোট ভাগাভাগির সুবিধা পেয়েছিল বিজেপি। এবার তিনি কংগ্রেসে ফেরায় বিজেপির খগেন মুর্মুর সামনেও এক কঠিন চ্যালেঞ্জ আসতে চলেছে।
৩. মালদহের রাজনীতিতে ‘গণিখান মিথে’র পুনরুত্থান
মালদহের রাজনীতি মূলত আবর্তিত হয় কিংবদন্তি নেতা এ.বি.এ গণিখান চৌধুরীকে কেন্দ্র করে। মৌসম নূরের পরিচিতিও মূলত গণি পরিবারের সদস্য হিসেবেই। কোতোয়ালি পরিবারের বাইরে বেরিয়ে তৃণমূলের ছত্রছায়ায় তিনি নিজের জন্য স্বতন্ত্র কোনো জমি তৈরি করতে পারেননি বলে দলের অন্দরেই কানাঘুষো ছিল। বরং কংগ্রেসে ফিরে আসা তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারকে ফের প্রাণ দিতে পারে বলে মনে করছেন সমর্থকরা।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার মৌসমকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, "মৌসমের রক্তে কংগ্রেস। এটা স্রেফ ট্রেলার, আগামী দিনে আরও অনেক চমক দেখা যাবে। জানালা খোলা ছিল, এবার দরজা খুলে দিলাম।" এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ২০২৬-এর আগে তৃণমূলের আরও কিছু হেভিওয়েট নেতা কংগ্রেসের পথে পা বাড়াতে পারেন।
৪. ২০২৬-এর নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব
মালদহের ১২টি বিধানসভা আসনের মধ্যে সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কে তৃণমূলের আধিপত্য গত বিধানসভা নির্বাচনে স্পষ্ট ছিল। কিন্তু মৌসম ও ঈশা—এই দুই জনপ্রিয় মুখ যদি একযোগে কংগ্রেসের হয়ে প্রচারে নামেন, তবে তৃণমূলের সেই দুর্গে ফাটল ধরা অসম্ভব নয়। বিশেষ করে উত্তর মালদহে যেখানে বিজেপি শক্তিশালী, সেখানে কংগ্রেস ও তৃণমূলের এই লড়াই তৃতীয় কোনো শক্তির উত্থান ঘটায় কি না, সেটাই এখন দেখার।
দিল্লির মৌসম বদলের এই হাওয়া কি শেষ পর্যন্ত নবান্নের অন্দরেও পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসবে? মৌসম নূর নিজে বলেছেন, তিনি কোনো শর্ত নিয়ে আসেননি, কাজ করতে চান। কিন্তু ২০২৬-এর আগে তাঁর এই ‘ফিরে আসা’ যে কংগ্রেস শিবিরে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করেছে, তা বলাই বাহুল্য। বরকত গনিখান চৌধুরীর উত্তরাধিকারকে হাতিয়ার করে মালদহের মরা গাঙে কি ফের জোয়ার আসবে? উত্তর দেবে সময়।
0 মন্তব্যসমূহ