আগুনের লেলিহান শিখায় তপ্ত মহানগর: লেক থানা থেকে আনন্দপুর, ভস্মীভূত একের পর এক দোকান-বাজার; নিখোঁজ ৬ শ্রমিকের পরিবারে হাহাকার
নিজস্ব প্রতিবেদন, কলকাতা: প্রজাতন্ত্র দিবসের সকালে যখন তিলোত্তমা উৎসবের মেজাজে, তখন অন্য এক ভয়াল রূপ দেখল শহরবাসী। আনন্দপুর সংলগ্ন নাজিরাবাদ এলাকায় পরপর দু’টি গুদামে বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে ভস্মীভূত হয়ে গেল কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। কিন্তু কেবল সম্পত্তি নয়, এই আগুনের গ্রাসে হারিয়ে গিয়েছেন ৬ জন সাধারণ শ্রমিক। ঘটনার ১০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনও ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে এলাকা থেকে। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ আর প্রশাসনের তৎপরতার মাঝে আবারও শহর কলকাতার অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া হলো।
ভয়াবহ সেই রাত: যখন লেলিহান শিখা গ্রাস করল গুদাম
শনিবার রাত ৩টে নাগাদ যখন শহর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখনই নাজিরাবাদের ওই নরম পানীয় এবং খাদ্যসামগ্রীর গুদামে আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দাহ্য বস্তু মজুত থাকায় নিমেষের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পাশাপাশি দুটি বিশাল গুদামে। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের শিখা এতটাই উঁচুতে উঠেছিল যে দূর থেকেও তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় দমকলের ১২টি ইঞ্জিন। পরে আগুনের তীব্রতা দেখে ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ করা হয়। দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন লড়াইয়ের পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধোঁয়ার দাপটে ভেতরে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে দমকলকর্মীদের কাছে।
“বাঁচাও, না হলে আজই শেষ”: নিখোঁজ পঙ্কজের শেষ ফোন
এই অগ্নিকাণ্ডের সবথেকে মর্মান্তিক দিক হলো ৬ জন কর্মীর নিখোঁজ হওয়া। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন পঙ্কজ হালদার নামে এক যুবক। পঙ্কজের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রাত ৩টে নাগাদ পঙ্কজ বাড়িতে ফোন করে চিৎকার করে বলেছিলেন, “আমাদের বাঁচাও! আমরা ভেতরে আটকে পড়েছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যে উদ্ধার না করলে আজই আমাদের শেষ রাত।” এই ফোন পাওয়ার পর পঙ্কজের আত্মীয়রা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন দেখেন কারখানার মূল গেটে তালা লাগানো। অভিযোগ উঠছে, ভেতরে শ্রমিকরা থাকা সত্ত্বেও কেন গেট তালাবন্ধ ছিল? পঙ্কজের বাইকটি গেটের সামনে রাখা থাকলেও তাঁর কোনও হদিস মিলছে না। পঙ্কজের পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের একটি পরিবারের ১৩ জন সদস্য এখানে কাজ করতে এসেছিলেন, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের খোঁজ এখনও নেই। এক অসহায় বাবা তাঁর ছেলে এবং ভাইয়ের জন্য হাহাকার করছেন।
ঘটনাস্থলে অরূপ বিশ্বাস: নিখোঁজদের তালিকা তৈরি
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সকালেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় বিধায়িকা ফেরদৌসী বেগম এবং সিআইসি নজরুল আলী মন্ডল। মন্ত্রী স্বজনহারা পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং একটি কাগজে নিখোঁজদের নাম নথিবদ্ধ করতে দেখা যায় তাঁকে। অরূপ বিশ্বাস জানান, “দমকল এবং পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে কাজ করছে। এখন প্রধান লক্ষ্য হলো ধোঁয়া বের করা। কেএমসি-র ডেমোলিশিং স্কোয়াড এসেছে দেওয়াল ভাঙার জন্য। ধোঁয়া না কমলে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছে না।” ফরেনসিক দলও ঘটনাস্থলে পৌঁছাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে গুদামে অগ্নি-নির্বাপণ ব্যবস্থা সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে চাননি মন্ত্রী।
সরকার ছুটি কাটাচ্ছে: শুভেন্দুর তীক্ষ্ণ আক্রমণ
মহানগরের এই একের পর এক অগ্নিকাণ্ড নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “সরকার থাকলে তো আগুন নেভাতে আসত! সরকার নেই, সবাই প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটি কাটাচ্ছে। রাজ্যে প্রশাসন বলে কিছু নেই।” শুভেন্দু আরও অভিযোগ করেন যে, ময়নার এক ছেলেও এই ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছে। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, “সরকার না থাকলে যা হয় তাই হচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে খুব শীঘ্রই এই সরকারের পতন ঘটবে।” শুভেন্দুর এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হলেও, সাধারণ মানুষের অভিযোগের আঙুল কিন্তু প্রশাসনের দিকেই।
বিপর্যস্ত কলকাতা: একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের মিছিল
উল্লেখ্য, গত কয়েক সপ্তাহে কলকাতার বিভিন্ন বাজারে এবং গুদামে আগুনের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। বড়বাজারের কেমিক্যাল গুদাম থেকে শুরু করে এজরা স্ট্রিটের ইলেকট্রনিক্স মার্কেট— সর্বত্রই যেন আগুনের লেলিহান শিখা ওত পেতে রয়েছে। বিশেষ করে বড়বাজারের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় দাহ্য পদার্থ মজুত রাখা এবং অগ্নি-নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন করাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ বাড়ছে। নাজিরাবাদের এই ঘটনায় আইপ্যাক (I-PAC)-এর ‘নীল নকশা’ এবং পুলিশের গাফিলতির অভিযোগও তুলেছেন অনেকে। কেন ঘিঞ্জি বসত এলাকার মাঝে এই ধরণের বিপজ্জনক গুদাম তৈরির অনুমতি দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অনিশ্চয়তায় শ্রমিক পরিবার: প্রশ্ন যখন সুরক্ষার
আনন্দপুরের এই গোডাউন সংলগ্ন এলাকায় ফরেনসিক দল পৌঁছলে আগুনের প্রকৃত উৎস জানা যাবে। কিন্তু যে ৬ জন শ্রমিক এখনও নিখোঁজ, তাঁদের প্রাণ রক্ষাই এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। দমকল আধিকারিকদের মতে, গুদামের ভেতরে পকেট ফায়ারের সম্ভাবনা এখনও রয়েছে। ধোঁয়া না কমলে তল্লাশি অভিযান শুরু করা যাচ্ছে না। পঙ্কজ হালদারের মতো যারা শেষ মুহূর্তে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন, তাঁদের শেষ পরিণতি কী হলো— তা জানতেই এখন প্রহর গুনছে পরিবারগুলো।
মহানগরীর একের পর এক বাজারে এই অগ্নিকাণ্ড কি স্রেফ দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড় কোনও প্রশাসনিক ব্যর্থতা? সুজিত বসু থেকে অরূপ বিশ্বাস— মন্ত্রীদের আশ্বাসে কি আর চিঁড়ে ভিজবে? বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর তোপ এবং স্বজনহারাদের চোখের জল কি নবান্নের ঘুম ভাঙাতে পারবে? উত্তর মিলবে সময়ের সাথে, কিন্তু আজকের এই লেলিহান শিখা আরও একবার প্রমাণ করে দিল— তিলোত্তমার বুকেই প্রতিটি মোড়ে ওত পেতে রয়েছে এক একটি আগ্নেয়গিরি।
Tags:
#KolkataFireReport, #AnandapurFire, #NazirabadGodown, #SuvenduAdhikari, #AroopBiswas, #MissingWorkers, #FireSafetyKolkata, #BengalPolitics2026, #BreakingNewsKolkata, #ManusherBhashaReport, #AnandabazarStyleNews, #FireAccidentBengal


0 মন্তব্যসমূহ