বিপদে পিঠটান! কেন মার্কিন হামলার মুখে মাদুরোকে একাই লড়তে ছেড়ে দিল মস্কো-বেইজিং?
মানুষের ভাষা, নিউজ ডেস্ক :
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক সংকটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সামরিক অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর গ্রেফতার গোটা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। তবে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে যে প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক মহলের অলিন্দে সবথেকে বেশি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো— ভেনেজুয়েলার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও কেন রাশিয়া বা চীন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে মাদুরোকে রক্ষা করতে এগিয়ে এল না? আপাতদৃষ্টিতে এই নীরবতা অদ্ভুত মনে হলেও এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং কৌশলগত কারণ।
রাশিয়া এবং ভেনেজুয়েলার মধ্যে গত মে ২০২৫-এ একটি ১০ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল এটি হয়তো কোনো সামরিক জোটের মতো কাজ করবে, কিন্তু বাস্তবিকে এই চুক্তির মূল ভিত্তি হলো অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি বিনিময় এবং অস্ত্র বিক্রি। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার সাথে ভেনেজুয়েলার এই চুক্তিতে 'পারস্পরিক প্রতিরক্ষা' বা কালেক্টিভ ডিফেন্সের কোনো ধারা নেই। অর্থাৎ, ভেনেজুয়েলা আক্রান্ত হলে রাশিয়াকে যুদ্ধ করতে হবে— এমন কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা মস্কোর নেই। এছাড়া রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধের রণাঙ্গনে নিজের সামরিক শক্তির সিংহভাগ নিয়োজিত করে রেখেছে। আটলান্টিক মহাসাগর পেরিয়ে আমেরিকার ঘরের পাশে নতুন কোনো যুদ্ধক্ষেত্র খোলা রাশিয়ার জন্য লজিস্টিক্যালি অত্যন্ত কঠিন এবং ব্যয়বহুল।
চীনের ক্ষেত্রে সমীকরণটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং মূলত অর্থনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ। বিগত বছরগুলোতে বেইজিং কারাকাসকে কয়েক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। চীনের প্রধান লক্ষ্য এখন সেই ঋণের টাকা পুনরুদ্ধার করা, নতুন করে কোনো ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া নয়। মাদুরোকে সামরিকভাবে রক্ষা করতে গেলে ওয়াশিংটনের সাথে বেইজিংয়ের সরাসরি সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর আমেরিকার সাথে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ইতিমধ্যেই অত্যন্ত ভঙ্গুর। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প এবং শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে শুল্ক কমানোর যে ইতিবাচক আলোচনা শুরু হয়েছিল, মাদুরোর জন্য সেই বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতাকে চীন কখনোই বিসর্জন দিতে রাজি নয়।
ইরান এবং কিউবার সাথে ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় হলেও তাদের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ইরান ভেনেজুয়েলাকে ড্রাগন ড্রোন বা অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করলেও সরাসরি আমেরিকার সামরিক শক্তির মোকাবিলা করার মতো ক্ষমতা তাদের নেই। কিউবা ঐতিহাসিক ও আদর্শগতভাবে মাদুরোর পাশে থাকার বার্তা দিলেও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে তাদের পক্ষে মার্কিন সেনার গতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে নিকারাগুয়ার মতো দেশগুলো শুধুমাত্র মৌখিকভাবে নিন্দাই জানাতে পেরেছে।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ভেনেজুয়েলার ওপর রাশিয়ার কৌশলগত প্রভাব বা চীনের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ থাকলেও কোনো দেশই আমেরিকার সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত করতে চায় না। ভেনেজুয়েলা রাশিয়ার কাছে একটি অস্ত্র বিক্রির বাজার এবং চীনের কাছে একটি তেলের খনি মাত্র। এই বাণিজ্যিক সম্পর্কের খাতিরে কোনো পরাশক্তিই নিজেদের ঘরের দোরগোড়ায় যুদ্ধ ডেকে আনতে আগ্রহী নয়। ফলে মার্কিন আগ্রাসনের মুখে মাদুরোকে কার্যত একাই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে, কারণ তাঁর বন্ধুদের কাছে ‘বন্ধুত্বের’ চেয়ে ‘বাণিজ্য’ অনেক বেশি মূল্যবান।
0 মন্তব্যসমূহ