দু'বছরে 'অভয়া' —
একটি রাত, একটা রাজ্য, আর প্রশ্নের পাহাড়
বিচার পরে থাকলে পাপের পরিমাণটাই বাড়বে
সম্পাদকীয় , প্রবীর রায় চৌধুরী
৯ অগস্ট, ২০২৪। রাত পোহালেই একটা শহর নিজেকে আর চিনতে পারেনি। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের সেমিনার হলে পড়ে ছিল এক তরুণী চিকিৎসকের নিথর দেহ। দু'বছর পর, আজও সেই প্রশ্নগুলো অমীমাংসিত — কে করেছিল? একা করেছিল, না কারও ছত্রছায়ায়? আর যাঁরা প্রথম রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন, তাঁরা সত্যি আড়াল করার চেষ্টা করেননি তো? আজ, এই দ্বিতীয় বার্ষিকীর সকালে, চলুন গোড়া থেকে ফিরে দেখি — কী ঘটেছিল, কী ঘটতে থাকল, আর শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকল বাংলার এই সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়।
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। ৯ অগস্টের সকাল। চতুর্থ তলার সেমিনার হল থেকে উদ্ধার হয় একত্রিশ বছর বয়সি স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকের দেহ। রাতভর ডিউটি করে ক্লান্ত হয়ে তিনি ওই ঘরেই বিশ্রাম নিতে গিয়েছিলেন। যে হাসপাতালে তিনি মানুষের প্রাণ বাঁচাতেন, সেই হাসপাতালেরই একটি ঘর হয়ে ওঠে তাঁর নিজের প্রাণ হারানোর জায়গা। পরদিন কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে সঞ্জয় রায় নামে এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে। কিন্তু গ্রেফতারির গতির চেয়েও বেশি প্রশ্ন উঠেছিল তদন্তের প্রথম কয়েক ঘণ্টার আচরণ নিয়ে। ঘটনাস্থল কি ঠিকমতো সিল করা হয়েছিল? ময়নাতদন্তের আগে কেন দেহ নিয়ে টানাপড়েন হল পরিবারের সঙ্গে? কেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে? এই প্রশ্নগুলোই পরবর্তী দু'বছর ধরে গোটা ঘটনাকে একটা সাধারণ ফৌজদারি মামলা থেকে রাজ্যের রাজনৈতিক ভূমিকম্পে পরিণত করে। মৃতার বাবা-মা প্রথম থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন — তাঁরা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ভরসা রাখতে পারছেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় থানার প্রাথমিক ভূমিকা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ ছিল প্রকাশ্যে। এই অবিশ্বাসের সূত্র ধরেই মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে, আর হাইকোর্ট তদন্তভার তুলে দেয় সিবিআই-এর হাতে।
তারপর এল সেই রাত, যা রাজ্যের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল সত্যিকার অর্থেই। ১৪ অগস্ট রাতে কলকাতা তথা গোটা রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে "রাত দখল" আন্দোলন। জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতিতে যান, নাগরিক সমাজ রাস্তায় নামে। এই আন্দোলনের একটা বৈশিষ্ট্য ছিল — এটা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যানারে হয়নি, বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহিলাদের নিরাপত্তা আর বিচারের দাবিতে সংগঠিত হয়েছিল। "জাস্টিস ফর অভয়া" — নির্যাতিতাকে দেওয়া এই ছদ্মনামেই গোটা আন্দোলন পরিচিতি পায়, কারণ আইনি বাধ্যবাধকতায় তাঁর প্রকৃত নাম প্রকাশ করা যায়নি। জুনিয়র ডাক্তারদের দাবি ছিল স্পষ্ট — নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, দোষীদের দ্রুত শাস্তি, হাসপাতাল প্রশাসনের দায়বদ্ধতা। কিন্তু রাজ্য সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। আন্দোলনরত ডাক্তারদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক ঘিরে টানাপড়েন, লাইভ স্ট্রিমিং নিয়ে বিতর্ক, আর সরকারের তরফে আন্দোলনকে "রাজনৈতিক চক্রান্ত" বলে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা — এই সবকিছু জনমানসে সরকারের প্রতি অবিশ্বাসকে আরও গভীর করে তোলে। এর মধ্যেই ঘটে আরও একটি ঘটনা যা প্রশাসনের ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত হানে — সেই একই রাতে হাসপাতাল চত্বরে ভাঙচুর ও তাণ্ডবের ঘটনা, যাকে ঘিরে ওঠে প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ। প্রশ্ন ওঠে — একটা স্পর্শকাতর অপরাধের ঘটনাস্থলের এত কাছে, রাতের অন্ধকারে, এই তাণ্ডব ঘটল কী করে, আর পুলিশ কেন তা রুখতে ব্যর্থ হল?
আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই সামনে আসতে থাকে দ্বিতীয় একটা কাহিনি — হাসপাতালের ভেতরের দুর্নীতির কাহিনি। আরজি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে ঘিরে জমে ওঠা অভিযোগের পাহাড়টা বোধহয় গোটা মামলার সবচেয়ে অস্বস্তিকর উপকাহিনি। ২০২১-এর ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি ছিলেন এই মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ। কৌতূহলের বিষয় হল, ২০২৩-এর অক্টোবরে তাঁকে বদলি করা হলেও এক মাসের মধ্যেই তিনি ফের একই পদে ফিরে আসেন — কীভাবে, কার সিদ্ধান্তে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আজও মেলেনি। ঘটনার দিন পর্যন্ত তিনিই ছিলেন হাসপাতালের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্তা। খুনের ঘটনার পরপরই হাসপাতালের সহকারী সুপার আখতার আলি প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, সন্দীপ ঘোষ ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নিতেন, ইচ্ছাকৃতভাবে ছাত্রদের ফেল করাতেন। সবচেয়ে গা শিউরে ওঠা অভিযোগটা ছিল আরও গভীরে — আলির দাবি, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, গ্লাভস আর অন্যান্য জৈব-চিকিৎসা বর্জ্য বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছে বিক্রি করা হত অধ্যক্ষের প্রত্যক্ষ মদতে, এমনকি অবিতর্কিত-দাবিহীন মৃতদেহ বিক্রির চেষ্টাও নাকি হয়েছিল। তাঁর কথায়, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান নিজে এই নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, এমনকি একটি জাতীয় কমিশন পর্যন্ত সন্দীপ ঘোষকে তলব করেছিল। মনে রাখা দরকার, এই নির্দিষ্ট অভিযোগগুলো এখনও আদালতে প্রমাণিত সত্য নয় — এগুলো আখতার আলির দাবি, যা তদন্তের অধীন। কিন্তু আলির আরেকটা কথা প্রশ্নটাকে আরও ধারালো করে তোলে — তিনি বলেন, ২০২৩ সালেই তিনি রাজ্য প্রশাসন, ভিজিল্যান্স কমিশন আর দুর্নীতি দমন শাখায় লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন, থানায় এফআইআর দায়েরের চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু তা গৃহীত হয়নি। প্রশ্নটা তাহলে দাঁড়ায় এখানে — একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে এত গুরুতর, লিখিত, নথিভুক্ত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি টানা প্রায় এক বছর ধরে? প্রশাসনিক স্তরে এই অভিযোগ কি সজ্ঞানে চাপা দেওয়া হয়েছিল, নাকি নিছকই ঢিলেমি — সেই উত্তর আজও কারও কাছে স্পষ্ট নয়। ২ সেপ্টেম্বর সিবিআই সন্দীপ ঘোষকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গ্রেফতার করে, নভেম্বরে চার্জশিট দাখিল হয় তাঁর ও আরও চারজনের বিরুদ্ধে, যাঁদের একজন তৃণমূলের যুবনেতা বলে পরিচিত আশিস পাণ্ডেও। রাজ্য সরকার তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর অনুমতি দেয়, তদন্তে যুক্ত হয় ইডি, যারা টাকার সূত্র অনুসরণ করতে শুরু করে। প্রশ্নটা তবু থেকেই যায় — যাঁর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে প্রকাশ্যে ছিল, তাঁকে ব্যবস্থা নিতে খুনের ঘটনার অপেক্ষা করতে হল কেন?
