ট্রাম্পই এখন ভেনেজুয়েলার ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’! তেলের দখল ও ‘ন্যাশনাল এমারজেন্সি’ ঘোষণা; তোলপাড় বিশ্ব
১২ জানুয়ারি ২০২৬, সোমবার আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসের পাতা এক অভাবনীয় এবং বিস্ফোরক ঘটনার সাক্ষী থাকল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ভেনেজুয়েলার 'ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি' (Acting President of Venezuela) হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক (১২ জানুয়ারি, ২০২৬): নিকোলাস মাদুরোর নাটকীয় পতন এবং তাঁর কারাবরণের পর ভেনেজুয়েলার রাশ এখন সরাসরি হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণে। সোমবার সকালে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর নতুন যে দাপ্তরিক পরিচয় তুলে ধরেছেন, তা আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। ট্রাম্পের প্রোফাইলে এখন জ্বলজ্বল করছে— "Acting President of Venezuela, Incumbent January 2026"।
‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’: মাদুরোর পতন ও বন্দিত্ব
এই ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ জানুয়ারি ২০২৬। মার্কিন বিশেষ বাহিনীর এক অতর্কিত অভিযানে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের সুরক্ষিত বাঙ্কার থেকে নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করা হয়। ‘অপারেশন অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানে ১৫০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছিল। মাদুরোকে বন্দি করে সরাসরি নিউ ইয়র্কে উড়িয়ে আনা হয় এবং নারকো-টেররিজম বা মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগে তাঁকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। বর্তমানে তিনি ব্রুকলিনের একটি কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে বন্দি এবং আগামী ১৭ মার্চ তাঁর মামলার পরবর্তী শুনানি।
তেল সম্পদ ও ট্রাম্পের ‘মাস্টার প্ল্যান’
ভেনেজুয়েলার ওপর এই মার্কিন আধিপত্য স্থাপনের মূল কারণ যে খনিজ তেল, তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কথাতেই স্পষ্ট। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল উচ্চমানের তেল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হস্তান্তর করবে।
তেলের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ: ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, এই তেলের বিক্রয়লব্ধ অর্থ সরাসরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ট্রাম্পের ভাষায়, "এই অর্থ আমি নিজে নিয়ন্ত্রণ করব যাতে ভেনেজুয়েলা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মঙ্গল নিশ্চিত করা যায়।"
বিনিয়োগের হিড়িক: ইতিমধ্যেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে বিশ্বের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোর (যেমন এক্সন মবিল) সিইও-দের সাথে বৈঠক করেছেন।
3 তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলায় কয়েকশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ড্রিলিং শুরু করবে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমবে এবং আমেরিকার জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
জাতীয় জরুরি অবস্থা ও ফান্ডের সুরক্ষা
শুক্রবার রাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশে (Executive Order) স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে মার্কিন ট্রেজারিতে থাকা ভেনেজুয়েলার তেলের রাজস্ব সুরক্ষিত করা হয়েছে।
রাজস্ব সুরক্ষা: এই আদেশের ফলে ভেনেজুয়েলার সার্বভৌম সম্পত্তি কোনো বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় দাবি করতে পারবে না।
শত্রু দমনে অর্থনৈতিক অস্ত্র: হোয়াইট হাউসের দাবি, এই অর্থের নিয়ন্ত্রণ হারানো মানে ইরান এবং হিজবুল্লাহর মতো শত্রু শক্তির হাত শক্ত করা। তেলের রাজস্ব সুরক্ষিত করে আমেরিকা আসলে লাতিন আমেরিকায় মাদক পাচার এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে চাইছে।
ডেলসি রদ্রিগেজ ও ট্রাম্পের ‘ভারপ্রাপ্ত’ ভূমিকা
যদিও গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে সে দেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেত্রী হিসেবে শপথবাক্য পাঠ করানো হয়েছে, তবুও ট্রাম্প নিজেকেই ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে পরিচিত করেছেন। ট্রাম্পের যুক্তি, "ভেনেজুয়েলার স্বার্থ বোঝে না এমন কেউ যাতে ক্ষমতা দখল না করতে পারে, তা নিশ্চিত করতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে শাসনকার্য চালাবে।" সোমবার তিনি এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের জানান, ডেলসি রদ্রিগেজের সাথে তাঁর প্রশাসন খুব ভালোভাবে কাজ করছে এবং শীঘ্রই তাঁদের মধ্যে বৈঠক হবে।
এক নজরে বর্তমান পরিস্থিতির সারসংক্ষেপ (Summary Table)
| বিষয় | বর্তমান আপডেট ও তথ্য |
| ট্রাম্পের নতুন পদ | ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’, ভেনেজুয়েলা (জানুয়ারি ২০২৬ থেকে)। |
| তেল হস্তান্তর | ৩০-৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল সরাসরি আমেরিকায় আসবে। |
| নিরাপত্তা পদক্ষেপ | তেলের রাজস্ব রক্ষায় ‘ন্যাশনাল এমারজেন্সি’ জারি। |
| কূটনৈতিক লক্ষ্য | ইরান-হিজবুল্লাহর প্রভাব কমানো ও মাদক পাচার রোধ। |
| বিনিয়োগ | তেল কোম্পানিগুলোর কয়েকশ বিলিয়ন ডলারের ড্রিলিং চুক্তি। |
আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া: ‘আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ’?
ট্রাম্পের এই স্বঘোষিত পদ এবং ভেনেজুয়েলা শাসনের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে।
রাশিয়া ও চীন: মস্কো এবং বেইজিং এই পদক্ষেপকে ‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’ এবং সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত বলে নিন্দা করেছে। তারা এই বিষয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছে।
ব্রাজিল ও মেক্সিকো: লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও ট্রাম্পের এই আচরণে শঙ্কিত। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা একে ‘বিপজ্জনক নজির’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ইউরোপের অনেক দেশ মাদুরোর পতনে খুশি হলেও, ট্রাম্পের সরাসরি দেশ শাসনের এই ‘কলোনিয়াল’ বা ঔপনিবেশিক মানসিকতাকে ভালো চোখে দেখছে না।
২০২৬-এর নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা?
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ‘ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি’ হওয়ার ঘোষণা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিচিত্র এবং শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপ। তিনি প্রমাণ করে দিলেন যে, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অধীনে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পিছুপা হবেন না। একদিকে যখন মাদুরোর বিচারের প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার তেল ভাণ্ডার এখন সরাসরি ওয়াশিংটনের পকেটে। ট্রাম্পের এই সাহসী না কি হঠকারী সিদ্ধান্ত বিশ্ব রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার।
সারসংক্ষেপ (Summary):
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তেলের রাজস্ব সুরক্ষায় ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ জারি করেছেন। মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো সেখানে কয়েকশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চলেছে এবং ট্রাম্পের দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে ভেনেজুয়েলা এবং আমেরিকা—উভয় দেশই বিপুল লাভবান হবে।
ট্যাগ (Tags):
#TrumpActingPresident #VenezuelaCrisis2026 #OilRevenueControl #DonaldTrump #NationalEmergency #MaduroJustice #USForeignPolicy #DelcyRodriguez #EnergySector #BreakingNewsInternational #SouthAmericaConflict

0 মন্তব্যসমূহ