Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

মহারাষ্ট্রে ওয়েইসি ম্যাজিক: মিম -এর চমকে দেওয়া সেঞ্চুরি, ২৬ এর ভোটে বাংলায় কতটা প্রভাব ফেলতে পারে

মহারাষ্ট্রে ‘মজলিস’-এর জয়জয়কার: বাংলার মসনদে কি ঘনিয়ে আসছে মুসলিম ভোটের মেরুকরণ?

Image- Zee News - India.Com


বিশেষ প্রতিবেদন | মানুষের ভাষা

রাজনীতিতে কোনো কিছুই স্থবির নয়। আর যদি সেই রাজনীতি হয় ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় দেশের, তবে সেখানে সমীকরণের বদল ঘটে দ্রুতলয়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের পুরসভা নির্বাচনের যে ফলাফল সামনে এসেছে, তা কেবল মুম্বই বা মারাঠওয়াড়ার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।1 আসাদউদ্দিন ওয়েইসির দল ‘অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন’ (AIMIM)-এর অভাবনীয় উত্থান এখন জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে, যে পশ্চিমবঙ্গ আগামী কয়েকমাস পরেই বিধানসভা নির্বাচনের রণক্ষেত্রে নামতে চলেছে, সেখানে এই ফলাফল এক নতুন আশঙ্কার মেঘ বা আশার আলো— যা-ই বলা হোক না কেন— তা ঘনীভূত করছে।

মহারাষ্ট্রের ময়দানে ‘ফ্লাইং কালারস’

মহারাষ্ট্রের ২৯টি পুরসভার নির্বাচনে ওয়েইসির দল যা করেছে, তাকে এক কথায় ‘ঐতিহাসিক’ বলা যেতে পারে।2 ২০১৭ সালের নির্বাচনে যেখানে তাদের ঝুলিতে ছিল ৮১টি আসন, এবার তা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫-এ। এই বৃদ্ধির গ্রাফ কেবল সংখ্যার বিচারে নয়, ভৌগোলিক বিস্তৃতির বিচারেও চমকপ্রদ। মারাঠওয়াড়ার প্রথাগত দুর্গ থেকে বেরিয়ে এবার মুম্বই মেট্রোপলিটান রিজিয়ন, বিদর্ভ এবং উত্তর মহারাষ্ট্রেও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে মিম।

Image- The Caravan


সবচেয়ে বড় চমক মুম্বইয়ের বিএমসি (BMC) নির্বাচনে। ভারতের সবচেয়ে ধনী এই পুরসভায় গতবার মিম-এর ছিল মাত্র ২টি আসন। এবার তারা জিতেছে ৮টি আসনে। আরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো গোভান্দি-মানখুর্দের মতো সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সমাজবাদী পার্টির (SP) দুর্গ চুরমার করে দিয়ে ৬টি আসনের সবকটিই দখল করেছে তারা। সমাজবাদী পার্টির নেতা আবু আসিম আজমির দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ওয়েইসির দল প্রমাণ করেছে যে, কেবল পরিচিতি নয়, শিক্ষিত ও স্থানীয় প্রার্থীদের ওপর ভরসা রাখছে নতুন প্রজন্মের মুসলিম ভোটাররা।

ছত্রপতি শম্ভাজিনগরে (প্রাক্তন ঔরঙ্গাবাদ) বিজেপি ৫7টি আসন পেলেও, ৩৩টি আসন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে মিম। কংগ্রেস (১টি), শিবসেনা ইউবিটি (৬টি) কিংবা এনসিপি-র মতো দলগুলো সেখানে কার্যত সাফ হয়ে গিয়েছে। মালেগাঁওয়ে ২০টি আসন এবং নান্দেড়ে ১৪টি আসন জিতে মিম বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা আর কেবল ‘ভোট কাটুয়া’ নয়, বরং সরাসরি নির্ণায়ক শক্তি।

বাংলার প্রেক্ষাপট: ২০২৬-এর পদধ্বনি

মহারাষ্ট্রের এই নির্বাচনী হাওয়া যদি বঙ্গে এসে পৌঁছায়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়া স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক বরাবরই একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। ২০১১ সাল থেকে বামফ্রন্টের হাত থেকে এই বিশাল ভোটব্যাঙ্ক যখন তৃণমূলের দিকে সরতে শুরু করে, তখন থেকেই রাজ্যের ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন মমতা। কিন্তু ২০২৬-এর প্রেক্ষাপট কি আলাদা হতে চলেছে?

