SIR নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে বিরাট ধাক্কা নির্বাচন কমিশনের- মাধ্যমিকের এডমিট বৈধ, প্রকাশ করতে হবে তালিকা, সঙ্গে আর কি কি নির্দেশ ?
পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) এবং বিশেষ করে ১.৩৬ কোটি ভোটারের নামের পাশে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপিন্সি’ (Logical Discrepancy) বা ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র তকমা লাগিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট আজ নির্বাচন কমিশনকে (ECI) নজিরবিহীন ভর্ৎসনা ও নির্দেশ প্রদান করেছে।
সুপ্রিম কোর্ট শুনানির মূল হাইলাইটস (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬):
স্বচ্ছতার নির্দেশ: ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপিন্সি’ তালিকায় থাকা ১.৩৬ কোটি মানুষের নাম প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত ভবন, ব্লক অফিস (BDO) এবং ওয়ার্ড অফিসে জনসমক্ষে টাঙিয়ে দিতে হবে।
অ্যাডমিট কার্ডের স্বীকৃতি: দীর্ঘ টালবাহানার পর আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, বয়সের প্রমাণ হিসেবে দশম শ্রেণীর অ্যাডমিট কার্ড (Madhyamik Admit Card) বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
হোয়াটসঅ্যাপ নির্দেশ বন্ধ: হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিএলও-দের কাছে কোনও ‘অ-অফিশিয়াল’ নির্দেশ পাঠানো যাবে না। প্রতিটি নির্দেশ হতে হবে অফিসিয়াল এবং অডিট ট্রেইল যুক্ত।
বিএলএ (BLA) অন্তর্ভুক্তি: শুনানির সময় রাজনৈতিক দলগুলির বুথ লেভেল এজেন্টদের (BLA) উপস্থিত থাকার অনুমতি দিয়েছে আদালত, যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
সময়সীমা ও পরিকাঠামো: আপত্তি জানানোর জন্য ১০ দিন অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে এবং রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পঞ্চায়েত ভবনগুলিতে পর্যাপ্ত পরিকাঠামো ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে।
পূর্ণাঙ্গ হিয়ারিং রিপোর্ট: ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬
বেঞ্চ: প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী।
আজ দুপুর ২টো নাগাদ শুনানি শুরু হতেই প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিংভি এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত ত্রুটির পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ তুলে ধরেন।
কপিল সিব্বলের সওয়াল:
“লর্ডশিপ, প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষের তথ্যকে ‘সন্দেহজনক’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে কেবল একটি যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের ভিত্তিতে। তাঁদের অপরাধ কী? কারও বাবার নামের বানানে সামান্য তফাত, কারও বা বয়সের পার্থক্যে যান্ত্রিক ত্রুটি। অথচ নির্বাচন কমিশন বুথ লেভেল অফিসারদের কোনও লিখিত নির্দেশ দিচ্ছে না। সব হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপে। এমনকি নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনকেও নোটিশ দেওয়া হয়েছে কারণ তাঁর মায়ের সাথে তাঁর বয়সের তফাত যান্ত্রিকভাবে ১৫ বছরের কম দেখানো হয়েছে। এটি হাস্যকর এবং বিপজ্জনক।”
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ:
(কমিশনের আইনজীবীর উদ্দেশ্যে) “এই লজিক্যাল ডিসক্রিপিন্সি কথাটির আইনি ভিত্তি কী? আপনারা বলছেন এটি সংশোধনীর জন্য, কিন্তু সাধারণ মানুষ তো আতঙ্কে আছেন যে তাঁদের নাম কেটে দেওয়া হবে। আপনারা তালিকা জনসমক্ষে আনছেন না কেন? ভোটাররা অন্ধকারে কেন থাকবেন?”
অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে বিতর্ক:
আবেদনকারী পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, কমিশন দশম শ্রেণীর অ্যাডমিট কার্ড গ্রহণ করছে না, যার ফলে গ্রামের লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদের জন্ম শংসাপত্র নেই, তারা বিপাকে পড়েছেন। নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী জানান, এটি তাদের গাইডলাইনে নেই।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কড়া নির্দেশ:
“আপনারা অ্যাডমিট কার্ড গ্রহণ করবেন না কেন? এটি একটি সরকারি নথি। যাঁদের বার্থ সার্টিফিকেট নেই, তাঁদের জন্য এটিই প্রধান পরিচয়। আমরা নির্দেশ দিচ্ছি, ভেরিফিকেশনের জন্য দশম শ্রেণীর অ্যাডমিট কার্ড বৈধ বলে গণ্য করতে হবে।”
আদালতের চূড়ান্ত আদেশনামা:
বেঞ্চ আজ নির্দেশ দেয় যে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রতিটি পঞ্চায়েত ভবনে এই তালিকা টাঙাতে হবে। মানুষের সুবিধার্থে শুনানি প্রক্রিয়া ব্লক অফিস থেকে সরিয়ে পঞ্চায়েত স্তরে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি শুনানিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি তাঁর প্রতিনিধি বা বিএলএ-কে সাথে রাখতে পারবেন। সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলে নথি জমা দেওয়ার জন্য প্রতিনিধি পাঠানো যাবে।
কেন এই রায় নির্বাচন কমিশনের এক বিরাট ধাক্কা ?
