অন্যায় আছে, অপরাধী আছে - বিচার আর শাস্তি নেই । সমাজ ভেঙে পড়ার দোরগোড়ায়
মানুষের ভাষা : সম্পাদকীয়, প্রবীর রায় চৌধুরী :
অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের চরম পর্যায়? বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সংঘাতের এক অনন্য দলিল
প্রশ্ন হচ্ছে যে, এটাই কি অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের একদম সর্বোচ্চ পর্যায়? আমরা এই জনগণ, ভোট নামক একটি জিনিস দিয়ে কিছু মানুষকে জনতার প্রতিনিধি হিসেবে বিধানসভা ও লোকসভা—এই সমস্ত জায়গাগুলোতে পাঠাই। গণতন্ত্রকে শক্ত-মজবুত করবার জন্যে এবং সংবিধানকে মেনে চলবার শপথ নিয়ে এই সমস্ত জনপ্রতিনিধিরা পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে লোকসভা পর্যন্ত সিংহাসন আলো করে বসে থাকেন। প্রত্যেকে পাঁচটি বছর জনতার সেবা করবার নাম করে শাসনকার্য পরিচালনা করেন; তৎপরবর্তীতে ওই পাঁচ বছর পর আবার একটি ভোট আসে। আর এখন ভোট যেমন আসব-আসব করে।
কী ঘটছে চতুর্দিকে? গতকাল থেকে আজকে এই সন্ধে পর্যন্ত যদি সাধারণ বাঙালি সহ সারা ভারতবাসী চোখ মেলে দেখেন, তাহলে সবাই প্রশ্ন করছে একজন আরেকজনকে—এমনকি নিজেও নিজের কাছে। যেকোনো দলের সমর্থক আপনি হতে পারেন, গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো রাজনৈতিক মতের সমর্থক আপনি বা আমি হতেই পারি, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে গুলিয়ে যাচ্ছে—চোর কে? এ কোনো পাড়ার ছিঁচকে চোর না, এ কোনো ছেলেখেলা, স্কুলের পেন্সিল চুরি বা জ্যামিতি বাক্স চুরির মতো ঘটনাও না।
এখানে দুটি সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক জায়গা সর্বোচ্চ। সেটি কে কে? একজন একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, আর অন্যজন হচ্ছে এই আমাদের মহান ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সর্বোচ্চ তদন্তকারী সংস্থাদের একটি। এখন বিষয় হচ্ছে, এ ওকে বলছে চোর, ও একে বলছে চোর। কী সাংঘাতিক অবস্থা! এইটা কি অন্তত একবার কেউ ভেবে দেখছে—সমাজে এর প্রতি কী বার্তা যাচ্ছে? শিশুদের কাছে বা আগামী প্রজন্মের কাছে এনারা কী শিক্ষা দিচ্ছেন? এনারা কেউ দেশকে শাসন করবার জন্য বা সেবা করবার জন্য নিযুক্ত, আবার তদন্তকারী সংস্থাগুলির দায়িত্ব হলো সত্যকে উদ্ঘাটন করা এবং অপরাধীকে চিহ্নিত করে আদালতের কাছে পেশ করা।
মুখ্যমন্ত্রী একটি রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোট বা মতামতের দ্বারা জয়ী হয়ে সেখানে দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁর প্রধানতম কাজের অংশ হলো সংবিধানে যা আছে সেই অনুযায়ী দেশের ব্যবস্থাটাকে পরিচালনা করা, যাতে জনগণ রাষ্ট্রের কাছ থেকে তাঁদের প্রাপ্য সুফলগুলো ঠিকঠাক পান। সেখানে তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হতেই পারেন, অবশ্যই বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তা সম্ভব। কিন্তু গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত আমরা কী দেখলাম?
