সুপ্রিম কোর্টে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ পর্যবেক্ষণ: ইডির কাজে বাধার অভিযোগে বিচলিত সর্বোচ্চ আদালত, প্রশ্নের মুখে নবান্ন
সুপ্রিম কোর্টের ১৭ নম্বর কোর্ট রুমে আজ (১৫ জানুয়ারি, ২০২৬) যে দীর্ঘ আইনি লড়াই চলল, তা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চে ইডি বনাম নবান্নের সওয়াল-জবাব কেবল আইনি তর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা এক গভীর সাংবিধানিক সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছে।
মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক রিপোর্ট (১৫ জানুয়ারি, ২০২৬): আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) তল্লাশি চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ওঠা ‘তদন্তে হস্তক্ষেপ’ ও ‘বাধা দান’-এর অভিযোগকে বৃহস্পতিবার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করল সুপ্রিম কোর্ট।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারকক্ষে ‘রুদ্ধশ্বাস’ সওয়াল-জবাব (Full Hearing Transcript)
সুপ্রিম কোর্টের ১৭ নম্বর কোর্ট রুমে আজ সকাল থেকে যে বাদানুবাদ চলেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
তুষার মেহতা (সলিসিটর জেনারেল, ইডি-র পক্ষে):
"মাই লর্ড, এই মামলাটি কেবল একটি রেড বা তল্লাশির বিষয় নয়। এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা যা পশ্চিমবঙ্গে নিয়মিত ঘটে চলেছে। যখনই কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থা তার আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে যায়, তখনই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পুলিশ এবং প্রশাসনকে সাথে নিয়ে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গত ৮ জানুয়ারি আইপ্যাক অফিসে ঠিক এটাই ঘটেছে। মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়ে কেবল তদন্তে বাধাই দেননি, বরং পুলিশের উপস্থিতিতে নথিপত্র এবং ডিজিটাল এভিডেন্স একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এটি আইনের শাসন বা ‘রুল অফ ল’-এর ওপর সরাসরি আঘাত।"
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র:
"মিস্টার মেহতা, এটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। আপনি কি বলতে চাইছেন যে মুখ্যমন্ত্রী সশরীরে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছিলেন?"
তুষার মেহতা (ইডি):
"হ্যাঁ মাই লর্ড। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে তিনি সেখানে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় ছিলেন। সাথে ছিলেন ডিজি রাজীব কুমার এবং কমিশনার মনোজ বর্মা। তাঁরা তল্লাশিস্থল থেকে ফাইল ও ফোন নিয়ে বেরোচ্ছেন। এটি চুরির শামিল। যদি রক্ষকরাই ভক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তবে কেন্দ্রীয় অফিসাররা কীভাবে কাজ করবেন? তাঁদের মনোবল ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। আমরা ডিজি রাজীব কুমারসহ উপস্থিত অফিসারদের অবিলম্বে সাসপেনশনের আবেদন জানাচ্ছি।"
কপিল সিব্বল (পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষে):
"মাই লর্ড, ইডি-র এই আবেদন সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নির্বাচনের ঠিক আগে তারা আইপ্যাক দপ্তরে গিয়েছে কেবল তৃণমূলের নির্বাচনি তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। কয়লা পাচারের নাম করে তারা আমাদের ২০২৬ সালের রাজনৈতিক রণকৌশল চুরি করতে চেয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী দলের নেত্রী হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন দলের সম্পত্তি রক্ষা করতে। তিনি কোনও সিজ করা নথি নেননি। ইডির নিজস্ব পঞ্চনামা বলছে যে তারা কিছুই বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি।"
বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলি:
"মিস্টার সিব্বল, আপনার যুক্তি অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন দলের সম্পত্তি রক্ষা করতে। কিন্তু ইডি যখন রেইড চালাচ্ছে, তখন কোনও নথি সরিয়ে নেওয়ার এক্তিয়ার কি কারও আছে? ইডি যদি মনে করে কোনও নথি জরুরি, তবে তা নেওয়া তাদের আইনি অধিকার। মুখ্যমন্ত্রী নিজে কেন সেই নথির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন?"