সুপ্রিম কোর্টের আজকের এই ২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা শুনানি এবং তার পর দেওয়া নির্দেশিকা পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে এক বিরাট টার্নিং পয়েন্ট। এর বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. যান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারিতার অবসান
নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল যে তাদের ‘ডি-ডুপ্লিকেশন’ সফটওয়্যার অত্যন্ত নির্ভুল। কিন্তু আদালত আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, প্রযুক্তি কখনোই মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। ১.৩৬ কোটি ভোটারের নামের পাশে ‘অসঙ্গতি’র দাগ লাগানো আসলে ভোটারদের এক ধরণের ‘প্রোফাইলিং’ করার নামান্তর। আদালত আজ স্পষ্ট করেছে যে, সফটওয়্যারের ত্রুটি যেন ভোটারের ঘাড়ের বোঝা না হয়। এটি আসলে ‘টেকনো-ব্যুরোক্রেসি’র বিরুদ্ধে সংবিধানের জয়।
২. অ্যাডমিট কার্ড: সাধারণ মানুষের কবচ
পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ জনজীবনে ‘মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড’ কেবল একটি পরীক্ষার প্রবেশপত্র নয়, এটি একটি মানুষের অস্তিত্বের প্রমাণ। কমিশন এটি বাদ দিয়ে আসলে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলার রাস্তা তৈরি করছিল বলে বিরোধীদের যে অভিযোগ ছিল, আদালত আজ তাতে শীলমোহর দিল। অ্যাডমিট কার্ডকে বৈধতা দিয়ে আদালত আসলে লক্ষ লক্ষ গরিব ও পিছিয়ে পড়া মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষিত করল।
৩. হোয়াটসঅ্যাপ ও অডিট ট্রেইল
নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক সংস্থা যখন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিএলও-দের নির্দেশ দেয়, তখন তার কোনও জবাবদিহি থাকে না। সিব্বল ও সিংভি আজ আদালতে প্রমাণ করেছেন যে, কোনও রেকর্ড না রেখে এভাবে নির্দেশ দেওয়া আসলে নির্বাচনি কারচুপিরই নামান্তর। আদালত আজ লিখিত নির্দেশের বাধ্যবাধকতা জারি করে কমিশনের ‘অদৃশ্য হাত’কে বেঁধে দিল। এখন প্রতিটি নাম কাটার জন্য কমিশনকে লিখিত জবাব দিতে হবে।
৪. রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ২০২৬-এর লড়াই
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এটি এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক জয়। তাঁরা শুরু থেকেই দাবি করছিলেন যে, বিজেপির ইশারায় কমিশন ভোটার তালিকায় কারচুপি করছে। অমর্ত্য সেনের মতো ব্যক্তিত্বকে নোটিশ দেওয়ার প্রসঙ্গটি আজ আদালতে কমিশনকে চূড়ান্ত অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে। ১৯ জানুয়ারির এই রায় ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনে এক ধরণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করল।
৫. পঞ্চায়েত ভবনের গুরুত্ব
আগে ভোটারদের শুনানির জন্য মাইলের পর মাইল পেরিয়ে বিডিও অফিসে যেতে হতো। আদালত আজ সেই লড়াইকে ভোটারের দুয়ারে পৌঁছে দিল। পঞ্চায়েত ভবনে তালিকা প্রকাশ এবং সেখানেই শুনানির ব্যবস্থা করার নির্দেশ ভোটারদের ভোগান্তি কমাবে এবং স্বচ্ছতা বাড়াবে। এটি কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আজকের এই কড়া অবস্থান নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসনের ওপর আঘাত নয়, বরং তার নিরপেক্ষতা রক্ষার একটি তাগিদ। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপিন্সি’র আড়ালে যে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাতিলের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আজ আদালত তার সামনে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর খাড়া করে দিল। ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ দিনটি প্রমাণ করল যে, ভারতের বিচারবিভাগ এখনও সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থল। কমিশনের জন্য এটি একটি বিরাট ধাক্কা, কারণ তাদের সুশৃঙ্খল ‘SIR’ প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি অর্থাৎ ‘টেকনিক্যাল ফিল্টার’ আজ আদালত নস্যাৎ করে দিয়ে স্বচ্ছতা ও মানুষের অধিকারকেই জয়ী করল।
ট্যাগ (Tags):
#SupremeCourtHearing #VoterList2026 #LogicalDiscrepancy #WestBengalSIR #MadhyamikAdmitCard #MamataBanerjeeVsECI #AmartyaSenNotice #DemocraticRights #VoterRollTransparency #BreakingNewsBengal #ManusherBhashaSpecial #LegalVictoryBengal #ECIShock #FullHearingReport

0 মন্তব্যসমূহ