কোনো একটি কয়লা কেলেঙ্কারি সংক্রান্ত তদন্তে—যেটি অবশ্যই চার বছর বা আড়াই বছর আগের ঘটনা, যেটিকে বিলম্বিত তদন্ত বলা যেতে পারে—আইপ্যাক নামক একটি সংস্থার অফিসে হানা বা রেইড করা হলো। তৎপরবর্তীতে সেই সংস্থার যিনি কর্ণধার, তাঁর বাড়িতেও রেইড হলো। ইডি সূত্র মতে মোট ১০টি জায়গাতে এই হানা দেওয়া হয়েছিল। এর আগে আমরা দেখেছিলাম শেখ শাহজাহান কাণ্ডে সন্দেশখালীতে ইডি রেইড করেছিল এবং সেখানে তারা বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। সিবিআই বাধার সম্মুখীন হয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সেই তদন্ত কোর্ট পর্যন্ত যায় ও শেখ শাহজাহান অ্যারেস্ট হয়। কিন্তু যারা ওই গাড়ি ভাঙচুর করেছিল, সেই কাণ্ড যারা করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা হয়েছে? জনগণ জানে না; এখনো পর্যন্ত আমরা তা জানি না।
পাশাপাশি গতকালকে যে ঘটনা ঘটল, মুখ্যমন্ত্রী সেই কর্ণধারের বাড়িতে চলে গেলেন—আমরা অবাক হয়ে দেখলাম। ন’মিনিটের মধ্যে কিছু ফাইল ও মোবাইল ফোন নিয়ে তিনি চলে আসলেন এবং সেখানে সাংবাদিকদের সামনে দাঁড়িয়ে বিবৃতি দিলেন। তৎপরবর্তীতে তিনি খোলাখুলি জানালেন যে, এরপর তিনি আরেকটি অফিসে যাচ্ছেন। সেখানে গিয়ে আবার একইরকমভাবে আমরা দেখলাম যে, তাঁর দেহরক্ষী হোক বা পুলিশের কেউ হোক—একজন ব্যক্তি অসংখ্য ফাইল কোলে করে নিয়ে এসে তাঁর গাড়িতে ভরে দিলেন। চার ঘণ্টা মুখ্যমন্ত্রী সেখানে থাকলেন এবং তৎপরবর্তীতে সেখান থেকে তিনি চলে গেলেন। সেই কর্ণধার প্রতীক জৈন সেখানে আসবেন ও তারপর তিনি যাবেন—এটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তিনি আসলেন এবং তারপর তিনি চলে গেলেন। সন্ধ্যা পৌনে সাতটা নাগাদ সিবিআই অফিশিয়াল যারা ছিলেন, তাঁরা আরেকটি গাড়িতে করে চলে গেলেন।
অবাক হয়ে আমরা এটাও দেখলাম, যা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম দেখিয়েছে এবং সমালোচনাও করেছে—ওই সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর যে তৎপরতা সংবাদ মাধ্যমকে আটকানোর জন্য ছিল, সেটি অন্য সময় দেখা গেল না। আবার ভিডিও ক্লিপে দেখা গেছে—চোখের ভুল হতেও পারে আপনারাও কনফার্ম করবেন—কেন্দ্রীয় বাহিনীর একজন অফিশিয়ালের কোলে আরেকজন বসে চলে যাচ্ছেন। এত সুন্দর ইনফ্রাস্ট্রাকচার, এত সুন্দর সিকিউরিটি ব্যবস্থা! এখানে ইডি অফিশিয়ালরা তো বলতেই পারতেন যে, “তদন্ত চলছে, আমি ফাইল দেব না।” আপনি যেই হোন, দেওয়া যাবে না—সেটা কী হলো কেউ জানে না।
মুখ্যমন্ত্রী বাইরে এসে বললেন যে ওটা ওনার একটা পার্টি অফিস; পরবর্তীতে সংশোধিত হয়ে শোনা গেল যে ওটা তাঁর পার্টির দ্বারা নিযুক্ত একটি অথরাইজড সংস্থার অফিস। মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক দল কোনো প্রাইভেট কোম্পানিকে অথরাইজ করে দিয়েছে বলে কি সেখানে তদন্ত করা যাবে না? এ কেমন ধরনের কথাবার্তা? আবার ইডির বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলো যে তারা ইলেকশনের বা রাজনৈতিক দলের তথ্য চুরি করে নিয়েছে। পরবর্তীতে ইডি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাল যে মুখ্যমন্ত্রী তাদের নথি জোরপূর্বক নিয়ে গেছেন।
আইনজ্ঞরা আইনের কথা বলবেন, টিভিতে টকশো বসবে; এক পক্ষ বলবে ওই তোমরা আগে করেছিলে, অন্য পক্ষ বলবে বেশ করেছি। টকশো শেষ হয়ে যাবে কিন্তু কোনো সমাধান বেরোবে না। যিনি প্রশ্ন করবেন, তাঁর প্রশ্নের সরাসরি উত্তর কেউ দেবে না; একটু অসুবিধাজনক মনে হলে সরাসরি উত্তর না দিয়ে ঘুরিয়ে অন্য কথা বলবে। এরা স্কুলের স্টুডেন্ট হলে কত নম্বর পেতেন জানি না—প্রশ্ন একরকম আসলে উত্তর আরেকরকম দিয়ে দেবেন। এই যদি অবস্থা হয়, তবে এটি দেশের কেমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আপনারা ভেবে দেখুন।
