সুপ্রিম রায় ও SIR নিয়ে গোলমালে কিভাবে অনিবার্য রাষ্ট্রপতি শাসনের পথে রাজ্য
মানুষের ভাষা , সম্পাদকীয় :
প্রবীর রায়চৌধুরী,
রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের সামাজিক জীবনের প্রতিটি পরত থেকে রাজনীতি করতে থাকবে—সেটাই এই মুহূর্তের রিয়েলিটি। তবে একটি বিষয়ে আপনারা নিশ্চয়ই একমত হবেন যে, আমাদের ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রকল্প বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় এত ঘনঘন নিয়মের পরিবর্তন আমরা দেখিনি। একটি নির্দিষ্ট প্রসেস চলাকালীন সময়ে একই নিয়মকে জারি করে আবার তা পাল্টে নতুন নিয়ম নিয়ে আসা—কোনও একটি নির্দিষ্ট সংস্থার তরফ থেকে এমন নজির খুব একটা মনে পড়ছে না।
প্রসঙ্গ হলো এই মুহূর্তের এসআইআর (SIR) পরিস্থিতি। আজ সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ পাওয়া গেল, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। নমস্কার, 'মানুষের ভাষা'য় আপনাদের স্বাগত। আমি প্রবীর রায়চৌধুরী।
স্বচ্ছ ভোটার তালিকা ও এসআইআর-এর প্রয়োজনীয়তা
এসআইআর (Special Intensive Revision)-এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এই চ্যানেলে আমরা আগেও কথা বলেছি এবং এর সমর্থন জানিয়েছি। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি স্বচ্ছ এবং সংশোধিত ভোটার তালিকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই তালিকার ভোটাররাই তাদের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন, যারা পরবর্তীতে লোকসভা, বিধানসভা কিংবা পঞ্চায়েতে আমাদের দেশের আইন প্রণয়ন করেন। তাই ভোটার তালিকা নির্ভুল হওয়া প্রয়োজন—সে পর্যন্ত সব ঠিক ছিল।
আমরা জানি, একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হলে তার সুনির্দিষ্ট নোটিফিকেশন হয় এবং ডকুমেন্টেশনের নিয়মাবলি বেঁধে দেওয়া হয়। মৃত ভোটারের নাম বাদ দেওয়া, একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটারদের তথ্য সংশোধন করা কিংবা জাল নথি দিয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়া বিদেশিদের নাম চিহ্নিত করা—এই পর্যায়গুলো নিয়ে কোনও দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু গোলমালটা পাকালো অন্য জায়গায়।
সুপ্রিম কোর্টের আজকের পর্যবেক্ষণ: লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি ও নতুন নিয়ম
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দীর্ঘদিন ধরে বলছেন, "নো এসআইআর, নো ভোট"। বর্তমান পরিস্থিতি কি সত্যিই সেই দিকে এগোচ্ছে? রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি কি অটোমেটিক রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকে ঝুঁকছে? আজ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সেই সম্ভাবনা আরও জোরদার হলো কিনা, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
আইনের অনেক কূটকচালি থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য আজকের রায়ের প্রধান দিকগুলো হলো:
তালিকা প্রকাশ: সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, আগামী ৩ দিনের মধ্যে প্রতিটি ব্লক (BDO) অফিস এবং গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপিন্সি’ (যৌক্তিক অসঙ্গতি) তালিকায় থাকা ভোটারদের নাম টাঙিয়ে দিতে হবে।
শুনানির সময়সীমা: কোনও ব্যক্তিকে হিয়ালিং-এ ডাকার জন্য তাঁকে অন্তত ১০ দিন আগে নোটিশ বা সময় দিতে হবে।
অ্যাডমিট কার্ডের বৈধতা: এটি একটি অত্যন্ত বড় জয়। নির্বাচন কমিশন এতদিন বলছিল যে মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট ছাড়া হবে না, কিন্তু মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট আজ মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডকে বয়সের প্রমাণ হিসেবে বৈধতা দিয়েছেন।