সন্দীপ ঘোষের গল্পটা যেন গোটা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল — জুনিয়র ডাক্তারদের বিয়াল্লিশ দিনের কর্মবিরতি আর তার পরের আমরণ অনশনে তাঁরা যে দশ দফা দাবি সামনে রেখেছিলেন, তার প্রতিটাই আসলে একটা প্রতিষ্ঠানের ভেতরের পচন উন্মোচনের চেষ্টা। নির্যাতিতা "অভয়া"-র জন্য দ্রুত ও সম্পূর্ণ ন্যায়বিচার, তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের অপসারণ, স্বাস্থ্য সচিব এন এস নিগম-সহ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা অধিকর্তাদের অপসারণ, হাসপাতালে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ও নিরাপদ অন-কল রুম-ওয়াশরুম, কেন্দ্রীভূত রেফারেল ব্যবস্থা ও শয্যা-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক নিরাপত্তা টাস্ক ফোর্স, বাড়তি পুলিশি প্রহরা ও স্থায়ী মহিলা পুলিশকর্মী নিয়োগ, ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের শূন্যপদ পূরণ, আর সবশেষে পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য নিয়োগ পর্ষদের ভেতরে চলা তথাকথিত "থ্রেট কালচার" বা ভয়ের রাজত্ব চালানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং স্বচ্ছ বদলি নীতি। এই দাবিগুলো লক্ষ করলেই বোঝা যায়, আন্দোলনটা কখনওই শুধু একটা খুনের বিচার চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না — এটা আসলে ছিল রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ভেতরে বছরের পর বছর জমে থাকা সিন্ডিকেট-রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, যেখানে ডাক্তাররা নিজেরাই স্বীকার করেছেন, হুমকি সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলে আসছিল প্রশাসনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ে। দেড় মাসের অনশন-আন্দোলনের পরেও রাজ্য সরকার শুধু আশ্বাস দিয়েই আন্দোলন থামাতে চেয়েছিল বলে অভিযোগ, যার ফলে মাসকয়েক পরপর একই দাবিতে ফের রাস্তায় নামতে হয়েছে ডাক্তারদের।
এই গোটা সময়টায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের প্রতিক্রিয়াগুলো লক্ষ করলে একটা ধরন স্পষ্ট হয়ে ওঠে — প্রতিটি সমালোচনার জবাব এসেছে পাল্টা অভিযোগ দিয়ে। জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে বৈঠকে লাইভ-স্ট্রিমিং নিয়ে বিরোধের পর তিনি মন্তব্য করেন, আন্দোলনরত ডাক্তারদের একটা রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা রয়েছে। একই মাসে নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠকে অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার ষড়যন্ত্র করছে, এমনকি দাবি করেন কিছু বামপন্থী দলও এতে জড়িত। অথচ একই সময়ে জনরোষের চাপে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, মানুষের স্বার্থে প্রয়োজনে তিনি পদত্যাগ করতে রাজি। ২৭ অগস্ট নবান্ন অভিযানে জল কামান আর কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে পুলিশ যেভাবে মিছিল রোখে, তার জন্য মুখ্যমন্ত্রী পুলিশকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানান, আর বিজেপির প্রতিবাদকে "বাংলাকে বদনাম করার চেষ্টা" বলে আক্রমণ করেন। পরে লন্ডনে অক্সফোর্ডের কেলগ কলেজে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ছাত্র বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েও প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাননি, বরং কৌশলে জবাব দিয়েছিলেন প্রতিবাদকারীদের। এই প্যাটার্নটাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে — একজন মা যখন নিজের