Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

ইভিএম নিউজ-এর স্বপন দাসের বিরুদ্ধে বাঁকুড়া পুলিশের মামলা, হাইকোর্টে কড়া চ্যালেঞ্জ আইনজীবীর

শাসকের রোষানল বনাম সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা: ইভিএম নিউজ-এর স্বপন দাসের বিরুদ্ধে বাঁকুড়া পুলিশের মামলা, হাইকোর্টে কড়া চ্যালেঞ্জ আইনজীবীর



মানুষের ভাষা,  নিউজ ডেস্ক, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের জগতে অন্যতম পরিচিত মুখ, ‘ইভিএম নিউজ’ (EVM News)-এর কর্ণধার তথা প্রবীণ সাংবাদিক স্বপন দাস এবার বাঁকুড়া পুলিশের কড়া আইনি প্যাঁচে। গত ৯ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে তাঁকে একটি নোটিশ ধরানো হয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতি ও সাংবাদিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। স্বপন দাসের দাবি, সরকারের ‘গঠনমূলক সমালোচনা’ করার অপরাধে তাঁকে বারেবারে পুলিশের রোষানলের মুখে পড়তে হচ্ছে। এই মামলাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে বর্ণনা করে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁর আইনজীবী রাহুল দাস।

প্রেক্ষাপট: সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধের অভিযোগ

স্বপন দাস তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে একাধিকবার শাসকদলের সমালোচনায় সরব হয়েছেন। এর আগে সন্দেশখালির বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা শেখ শাহজাহান তাঁর বিরুদ্ধে ৩ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছিলেন। কিন্তু দমে না গিয়ে স্বপন দাস তাঁর লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। বর্তমানে তাঁর ইউটিউব চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৩ লক্ষ ৭০ হাজার অতিক্রম করেছে। স্বপন দাসের অভিযোগ, তাঁর চ্যানেলের এই ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের সমর্থন দেখেই শাসকদল ভীত হয়ে তাঁর কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে।

আইনি জট: স্বপন দাসের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর ধারা

স্বপন দাসের আইনজীবী রাহুল দাস সংবাদমাধ্যমের সামনে এই মামলার আইনি দিকগুলি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দাবি, বাঁকুড়া পুলিশ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS)-এর অধীনে স্বপন দাসের বিরুদ্ধে এমন কিছু ধারা প্রয়োগ করেছে যা অত্যন্ত গুরুতর এবং জামিন অযোগ্য।

  • ধারা ১৯৬ (BNSS): সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্ত সংক্রান্ত এই ধারাটি এখানে কেন প্রয়োগ করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী।

  • ধারা ২৩৩ (BNSS): মিথ্যা সাক্ষ্য বা তথ্যপ্রমাণ দেওয়ার অভিযোগ।

  • ধারা ২৯৯ (BNSS): কোনো বিশেষ ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা এবং এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করার অভিযোগ।

  • ধারা ৩৫২ (BNSS): এলাকায় শান্তি বিঘ্নিত করার প্ররোচনা দেওয়া।

  • ধারা ৩৫৩ (BNSS): জনমানসে আতঙ্ক সৃষ্টি বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রচারের অভিযোগ।

রাহুল দাসের দাবি, স্বপন দাস একজন দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা এবং প্রবীণ নাগরিক। অথচ মামলা দায়ের করা হয়েছে বাঁকুড়াতে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনও অভিযোগ এলে পুলিশের উচিত ছিল প্রাথমিক তদন্ত করে দেখা। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনও ইনকোয়ারি ছাড়াই সরাসরি এফআইআর (FIR) নেওয়া হয়েছে। আইনজীবী আরও জানান যে, বাঁকুড়া পুলিশের সরাসরি স্বপন দাসের বাড়িতে এসে নোটিশ দেওয়ার এক্তিয়ার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। স্থানীয় থানার সাহায্য না নিয়ে এভাবে সরাসরি পদক্ষেপ করা আইনের পরিপন্থী।

আইপ্যাক কাণ্ডের ছায়া ও আইনি লড়াই

শুনানি চলাকালীন এবং তাঁর বক্তব্যে স্বপন দাসের আইনজীবী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে তল্লাশি এবং সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সশরীরে উপস্থিতিকে কটাক্ষ করেছেন। রাহুল দাসের দাবি, যখন সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মতো অভিযোগ স্বপন দাসের ওপর লাগানো হয়, তখন সেই একই মাপকাঠি কি অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয় না? তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, পুলিশকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে স্বপন দাসকে মানসিক হেনস্তা করা হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই এই মামলার কোয়াশিং (Quashing) বা বাতিলের দাবিতে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইনজীবী রাহুল দাসের মতে, এনসিআরবি (NCRB)-র ডেটাবেসে বাঁকুড়াতে স্বপন দাসের নিউজের কারণে কোনও দাঙ্গা বা অশান্তি হয়েছে—এমন কোনও রেকর্ড নেই। ফলে এই অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক।

স্বপন দাসের বার্তা

সাংবাদিক স্বপন দাস জানিয়েছেন, তিনি আইনের পথেই এই লড়াই লড়বেন। তাঁর কথায়, “আমরা যখন ৩ হাজার সাবস্ক্রাইবার ছিলাম তখনও লড়াই করেছি, আজ ৩ লক্ষ ৭০ হাজারেও লড়াই করছি। শাসকের রোষানল আমাকে দমাতে পারবে না। আমরা গঠনমূলক সমালোচনা জারি রাখব এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে।”

ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনিক সংঘাতের নতুন সমীকরণ

স্বপন দাসের বিরুদ্ধে বাঁকুড়া পুলিশের এই মামলা এবং হাইকোর্টের আইনি লড়াই পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে। নিচে এর বিস্তারিত রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:

১. বিএনএসএস (BNSS)-এর অপব্যবহার ও ডিজিটাল মিডিয়া

ভারতে নতুন ফৌজদারি আইন অর্থাৎ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (BNSS) কার্যকর হওয়ার পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এই আইনের ধারা প্রয়োগ করার এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্বপন দাসের বিরুদ্ধে ২৯৯ এবং ৩৫৩-এর মতো ধারাগুলি প্রয়োগ করা হয়েছে যা মূলত দাঙ্গা বা জনরোষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একজন সাংবাদিক যখন কোনও প্রতিবেদন করেন, তখন সেটি ‘পাবলিক মিসচিফ’ নাকি ‘জনস্বার্থ’—সেই সূক্ষ্ম সীমারেখাটি পুলিশ নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করছে বলে অভিযোগ। এটি সরাসরি ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(এ) ধারায় প্রদত্ত বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী।

২. আঞ্চলিক এক্তিয়ার ও ‘হারাসমেন্ট’ কৌশল

স্বপন দাসের মামলাটি বাঁকুড়ায় দায়ের করা হয়েছে, অথচ তিনি কলকাতার বাসিন্দা। আইনি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ফোরাম শপিং’ বা অভিযুক্তকে হেনস্তা করার জন্য দূরবর্তী কোনও জেলায় মামলা করা। এর ফলে অভিযুক্তকে বারবার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আদালতে হাজিরা দিতে হয়, যা কার্যত শাস্তির সমান। সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছে যে, সাংবাদিকদের এভাবে ভৌগোলিক দূরত্ব ব্যবহার করে হেনস্তা করা উচিত নয়। বাঁকুড়া পুলিশের এই পদক্ষেপ সেই আইনি নীতির লঙ্ঘন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

৩. আইপ্যাক বনাম স্বপন দাস: নিরপেক্ষতার প্রশ্ন

আইনজীবী রাহুল দাস যে প্রসঙ্গটি তুলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৮ জানুয়ারি আইপ্যাক দপ্তরে ইডি তল্লাশি চলাকালীন রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থা উষ্মা প্রকাশ করেছিল। অন্যদিকে, একজন প্রবীণ সাংবাদিককে গঠনমূলক সমালোচনা করার জন্য যে তত্পরতার সাথে পুলিশ নোটিশ দিচ্ছে, তা এই দুই ঘটনার মধ্যে এক ধরণের বৈপরীত্য তৈরি করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাজ্যে কেন্দ্রীয় সংস্থা বনাম রাজ্য পুলিশের লড়াইয়ের মাঝে সংবাদমাধ্যমও এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

৪. সাবস্ক্রাইবার ও জনমত

স্বপন দাসের চ্যানেলের ৩.৭ লক্ষ সাবস্ক্রাইবার হওয়া মানে তিনি এক বিরাট জনমতের প্রতিনিধি। ডিজিটাল মিডিয়ার এই ক্রমবর্ধমান প্রভাবই হয়তো রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের ওপর বিজ্ঞাপনী চাপ বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্ভীক সাংবাদিকতা শাসকদলের মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে। স্বপন দাসের ওপর এই আক্রমণ আসলে অন্যান্য ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য একটি ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবেও কাজ করতে পারে।

৫. বিচারবিভাগের ভূমিকা

স্বপন দাস এর আগেও হাইকোর্ট থেকে সুরক্ষা পেয়েছেন। বর্তমান মামলাটি যখন ৫২৮, ২১৭ এবং ২৪৮ ধারায় কোয়াশিং-এর জন্য তোলা হয়েছে, তখন আদালত পুলিশের অতিসক্রিয়তা বা গাফিলতি নিয়ে কী পর্যবেক্ষণ দেয়, তা দেখার বিষয়। যদি আদালত এই মামলাটি খারিজ করে দেয়, তবে তা হবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার এক বড় জয়। আর যদি তদন্ত চলতে থাকে, তবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে সংবাদমাধ্যমের কাজের পরিবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।


স্বপন দাসের মামলাটি কেবল একজন ব্যক্তির লড়াই নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিকতার ঐতিহ্যের এক পরীক্ষা। প্রশাসনের উচিত সমালোচকের কণ্ঠরোধ না করে যুক্তির মোকাবিলা যুক্তিতে করা। আইনের ধারার আড়ালে সংবাদমাধ্যমের হাত বেঁধে দেওয়া গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। আগামী দিনে এই মামলার গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করবে বাংলার ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ।

ট্যাগ (Tags):

#SwapanDasCase, #EVMNews, #FreedomOfPress, #HighCourtInauguration, #WestBengalPolitics, #BNSS, #PoliceNotice, #DigitalJournalism, #JusticeForJournalists, #ManusherBhashaReport, #BankuraPolice, #LegalBattleBengal, #MamataBanerjeeVsMedia, #FreedomOfSpeech

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code