ওপার বাংলায় হিন্দু নিধন যজ্ঞ! ৪২ দিনে ১২ বলি
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ওপার বাংলায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার বীভৎসতা সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। গত দেড় মাসে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘নিরাপত্তা’র প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। সুনামগঞ্জে জয় মহাপাত্রের বিষপ্রয়োগে মৃত্যু থেকে শুরু করে পাবনায় প্রলয় চাকীর জেল হেফাজত মৃত্যু—প্রতিটি ঘটনাই ওপার বাংলার সংখ্যালঘুদের বর্তমান বিপন্নতাকে প্রকট করে তুলছে।
মানুষের ভাষা , নিউজ ডেস্ক : : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জমানায় সংখ্যালঘু হিন্দুরা কি তবে স্রেফ বধ্যভূমির বাসিন্দা? গত ৪২ দিনে ওপার বাংলায় অন্তত ১২ জন হিন্দু নাগরিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু এই প্রশ্নকেই জোরালো করে তুলছে। গত কয়েক দিনে পাবনা, ফেনী এবং সুনামগঞ্জ থেকে যে তিনটে মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর এসেছে, তা কেবল ব্যক্তিগত বিবাদ নয়, বরং এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে যখন প্রখ্যাত হিন্দু সঙ্গীতশিল্পী প্রলয় চাকীর জেল হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে, ঠিক তখনই সুনামগঞ্জে ১৯ বছরের তরুণ জয় মহাপাত্রকে পিটিয়ে বিষ খাইয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে।
সুনামগঞ্জের নৃশংসতা: মাত্র ৫০০ টাকার জন্য বিষপ্রয়োগ
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা জয় মহাপাত্রের মৃত্যু যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানিয়েছে। জয়ের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় এক দোকানদার আমিরুল ইসলামের কাছ থেকে কিস্তিতে একটি মোবাইল ফোন কিনেছিলেন জয়। মাত্র ৫০০ টাকা বকেয়া ছিল। সেই যৎসামান্য টাকা দিতে গিয়েই তিনি আমিরুলের রোষের মুখে পড়েন। অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ্য রাস্তায় জয়কে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করার পর মারধর করা হয় এবং জোরপূর্বক বিষ খাইয়ে দেওয়া হয়। মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে আইসিইউ-তে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জে তীব্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
জেল হেফাজতে মৃত্যু প্রলয় চাকী: প্রশাসনের উদাসীনতা না কি চক্রান্ত?
পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক তথা প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত শিল্পী প্রলয় চাকীর (৬০) মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন বিনা ওয়ারেন্টে তাঁকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। গত রবিবার রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রলয়বাবুর ছেলে সানি চাকীর দাবি, তাঁর বাবা দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের রোগী হওয়া সত্ত্বেও জেলে তাঁকে ন্যূনতম চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, গত দেড় মাস ধরে জেলের ভেতরে তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর ঠিক আগেও পরিবারকে কিছু জানানো হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফেনীতে রাতভর তাণ্ডব: অটোচালক সমীরকে কুপিয়ে খুন
ফেনীর দাগনভূঁঞা এলাকা থেকে সোমবার ভোরে উদ্ধার হয়েছে ২৮ বছরের হিন্দু যুবক সমীর কুমার দাসের রক্তাক্ত দেহ। পেশায় অটোচালক সমীর গত রবিবার রাতে বাড়ি ফেরেননি। পরদিন সকালে একটি নির্জন মাঠ থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহটি পাওয়া যায়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, তাঁকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করার পর তাঁর ব্যাটারিচালিত অটোটি নিয়ে চম্পট দিয়েছে দুষ্কৃতীরা। একের পর এক এই হামলাকে স্রেফ ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে দায় এড়াতে চাইছে ইউনুস প্রশাসন, যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে ‘পরিকল্পিত নিধন’ হিসেবেই দেখছে।
ইউনুস জমানায় গত দেড় মাসের রক্তক্ষয়ী খতিয়ান
রাজ্য ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিচে গত দেড় মাসের প্রধান কিছু ঘটনার তালিকা দেওয়া হলো:
| তারিখ | নিহতের নাম | স্থান ও পরিস্থিতি |
| ১১ জানুয়ারি ২০২৬ | সমীর কুমার দাস | ফেনী; পিটিয়ে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে খুন। |
| ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | জয় মহাপাত্র | সুনামগঞ্জ; বকেয়া টাকার জন্য মারধর ও বিষপ্রয়োগ। |
| ৮ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রলয় চাকী | পাবনা; জেল হেফাজতে রহস্যজনক মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ। |
| ৬ জানুয়ারি ২০২৬ | মিথুন সরকার | উত্তরবঙ্গ; মব লিঞ্চিং-এর হাত থেকে বাঁচতে খালে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু। |
| ৫ জানুয়ারি ২০২৬ | রানা প্রতাপ বৈরাগী | যশোর; মাথায় গুলি করে ও গলা কেটে নারকীয় হত্যা। |
| ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | দিপু চন্দ্র দাস | ময়মনসিংহ; জীবন্ত পুড়িয়ে মারা ও গাছে ঝুলিয়ে রাখা। |
বাংলাদেশের প্রথম সারির মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, ৫ অগাস্টের পর থেকে দেশটিতে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার মতো প্রশাসনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়েছে। ময়মনসিংহে দিপু চন্দ্র দাসকে পুড়িয়ে মারার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ইয়াসিন আরাফাত গ্রেপ্তার হলেও সাধারণ হিন্দু নাগরিকদের মনে আস্থা ফিরছে না। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকেও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশের সরকারকে তাঁদের সংখ্যালঘু নাগরিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
সারসংক্ষেপ (Summary):
বাংলাদেশে গত ৪২ দিনে অন্তত ১২ জন হিন্দু নাগরিককে হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে জয় মহাপাত্রের বিষপ্রয়োগে মৃত্যু এবং পাবনায় প্রলয় চাকীর জেল হেফাজতে মৃত্যু ওপার বাংলার সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই নিয়ে তীব্র নিন্দা শুরু হলেও ওপার বাংলার প্রশাসন একে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই বর্ণনা করছে।
ট্যাগ (Tags):
#BangladeshViolence #HinduPersecution #JusticeForJoy #ProlayChaki #SamirKumarDas #InternationalNews #HumanRightsViolation #BangladeshNews #MinorityAttack #YunusRegime #DhakaUpdate
0 মন্তব্যসমূহ