মেয়ের ন্যায়বিচার চাইছেন, তখন রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসক বারবার প্রসঙ্গটাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন কেন্দ্র-বিরোধী রাজনীতির দিকে, বিরোধীদের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকে। সহানুভূতির ভাষা আর প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ভাষা — এই দুটোর মধ্যে ভারসাম্য শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেননি তিনি, আর ২০২৬-এর ভোটবাক্সে তার মাশুলও তাঁকে দিতে হয়েছে, সে কথায় পরে আসছি।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে যাওয়ার পর তদন্ত এগোয় নতুন গতিতে। দীর্ঘ ইন-ক্যামেরা বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০২৫-এর ১৮ জানুয়ারি শিয়ালদহ আদালত সঞ্জয় রায়কে ধর্ষণ ও খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে, দু'দিন পর তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, এই বলে যে ঘটনাটি "বিরলতম বিরল" মামলার আওতায় পড়ে না। রাজ্যকে নির্যাতিতার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এই রায়েই কাহিনির যবনিকা পড়েনি — বরং এখান থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় অধ্যায়। সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও, একটিই প্রশ্ন গোটা রাজ্যকে কুরে কুরে খেতে থাকে — শুধু একজন মানুষই কি এই কাজ করতে পারে? মৃতার বাবা-মা প্রকাশ্যেই বলেছেন, তাঁরা বিশ্বাস করেন না যে সঞ্জয় রায় একা এই অপরাধের জন্য দায়ী। তাঁদের ভাষায়, "একা সঞ্জয় রায় আমাদের মেয়ের সঙ্গে এই নৃশংসতা করতে পারে না, আরও কয়েকজন জড়িত ছিল।" তাঁরা আদালতে আবেদন করেন, যাতে ঘটনার রাতে ডিউটিতে থাকা অন্যদের এবং সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ অফিসারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সিবিআই-এর পলিগ্রাফ পরীক্ষার ভিত্তিতে দাবি করা তথ্যকে বাবা-মা "চূড়ান্ত প্রমাণ" বলে মানতে নারাজ। তাঁদের অভিযোগ, প্রথমে কলকাতা পুলিশ এবং পরে সিবিআই — দুই তদন্তকারী সংস্থাই "বৃহত্তর ষড়যন্ত্র"-এর দিকটি এড়িয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারিতে বাবা প্রকাশ্যেই বলেন, সিবিআই বিক্রি হয়ে যায়নি তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, প্রশ্ন তোলেন, "চোর কি কখনও নিজেই স্বীকার করবে যে সে চুরি করেছে?" এই একটা বাক্যেই ধরা পড়ে গোটা পরিবারের হতাশা — যে সংস্থাকে সুবিচারের শেষ ভরসা মনে করা হয়েছিল, তার প্রতিও আস্থা টলমল।
সেই অবিশ্বাসের চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল প্রথম বার্ষিকীতে। ২০২৫-এর ৯ অগস্ট, প্রতিশ্রুতি ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের। কিন্তু নবান্ন অভিযানের পথে পুলিশের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা, আর সেই সংঘর্ষে মাথায়, হাতে, পিঠে আঘাত পান স্বয়ং নির্যাতিতার মা। একটি রাজ্যের কাছে এর চেয়ে লজ্জার দৃশ্য বোধহয় আর কিছু হতে পারত না — যে মা দু'বছর ধরে মেয়ের বিচার চেয়ে রাস্তায় নেমেছেন, রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে তাঁকেই আহত হতে হল। সংঘর্ষের আগে বাবা-মা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, সিবিআই বিক্রি হয়ে যায়নি এমন নিশ্চয়তা কারও নেই। সেদিনের প্রতিবাদে বিজেপির বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দলীয় পতাকা ছাড়াই যোগ দেন বাবা-মায়ের পাশে। আর এখানেই ফুটে ওঠে আন্দোলনের ভিতরের একটা