কপিল সিব্বল (তৃণমূলের পক্ষে):
"মাই লর্ড, ইডি ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এর পর থেকে এই মামলায় কী করছিল? হঠাৎ নির্বাচনের আগে কেন এত তৎপরতা? আইপ্যাকের কাছে দলের সমস্ত গোপন তথ্য থাকে। ইডি যদি তা পেয়ে যায়, তবে ফেয়ার ইলেকশন বা অবাধ নির্বাচন বলে কিছু থাকবে না। মুখ্যমন্ত্রী কোনও বাধা দেননি, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে সেখানে ছিলেন।"
এস.ভি রাজু (এএসজি, ইডি-র পক্ষে):
"শান্তিপূর্ণভাবে? মাই লর্ড, কলকাতা হাইকোর্টে কী হয়েছিল? সেখানে তৃণমূলের লিগ্যাল সেল থেকে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ করে হাজার হাজার মানুষকে জড়ো করা হয়েছিল। আইনজীবীরা আদালত কক্ষে ঢুকে ঝামেলা করেছেন, যার ফলে বিচারপতিকে এজলাস ছেড়ে উঠতে হয়েছিল। একে কি আপনি শান্তিপূর্ণ বলবেন? এটি তো ‘মবক্রেসি’ বা ভিড়ের শাসন।"
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র:
"কলকাতা হাইকোর্টে যা ঘটেছে, তাতে আমরাও অত্যন্ত বিচলিত। বিচারবিভাগীয় কাজকর্মে এই ধরনের বিঘ্ন বরদাস্ত করা যায় না। আমরা এই পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। ইডি-র করা প্রতিটি অভিযোগের আমরা পরীক্ষা করব।"
আদালতের ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তী নির্দেশ (Summary of Order)
দীর্ঘ শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট নিম্নলিখিত নির্দেশগুলি দেয়:
১. নোটিশ জারি: কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকদের (রাজীব কুমার, মনোজ বর্মা প্রমুখ) বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হয়েছে। আদালত আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তাঁদের হলফনামা দিয়ে জবাব দিতে বলেছে।
২. সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ: আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, ৮ জানুয়ারির আইপ্যাক অফিসের ভেতরে এবং আশপাশের সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্টোরেজ ডিভাইসগুলি অবিলম্বে সংরক্ষণ (Preserve) করতে হবে।
৩. এফআইআর-এ স্থগিতাদেশ: ইডির অফিসারদের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ যে তিনটি এফআইআর দায়ের করেছিল, তার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ (Stay) দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
৪. সিবিআই তদন্ত ও সাসপেনশন: ডিজি রাজীব কুমারের সাসপেনশন এবং সিবিআই তদন্তের বিষয়ে আদালত এখনই কোনও চূড়ান্ত রায় দেয়নি। বিষয়টি নিয়ে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী বড় শুনানি হবে। তার আগে কেন্দ্রকে এই ঘটনার ওপর একটি রিপোর্ট পেশ করতে বলা হয়েছে।
মমতা সরকারের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ?
সুপ্রিম কোর্টের আজকের এই অবস্থান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের জন্য এক বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল। আদালত যেভাবে কলকাতা হাইকোর্টের ‘অরাজকতা’ এবং ইডির অভিযোগকে ‘সিরিয়াস’ বলে বর্ণনা করেছে, তাতে নবান্নের পাল্লা এই মুহূর্তে কিছুটা ভারাক্রান্ত। বিশেষ করে সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ প্রমাণ করছে যে আদালত ইডির ‘তথ্য ছিনতাইয়ের’ অভিযোগটি খতিয়ে দেখতে চাইছে।
অন্যদিকে, তৃণমূলের অস্বস্তি বাড়িয়ে ইডি সুপ্রিম কোর্টে আরও একটি পিটিশন ফাইল করেছে যেখানে দাবি করা হয়েছে যে, আইপ্যাক দপ্তরে রেইডের নামে মুখ্যমন্ত্রী যে ফাইলটি (সবুজ ফাইল) নিয়ে গিয়েছেন, তা আসলে কয়লা পাচার মামলার মাস্টার ডাটা ছিল। সোমবারের শুনানির আগে এই ফাইল ইস্যু যে আরও উত্তপ্ত হবে, তা নিশ্চিত।
সর্বশেষ আপডেট (Latest Updates as of Jan 15, 2:55 PM IST)
নবান্নে জরুরি বৈঠক: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর নবান্নে আইনি সেল এবং শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের সাথে বৈঠক করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সূত্রের খবর, সোমবারের পালটা হলফনামায় নবান্ন সিসিটিভি ফুটেজের নির্দিষ্ট অংশ পেশ করতে পারে যা প্রমাণ করবে যে কোনও নথি ‘ছিনতাই’ হয়নি।
বিজেপির হুঙ্কার: রাজ্য বিজেপি সভাপতি শৌমিক ভট্টাচার্য দাবি করেছেন, “মুখ্যমন্ত্রী এবার আইনের জালে পা দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে, তাতে প্রমাণিত যে বাংলায় সাংবিধানিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে।”
আইপ্যাক ডিরেক্টর প্রতীক জৈনের বয়ান: প্রতীক জৈন দিল্লি ইডি দপ্তরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি চিন্তিত বলে জানা গিয়েছে।
ট্যাগ (Tags):
#SupremeCourtHearing #MamataBanerjee #EDvsTMC #RajeevKumar #IPACRaidDrama #TusharMehta #KapilSibal #WestBengalPolitics #BreakingNewsLegal #GreenFileMystery #SupremeCourtLive #BengalElection2026 #RuleOfLaw #CBIInvestigation #KolkataNews #ManusherBhashaReport




0 মন্তব্যসমূহ