আরজি কর তদন্ত, শিক্ষা দুর্নীতি—এই মুহূর্তের যে জেনারেশন, তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া বা ভবিষ্যতের কী অবস্থা? দৈনন্দিন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা অপরাধের মাত্রা—সমস্ত ইস্যুগুলো ধামাচাপা পড়ে গেল। কিছু ইস্যু বেঁচে আছে যেমন হুমায়ুন কবীর কোথায় বাবরি মসজিদ করল তা নিয়ে মাতামাতি, বা কোথায় কোন রাজনৈতিক দল কতটা ধর্মের জিগির তুলতে পারে তা নিয়ে উন্মাদনা। বাকি সব ইস্যু চাপা পড়ে গেছে। এসআইআর-এ দীর্ঘক্ষণ মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, সেই ব্যবস্থাটাকে কীভাবে সুষ্ঠু করা যায় তা নিয়ে কোনো কথা নেই।
আজকের এই সিচুয়েশন একটি সার্বভৌম স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিশ্বের কাছে কী বিজ্ঞাপন দিচ্ছে? একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একটি কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তের মধ্যে ঢুকে গিয়ে ফাইল টেনে নিয়ে চলে আসছেন—এটি দেশের গৌরব কি খুব বাড়াচ্ছে? আবার যদি ধরে নিই যে তদন্তকারী সংস্থা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোপন তথ্য ছিনিয়ে নিচ্ছে, কাউকে না জানিয়ে তদন্ত করছে—সেটিও তো মারাত্মক ব্যাপার। তাহলে সব মিলিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোন রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি? সামনে আর দু-তিন মাস পরে ভোট আছে।
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দাঁড়িয়ে সোচ্চারভাবে বললেন যে, এ ব্যাপারে তাঁকে প্রচুর মানুষ জিজ্ঞাসা করেছেন যে এখানেই কি সব শেষ হয়ে গেল? যেমন অতীতে হতো যে তদন্ত হতো কিন্তু তার কোনো ফলাফল হলো না—এবারও কি তাই হবে? তিনি আজকে সাংবাদিকদের সামনে জানিয়েছেন যে ইডি এই ধরনের অভিযোগ আদালতে জমা দিয়েছে। কিন্তু এতগুলো তদন্ত যে পড়ে রয়েছে, সেগুলোর কী হলো? প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে আদালতের কি কোনো ভূমিকা নেই? হাত জোড় করে মানুষকে কি আদালতের সামনে দাঁড়াতে হবে না সঠিক বিচারের জন্য?
সূত্রের খবর, আদালতে আজকে মামলাটি হৈ-হট্টগোলের কারণে স্থগিত বা মুলতুবি হয়ে গেছে। তাহলে সবশেষে কী দাঁড়ালো? একটি তদন্ত বাঞ্চাল হয়ে গেল। তদন্তকারী সংস্থা বলছে তথ্যপ্রমাণ সব লোপাট হয়ে গেছে এবং তারা মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে তা ফেরত চাইছেন। আবার মুখ্যমন্ত্রী তদন্তকারী সংস্থাকে বলছেন তাঁর ভোটের তথ্যপ্রমাণ লোপাট করা হয়েছে এবং তিনি সেগুলো ফেরত চাইছেন। এই জটের শেষ কোথায়? সাধারণ মানুষ কি এটি খুব ভালো চোখে দেখছেন? এতে বিরোধী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির অস্বস্তি কতটা বাড়ছে তারা কি বুঝছেন? আপনারা কি বাংলার মানুষের জ্বালা-যন্ত্রণাগুলোকে ঠিকমতো এড্রেস করছেন?
সত্যি বলতে, একটু মানুষ হিসেবে ভাবুন। কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থক বা কর্মী হলে সমালোচনা শুনলে মনে মনে প্রচণ্ড রাগ হয় আপনাদের। কিন্তু মশাই আপনারা ভাবুন, এতে জনমানসে আপনাদের প্রতি ধারণা কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। হতে পারে ইডি আরও সক্রিয় হলো বা অন্যান্য তদন্তগুলো গতি পেল—তবে তো মানুষ বুঝবে। যেখানে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং এই কাণ্ড করছেন, সেখানে সাধারণ মানুষের কার ঘাড়ের ওপর ক’টা মাথা আছে যে সাহস করে আপনাদের বিরোধী কথাবার্তা বলবে বা সাহস করে ভোট প্রদান করতে পারবে?
অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের এটাই কি চরম অবস্থা? এই প্রশ্ন দিয়েই এপিসোডটা শুরু করেছিলাম। যদি সেটাই সর্বোচ্চ অবস্থা হয়ে থাকে যেখানে মানুষ বিচার পর্যন্ত চাইতে পারছে না, তাহলে এইটুকু আশা রেখে শেষ করতে হবে যে—অন্ধকার যখন চরম হয় তখনই আলো আসে। আসার খবর এই যে সূর্যোদয় আপনা থেকেই ঘটে, কাউকে ঘটাতে হয় না।
আপনাদের মতামত, পক্ষে বা বিপক্ষে যা-ই হোক, কমেন্টে জানাবেন। আপনারা নজর রাখুন ‘মানুষের ভাষা’-য়।

0 মন্তব্যসমূহ