জটিল, অস্বস্তিকর সমীকরণ। বাবা-মা অন্য বিরোধী দলগুলোকেও প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু শুভেন্দু ও বিজেপি নেতাদের উপস্থিতির কারণ দেখিয়ে বামপন্থী ও অন্যান্য দলগুলো সেই কর্মসূচি থেকে দূরে থেকে আলাদা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে, তার একটি হয় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের কাছে। এই দৃশ্যটাই বামেদের ভূমিকার সবচেয়ে বড় স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে দেয়। আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই সিপিএম ঘোষণা করেছিল, এই আন্দোলন কেবল একটা অপরাধের বিচার চাওয়া নয়, বরং তাদের ভাষায় "তৃণমূল-অপরাধী আঁতাঁতের" বিরুদ্ধে লড়াই। বাম কর্মী-সমর্থকরা রাস্তায় নেমেছিলেন, লালবাজার অভিযান করেছিলেন, সংসদে আইন প্রণয়নের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক ফসল তারা ঘরে তুলতে পারেনি — বরং প্রথম বার্ষিকীর মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, যখন গোটা রাজ্যের চোখ সেদিকে, তখন তারা মূল প্রতিবাদ থেকে সরে গিয়ে নিজেদের আলাদা কর্মসূচিতে ব্যস্ত থেকেছে, শুধুমাত্র বিজেপির উপস্থিতির অজুহাতে। প্রশ্ন উঠতেই পারে — যে আন্দোলন "নির্দিষ্ট দলের পতাকামুক্ত" ছিল বলে বামেরা নিজেরাই বারবার দাবি করত, সেই আন্দোলনেই অন্য একটি দলের উপস্থিতি তাদের কাছে "অচ্ছুৎ" হয়ে উঠল কেন? সিদ্ধান্তটা নীতিগত ছিল, নাকি নিছকই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার হিসেব-নিকেশ, সেই প্রশ্নের সদুত্তর বাম নেতৃত্ব আজও দেননি। এই একই সময়ে আরও একটা তেতো বাস্তবতা সামনে আসে — আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বেশ কয়েকজন জুনিয়র ডাক্তারকে পরবর্তী মাসগুলোয় দূরের জেলা হাসপাতালে বদলি করে দেওয়া হয়, যা নিয়ে চিকিৎসক সংগঠনগুলি সরাসরি অভিযোগ তোলে, প্রতিবাদ স্তব্ধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ। মেধাতালিকা ও শূন্যপদের তালিকার সঙ্গে মিল না থাকা এই বদলি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি প্রতিহিংসা, সেই বিতর্ক আজও ফয়সালা হয়নি।
আরজি কর কোনওদিনই শুধু বাংলার ভেতরের খবর হয়ে থেকে যায়নি। দেশের প্রায় প্রতিটি রাজ্যের চিকিৎসক সংগঠন সংহতি জানিয়ে কর্মবিরতিতে গিয়েছিল, দিল্লির এইমস-সহ বড় প্রতিষ্ঠানের ডাক্তাররা মোমবাতি মিছিল করেছিলেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের পাশাপাশি বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নিয়েছিল এই ঘটনা, বিশেষত নারী নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে। প্রবাসী ভারতীয় চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এই ঘটনা একটা আন্তর্জাতিক সংহতি আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল — #JusticeForDoctors, #WorkplaceSafety-র মতো হ্যাশট্যাগে সামাজিক মাধ্যমে সোচ্চার হয়েছিলেন প্রবাসীরা। এই আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণই একটা বাড়তি চাপ তৈরি করেছিল রাজ্য প্রশাসনের ওপর, কারণ এতদিন যে ঘটনাকে রাজ্য প্রশাসন নিছক "আইনশৃঙ্খলার বিষয়" বলে সীমিত রাখতে চেয়েছিল, তা রাতারাতি হয়ে ওঠে গোটা বিশ্বের নজরে থাকা একটা ভাবমূর্তির প্রশ্ন। সুপ্রিম কোর্টও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মামলাটি গ্রহণ করে দেশজুড়ে চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিল, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রাজ্যগুলিকে হাসপাতালে সিসিটিভি, নিরাপদ ডিউটি রুম, পর্যাপ্ত মহিলা নিরাপত্তারক্ষী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিল। এই প্রক্রিয়াতেও একটা তিক্ত বাস্তবতা প্রকাশ পায় — সন্দীপ ঘোষ নিজে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিলেন, দাবি করেছিলেন আর্থিক অনিয়মের তদন্তকে খুনের মামলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া অন্যায্য। শীর্ষ আদালত সেই আবেদন খারিজ করে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, দুটো বিষয়ই তদন্তের অধীন, আসামির এই যুক্তিতে হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আর যৌন হিংসা — এই মামলায় এই দুটো সুতো কতটা জড়িয়ে গিয়েছিল, এই একটা ঘটনাই তা বুঝিয়ে দেয়।
আর তারপর এল সেই রায়, যা রাজনীতির গোটা মানচিত্রটাই বদলে দিল। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন বাংলার রাজনীতিতে যা ঘটাল, তা নেহাত ক্ষমতা বদল নয় — এটা ছিল একটা রায়। ২০১১ সালে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, ২০২৬-এ ভোটাররা তাঁকেই প্রত্যাখ্যান করলেন। তৃণমূল কংগ্রেসের পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি, আর মুখ্যমন্ত্রী হন শুভেন্দু অধিকারী। সংখ্যাটাই বলে দেয় পরাজয়ের গভীরতা — ভোটে লড়া পঁয়ত্রিশ জন মন্ত্রীর মধ্যে বাইশ জনই হেরে যান, অর্থাৎ মন্ত্রিসভার প্রায় তেষট্টি শতাংশই ধরাশায়ী। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে চল্লিশ শতাংশ মন্ত্রীর হারও "মারাত্মক" ধরা হয়, সেখানে তেষট্টি শতাংশ কার্যত প্রশাসনিক কাঠামোর সামগ্রিক ধসের ইঙ্গিত দেয়। এই ভোটের প্রচারে আরজি কর ইস্যু কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল তা বলাই বাহুল্য। মহিলাদের নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আর প্রশাসনিক অহংকারের প্রতীক হিসেবে বিজেপি এই ইস্যুকে সামনে রেখেই প্রচার চালায়। এমনকি খোদ নির্যাতিতার মা-কেই বিজেপি প্রার্থী করে বলে জানা যায়, যাঁর বক্তব্য ছিল — সরকার বদল ছাড়া সুবিচার আসবে না। বেকার যুবসমাজের ক্ষোভ, মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি, সন্তানকে রাজ্যের বাইরে পাঠাতে বাধ্য হওয়া পরিবারগুলোর ক্ষোভ — এই সবকিছু মিলেই তৈরি হয় সেই সঞ্চিত ক্ষোভ, যা শেষ পর্যন্ত ইভিএমে প্রতিফলিত হয়।
ক্ষমতায় আসার কয়েক দিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরজি কর মামলায় প্রথম বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেন। নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি ঘোষণা করেন তিন জন আইপিএস অফিসারের সাসপেনশন — তৎকালীন কলকাতা পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল, তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার (নর্থ) অভিষেক গুপ্ত এবং ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। অভিযোগ ছিল গুরুতর — তদন্তে পদ্ধতিগত গাফিলতি, নির্যাতিতার পরিবারকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা, লিখিত অনুমতি ছাড়াই সাংবাদিক সম্মেলন করা। তিন জনের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়, পরবর্তীতে তাঁদের সাসপেনশনের মেয়াদ আরও ১২০ দিন বাড়ানো হয়। একই সময়ে সামনে আসে আরেকটি মর্মান্তিক প্রসঙ্গ — অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার পঙ্কজ দত্ত, যিনি পূর্বতন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের কড়া সমালোচক ছিলেন, বিশেষত আরজি কর প্রসঙ্গে। অভিযোগ, বার বার তলব করে তাঁকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ ও অপমানজনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয়েছিল, আর তার কিছুদিন পরেই ডিসেম্বরে বারাণসীতে মস্তিষ্কের গুরুতর আক্রমণে তাঁর মৃত্যু হয়। শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এই ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলো একতরফাভাবে প্রশংসিতও হয়নি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের প্রশ্ন — ক্ষমতায় বসার প্রথম সপ্তাহেই এই সাসপেনশনের ঘোষণা কি সত্যিই ন্যায়বিচারের তাগিদে, নাকি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের একটা দ্রুত, দৃশ্যমান রাজনৈতিক বার্তা? প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায়, নাকি বছরকয়েক পরে নিঃশব্দে ফাইলবন্দি হয়ে যায়, সেটাই আসল পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষায় নতুন সরকার এখনও উত্তীর্ণ প্রমাণিত হয়নি।
এই বছর মে মাসে কলকাতা হাইকোর্ট একটা কড়া নির্দেশ দেয় — সিবিআইকে তিন সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করতে হবে, যারা খতিয়ে দেখবে ঘটনার রাতে, অর্থাৎ ৮ অগস্টের নৈশভোজ থেকে শুরু করে পরদিন সৎকার পর্যন্ত, কোথাও তথ্য চাপা দেওয়া বা তদন্তে গাফিলতি হয়েছিল কি না। সিবিআই ফের আরজি করে গিয়ে ঘটনাস্থল ও সাক্ষীদের নতুন করে পরীক্ষা শুরু করে। কিন্তু এই নতুন তদন্তেও সন্তুষ্ট নয় আদালত। গত ৬ অগস্ট শুনানিতে হাইকোর্ট সরাসরি সিবিআইকে বলে, আগের তদন্তের সিদ্ধান্ত দ্বারা যেন প্রভাবিত না হয় নতুন তদন্ত। নির্যাতিতার বাবা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, শিয়ালদহ আদালত আগের সিবিআই দলকে ভর্ৎসনা করেছিল, বলেছিল তারা কোনও কাজই করেনি, আর এখন হাইকোর্টও একই কথা বলছে।
আজ, ৯ অগস্ট ২০২৬, দ্বিতীয় বার্ষিকী। রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর সকাল এগারোটা থেকে এগারোটা দুই মিনিট পর্যন্ত সব সরকারি হাসপাতালে নীরবতা পালনের নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু প্রতীকী নীরবতার আড়ালে যে প্রশ্নগুলো এখনও গমগম করছে, সেগুলো হল — দু'বছর, দুটো সরকার, দুটো তদন্তকারী সংস্থা আর অজস্র আদালতি শুনানির পরেও কেন এখনও নিশ্চিতভাবে বলা গেল না, ঘটনার রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, আর কতজন তাতে জড়িত ছিল? কেন একটা পরিবারকে দু'বছর পরেও রাস্তায় নেমে বলতে হচ্ছে, তাঁদের মেয়ের প্রকৃত ন্যায়বিচার এখনও অধরা?
তিলোত্তমা বা অভয়া — নাম যা-ই হোক, এই মামলা বাংলাকে শিখিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ছাড়া কোনও প্রশাসনিক পালাবদলই যথেষ্ট নয়। সঞ্জয় রায়ের সাজা হয়েছে, কিন্তু "একা সে করেনি" — এই বিশ্বাস থেকে একটুও নড়েনি নির্যাতিতার পরিবার। তদন্তকারী সংস্থা বদলেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু পরিবারের মূল প্রশ্নটা অপরিবর্তিত রয়ে গেছে — সত্যিটা কি সম্পূর্ণ সামনে এল, নাকি এখনও কোথাও কিছু চাপা পড়ে আছে? এই প্রশ্নের উত্তর রাজনীতির রঙে পাওয়া যাবে না। যাবে শুধু একটাই জায়গা থেকে — সম্পূর্ণ, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ তদন্ত থেকে। যতদিন না সেটা হচ্ছে, ততদিন প্রতিটা ৯ অগস্ট বাংলার বুকে ফিরে আসবে একই প্রশ্ন নিয়ে — অভয়া কি সত্যিই বিচার পেলেন?
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন (পিটিআই, এএনআই, দ্য উইক, দ্য স্টেটসম্যান, আউটলুক ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়াব্লুমস, দ্য প্রিন্ট প্রভৃতি), ২০২৪-২৬।

0 মন্তব্যসমূহ