সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কড়া কমিশন: আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হলে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
নিউজ ডেস্ক, মানুষের ভাষা:
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সংঘাত এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সোমবার ও মঙ্গলবার একাধিক ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। একদিকে যেমন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, তেমনই চার নির্বাচনি আধিকারিকের বিরুদ্ধে নেওয়া রাজ্যের সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে ৭২ ঘণ্টার ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছে কমিশন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে রাজ্য সরকারকে কড়া বার্তা দিল নির্বাচন কমিশন। সর্বোচ্চ আদালত আগেই নির্দেশ দিয়েছিল যে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজি-কে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। তা সত্ত্বেও গত কয়েক দিনে এসআইআর-কে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভাঙচুর ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটায় পুনরায় রাজ্য সরকারকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করল কমিশন।
শুনানি ও তালিকা প্রকাশ নিয়ে নয়া নির্দেশিকা
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে জাতীয় নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করেছে যে:
তালিকা প্রকাশ: আগামী ২৪শে জানুয়ারির মধ্যে 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি' এবং 'আনম্যাপড' ক্যাটাগরিতে থাকা ভোটারদের নাম গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন, প্রতিটি ব্লক অফিস এবং শহরাঞ্চলের ওয়ার্ড অফিসে টাঙাতে হবে।
শুনানির স্থান: এসআইআর সংক্রান্ত আপত্তি গ্রহণ ও শুনানি হবে গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিস, মহকুমা দপ্তরে কিংবা ওয়ার্ড অফিসে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই অংশগ্রহণ করতে পারেন।
অ্যাডমিট কার্ডের বৈধতা: ভোটারদের জন্ম তারিখ প্রমাণের জন্য মাধ্যমিক পরীক্ষার সার্টিফিকেট ছাড়াও মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিনিধি ও বিএলএ: শুনানির সময় ভোটাররা তাঁদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে নথি জমা দিতে পারবেন। ওই প্রতিনিধি বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA) হলেও কমিশনের কোনও আপত্তি নেই। তবে প্রতিনিধির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোটারের স্বাক্ষর বা আঙুলের ছাপ সম্বলিত অনুমোদনপত্র থাকা বাধ্যতামূলক।
জাতীয় নির্বাচন কমিশন রাজ্য সরকারকে আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, প্রতিটি জেলা শাসক (DM) এবং পুলিশ সুপার (SP) যেন পর্যাপ্ত কর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করেন। যদি কোথাও কোনও প্রশাসনিক গাফিলতি বা বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
SIR phase 2 | Election Commission of India writes to West Bengal's Chief Secretary, DGP and Kolkata Police Commissioner directing that SIR proceedings related to collection of documents/hearing to take place at the Gram Panchayat Bhawans, public places in every Taluka, and Block… pic.twitter.com/OJYAHFe7LG
— ANI (@ANI) January 21, 2026
চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে নেওয়া রাজ্যের সিদ্ধান্ত ‘অবৈধ’: মুখ্যসচিবকে ৭২ ঘণ্টার সময়সীমা
ভোটার তালিকায় গড়মিল বিতর্কে রাজ্যের চার নির্বাচনি আধিকারিকের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন। এই চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তা আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে (২৪শে জানুয়ারি বিকেল ৫টার মধ্যে) মুখ্যসচিবকে জানাতে হবে।
প্রেক্ষাপট: বেআইনিভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগণার বারুইপুর পূর্ব এবং পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না বিধানসভা কেন্দ্রের মোট চারজন আধিকারিকের (ইআরও ও এইআরও) বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছিল কমিশন। গত ৫ই আগস্ট ও ৮ই আগস্ট এ নিয়ে চিঠি পাঠানো হলেও রাজ্য সরকার সেই নির্দেশ কার্যকর করেনি। উল্টে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, লঘু অপরাধে এত বড় শাস্তি দেওয়া ঠিক নয় এবং এফআইআর-এর নির্দেশ প্রত্যাহার করা হোক।
কমিশনের পালটা যুক্তি:
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্বাচনি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করা বাধ্যতামূলক ছিল। এক্ষেত্রে রাজ্য সরকার সেই নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। তাই চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে নেওয়া রাজ্যের বিভাগীয় সিদ্ধান্ত পদ্ধতিগতভাবে ভুল এবং অগ্রাহ্য বলে গণ্য হবে। কেন নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি, সে বিষয়েও মুখ্যসচিবের কাছে রিপোর্ট তলব করেছে কমিশন।
রাজনৈতিক তরজা: ‘বিজেপির দালাল’ বনাম ‘আইন-শৃঙ্খলার অবনতি’
এই সমগ্র ইস্যুতে শাসক ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ লঙ্ঘন করছে এবং বিজেপির ‘স্ক্রিপ্ট’ অনুযায়ী কাজ করছে। শাসক শিবিরের একাংশের দাবি, কমিশনকে আগে প্রমাণ করতে হবে তারা নিরপেক্ষ।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির তথা বিজেপির দাবি, রাজ্যে এসআইআর-কে কেন্দ্র করে যেভাবে অরাজকতা তৈরি হয়েছে, তাতে সুপ্রিম কোর্টের আরও কঠোর হওয়া উচিত। তাদের মতে, রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক করতে সর্বোচ্চ আদালতের কড়া নির্দেশিকা ছাড়া উপায় নেই।


0 মন্তব্যসমূহ