সহযোগিতা (BLA-2): শুনানির সময় ভোটার চাইলে তাঁর সাথে কোনও অনুমোদিত প্রতিনিধি বা পলিটিক্যাল এজেন্ট (BLA) থাকতে পারবেন, যদি ভোটার তাঁকে অথরাইজ করেন।
প্রশাসনিক বিভ্রান্তি ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে—যারা ইতিমধেই হিয়ালিং-এর নোটিশ পেয়ে গেছেন এবং যাদের ১০ দিনের কম সময় দেওয়া হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে? তাদের কি পুনরায় নোটিশ দেওয়া হবে? নির্বাচন কমিশন এই প্রসেসটি নিয়ে শুরু থেকেই একের পর এক কনফিউশন তৈরি করেছে।
রাস্তায় রাস্তায় প্রচার বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সহজ গাইডলাইন ভিডিওর মাধ্যমে মানুষের বিভ্রান্তি দূর করার কোনও সদিচ্ছা কমিশনের তরফ থেকে দেখা যায়নি। ফলে একজন সাধারণ মানুষ—যিনি হয়তো চোখে কম দেখেন, কানে কম শোনেন কিংবা যার ফর্ম পড়ে বোঝার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই—তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।
বিএলও (BLO)-রা অভিযোগ করছেন কাজের চাপে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অন্যদিকে একজন সাধারণ মানুষ যখন বিএলও-র কাছে যাচ্ছেন, তখন সঠিক উত্তর পাচ্ছেন না। বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যও জানিয়েছেন যে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উচিত রাস্তায় নেমে হিয়ালিং সেন্টারগুলোর পরিস্থিতি দেখা।
ডিজিটাল জটিলতা: অ্যাপ ও পোর্টালের সমস্যা
কমিশন ভোটার অ্যাপ বা এনভিএসপি (NVSP) পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে ডকুমেন্ট আপলোডের সুযোগ দিলেও সেখানেও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
লগইন সমস্যা: আধার ও ভোটার কার্ডের বানানে সামান্য অমিল থাকলে ওটিপি আসছে না।
ডকুমেন্ট আপলোড: পোর্টালে ফ্রন্ট পেজ এবং ব্যাক পেজ আপলোডের অপশন থাকলেও অনেক ডকুমেন্টের ব্যাক পেজ থাকে না। সেখানে কী আপলোড করতে হবে, তার কোনও গাইডলাইন নেই।
ম্যাপিং সমস্যা: দাদু, বাবা বা মায়ের সাথে লিঙ্কেজ করার ক্ষেত্রে কোন নথি কোথায় দিতে হবে, তা নিয়ে বিএলও-দের কাছেও কোনও পরিষ্কার ইনস্ট্রাকশন নেই।
২০২৬ নির্বাচন ও রাষ্ট্রপতি শাসন
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল যে ফেব্রুয়ারি ১৪-এর মধ্যে ফাইনাল ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আজকের এই ৩ দিন ও ১০ দিনের সময়সীমার নির্দেশ এবং রাজ্যে চলা বর্তমান অস্থিরতায় কি সেই ডেডলাইন রক্ষা করা সম্ভব?
যদি হিয়ালিং প্রসেস পিছিয়ে মার্চের দিকে চলে যায়, তবে 'মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট' বা নির্বাচনী আচরণবিধি লাগু হবে কবে? আর মে মাসের ২ তারিখের মধ্যে যদি নতুন বিধানসভা গঠন না হয়, তবে তো বিরোধী দলনেতার আশঙ্কা অনুযায়ী রাজ্য রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকেই এগিয়ে যাবে।
সাধারণ মানুষের হয়রানি বন্ধ হোক
রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি করবেই, কিন্তু তার বলি যেন সাধারণ মানুষ না হয়। যারা অবৈধভাবে ভোটার তালিকায় ঢুকেছে, তাদের নাম অবশ্যই বাদ যাক। কিন্তু সামান্য ভুলত্রুটির জন্য যারা নোটিশ পেয়েছেন, তাদের যথাযথ সাহায্য করা নির্বাচন কমিশনের নৈতিক দায়িত্ব। হসপিটালে থাকা মানুষ, বয়স্ক মানুষ কিংবা প্রান্তিক মানুষদের সমস্যার কথা মাথায় রেখে একটি সুন্দর সিস্টেম তৈরি করার সময় হাতে নেই—তৎসত্ত্বেও কমিশনকে অনুরোধ করব, মানুষ যেন একটু সুষ্ঠুভাবে হিয়ালিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।
#SupremeCourtHearing, #SIRWestBengal, #VoterListRevision, #LogicalDiscrepancy, #MadhyamikAdmitCard, #ElectionCommissionIndia, #BengalElection2026, #PanchayatBhawanList, #PresidentRuleBengal, #ManusherBhasha, #PrabirRaiChaudhuri, #VoterRights, #LegalUpdateBengal, #ECIStrike, #WestBengalPolitics

0 মন্তব্যসমূহ