আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED) তল্লাশিকে কেন্দ্র করে রাজ্য ও কেন্দ্রের সংঘাত এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আঙিনায়। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ১৭ নম্বর কোর্ট রুমে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চে যে নাটকীয় শুনানি হয়েছে, তাতে রাজ্য সরকারের সমস্ত আবেদন কার্যত নস্যাৎ করে দিয়েছে আদালত। বিশেষ করে ইডির অফিসারদের বিরুদ্ধে রাজ্য পুলিশের দায়ের করা এফআইআর-এর ওপর স্থগিতাদেশ দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নবান্নের অস্বস্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
নিচে শুনানির বিস্তারিত রিপোর্ট এবং বিচারপতিদের কড়া পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হলো:
‘যা করেছেন তাতে ১০ মিনিটেই রায় দিয়ে দিতাম!’ আইপ্যাক কাণ্ডে রাজ্যকে নজিরবিহীন ভর্ৎসনা সুপ্রিম কোর্টের
মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক রিপোর্ট (১৫ জানুয়ারি, ২০২৬): আইপ্যাক মামলায় বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে বড়সড় ধাক্কা খেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। ইডি-র অফিসারদের বিরুদ্ধে রাজ্যের দায়ের করা এফআইআর-এর ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়ার পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার কাজে রাজ্যের হস্তক্ষেপ নিয়ে কড়া মন্তব্য করল শীর্ষ আদালত। রাজ্য সরকারের তরফে বর্ষীয়ান আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি ইডি-র ‘কঠোর পদক্ষেপ’ (Coercive Action) ঠেকানোর জন্য বারবার সওয়াল করলেও, বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।
সিংভির সওয়াল ও বিচারপতির কড়া জবাব
শুনানির শেষ পর্বে তৃণমূল ও রাজ্য সরকারের পক্ষে আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি আবেদন করেন, “মাই লর্ড, অন্তত একটি অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হোক যাতে ইডি আমাদের মক্কেল বা আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ (Coercive action) না নেয়।” এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র যে মন্তব্য করেন, তা এজলাসে উপস্থিত সকলকে চমকে দেয়।
বিচারপতি: “মিস্টার সিংভি, গত কয়েক দিনে আইপ্যাক দপ্তরে এবং কলকাতা হাইকোর্টে যা ঘটেছে, তা যদি আমি আজই বিচার করতে বসতাম, তবে ১০ মিনিটের মধ্যেই আমি রায় ঘোষণা করে দিতে পারতাম। কিন্তু আমরা উভয় পক্ষকে সুযোগ দিতে চাই। তাই এই মুহূর্তে আপনাদের কোনও রক্ষাকবচ বা আবেদনের ওপর স্থগিতাদেশ দিচ্ছি না।”
সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল-জবাবের মূল অংশ
অভিষেক মনু সিংভি (রাজ্যের পক্ষে): “ইডি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্বাচনের আগে আইপ্যাক দপ্তরে হানা দিয়েছে। এটি আমাদের গোপন নির্বাচনি তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।”
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র: “মিস্টার সিংভি, ইডি-র অফিসারদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ দিয়ে তাঁদের ঘেরাও করা হয়েছে। এটি আইনের শাসনের (Rule of Law) পরিপন্থী। যদি কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, তবে দেশে অরাজকতা তৈরি হবে।”
তুষার মেহতা (ইডির পক্ষে): “মাই লর্ড, এটি স্রেফ বাধা নয়, এটি ‘মবক্রেসি’ (Mobocracy) বা ভিড়ের শাসন। খোদ মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে নথি ছিনিয়ে নিয়েছেন। হাইকোর্টে আমাদের আইনজীবীদের হেনস্থা করা হয়েছে।”
বিচারপতি: “কলকাতা হাইকোর্টের ঘটনায় আমরা অত্যন্ত বিচলিত। বিচারবিভাগীয় কাজে এই ধরণের বিঘ্ন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ (১৫ জানুয়ারি, ২০২৬)
বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলির বেঞ্চ নিম্নলিখিত নির্দেশগুলি দিয়েছে:
১. রাজ্য পুলিশের এফআইআর-এ স্থগিতাদেশ: ইডির অফিসারদের বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ যে অভিযোগ দায়ের করেছিল, তার ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেওয়া হলো। অর্থাৎ, আপাতত ওই মামলায় ইডি অফিসারদের গ্রেপ্তার বা হেনস্থা করা যাবে না।
২. নোটিশ জারি: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ডিজি রাজীব কুমার এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে নোটিশ জারি করে দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব চাওয়া হয়েছে।
৩. ৩ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী শুনানি: সিবিআই তদন্ত এবং ডিজি-র অপসারণ সংক্রান্ত ইডির আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি হবে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি।
নবান্নের উদ্বেগ কেন বাড়ল?
আজকের শুনানিতে আদালত যেভাবে সিংভি এবং সিব্বলের সমস্ত যুক্তি অগ্রাহ্য করে ইডি-র সুরক্ষায় সায় দিল, তাতে পরিষ্কার যে সর্বোচ্চ আদালত তদন্তে বাধার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। বিশেষ করে বিচারপতি যখন বলেন যে তিনি ‘১০ মিনিটে রায়’ দিতে পারতেন, তখন ইঙ্গিত স্পষ্ট—রাজ্য সরকারের ভূমিকা আদালতের চোখে সন্তোষজনক নয়। ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে এফআইআর স্থগিত হওয়ায় এখন কেন্দ্রীয় সংস্থা আরও আগ্রাসীভাবে তদন্ত এগোতে পারবে।
ট্যাগ (Tags):
#SupremeCourtHearing #AbhishekManuSinghvi #JusticePrashantKumarMishra #IPACRaidScandal #EDvsMamata #BengalPolitics2026 #RuleOfLaw #CoerciveActionPlea #BreakingNewsLegal #SupremeCourtVerdict #KolkataNews #CoalScamInvestigation

0 মন্তব্যসমূহ