গত কয়েক বছরে বাংলায় রাজনৈতিক সমীকরণ বেশ কিছু মোড় নিয়েছে। আরজি কর-কাণ্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ, এবং সর্বশেষ ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের মতো নেতাদের বিদ্রোহী মনোভাব— সব মিলিয়ে তৃণমূলের অন্দরে চোরা স্রোত বইছে। হুমায়ুন কবীর ইতিমধ্যেই নিজেকে ‘বাংলার ওয়েইসি’ বলে দাবি করেছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, তারা অন্তত ১৩৫টি আসনে প্রার্থী দেবেন। হুমায়ুন কবীর এবং পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF) যদি ওয়েইসির মিম-এর সঙ্গে হাত মেলায়, তবে তা তৃণমূলের জন্য ‘মরণঘণ্টা’ হয়ে বাজতে পারে।


Image- The News Mill


মুসলিম ভোটের সংহতি ও তৃণমূলের সংকট

পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ ভোট মুসলিম সম্প্রদায়ের। মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলোতে এই ভোটের হার আরও বেশি। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি-র জয়ের সম্ভাবনা রুখতে এই ভোট প্রায় একতরফাভাবে তৃণমূলের দিকে গিয়েছিল। কিন্তু ২০২৬-এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে দুই কারণে:

১. উন্নয়নের মোহভঙ্গ: মহারাষ্ট্রের গোভান্দিতে যেমন মানুষ সমাজবাদী পার্টির ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে মিম-এর ওপর ভরসা করেছে, বাংলার গ্রামীণ এলাকাতেও কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামোর অভাব নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। শিক্ষিত মুসলিম তরুণরা এখন কেবল ‘বিজেপি জুজু’তে আটকে থাকতে রাজি নয়।

২. বিকল্প নেতৃত্বের খোঁজ: হুমায়ুন কবীর বা আব্বাস সিদ্দিকীর মতো নেতারা যদি তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তবে তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে অন্তত ১০-১৫ শতাংশ ধস নামানো অসম্ভব নয়। মহারাষ্ট্রের ফলাফল বলছে, যদি মুসলিম ভোট সংহত হয়ে (Consolidate) মিম বা সমগোত্রীয় দলের দিকে সরে যায়, তবে শাসক দলের জেতা আসনগুলোতে বিজেপি-র সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

বিজেপি-র কৌশল ও মেরুকরণ

বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বা বিজেপি নেতৃত্ব বরাবরই দাবি করে এসেছেন যে, তৃণমূল কেবল তোষণের রাজনীতি করে। মহারাষ্ট্রের ফলাফলকে উদাহরণ হিসেবে টেনে বিজেপি হয়তো আগামী দিনে বাংলায় এই প্রচার আরও তীব্র করবে যে, মুসলিম ভোটাররা তৃণমূল ছাড়ছেন। এতে যেমন একদিকে মুসলিম ভোটে ভাগ হবে, অন্যদিকে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ (Polarization) আরও সহজ হবে। মহারাষ্ট্রে আবু আসিম আজমি যেমন অভিযোগ করেছেন যে মিম-এর জয় আসলে বিজেপি-র জয়কে প্রশস্ত করছে, বাংলায় তৃণমূল নেতৃত্বও একই অভিযোগ তুলবে। কিন্তু ভোটাররা যদি একবার বিকল্প বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তবে সেই অভিযোগ ধোপে টিকবে না।

মানুষের ভাষা কোন দিকে?

মহারাষ্ট্রের পুরভোটের এই জয় কেবল একটি অঞ্চলের সাফল্য নয়, এটি একটি বার্তা। বার্তাটি হলো— রাজনৈতিক আনুগত্য কোনো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়। যদি তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সংখ্যালঘু জনভিত্তি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় এবং মুসলিম ভোট মিম বা হুমায়ুন কবীরের প্রস্তাবিত জোটের দিকে ঝোঁকে, তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নবান্নের লড়াইয়ে এক বিশাল ওলটপালট দেখা দিতে পারে।

বাংলার মাটিতে আসাদউদ্দিন ওয়েইসি বা হুমায়ুন কবীররা কতটা সফল হবেন, তা নির্ভর করবে তাদের সংগঠন এবং প্রচার কৌশলের ওপর। তবে মহারাষ্ট্রের ঝোড়ো হাওয়া যে বাংলার রাজনীতির অন্দরে নতুন করে ভাবনার ঢেউ তুলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের ভাষা এখন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা সময়ের বিচার্য।

ট্যাগসমূহ (Tags): হুমায়ুন কবীর, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, মিম জয় মহারাষ্ট্র, ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন, তৃণমূল বনাম মিম, মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র পুরসভা নির্বাচন ফলাফল, মুম্বই বিএমসি নির্বাচন, মানুষের ভাষা ব্লগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতি সংবাদ, AIMIM Victory Maharashtra, West Bengal Assembly Election 2026, Humayun Kabir TMC, Muslim Vote Shift Bengal.


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code