চন্দ্রকোনায় শুভেন্দুর কনভয়ে ‘তৃণমূলি হামলা’, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে রাতভর ফাঁড়িতেই ধর্নায় বিরোধী দলনেতা
শনিবার ১০ জানুয়ারি ২০২৬, রাতের অন্ধকারে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা। পুরুলিয়া থেকে সভা সেরে মেদিনীপুর ফেরার পথে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে নজিরবিহীন হামলার অভিযোগ উঠল শাসকদল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। পুলিশের চোখের সামনেই বিরোধী দলনেতার সুরক্ষা বলয় ভেঙে হামলা চললেও পুলিশ ছিল ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে চন্দ্রকোনা রোড পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরেই মেঝের ওপর বাবু হয়ে বসে রাতভর ধর্না দিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
মানুষের ভাষা, মেদিনীপুর (১১ জানুয়ারি, ২০২৬): ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার রাজপথ এখন রণক্ষেত্র। শনিবার রাতে পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনা রোডে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কনভয় ঘিরে যা ঘটল, তা কেবল এক নেতার ওপর হামলা নয়, বরং রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার কঙ্কালসার চেহারাটা আবারও বেআব্রু করে দিল। অভিযোগ, পুরুলিয়া থেকে ফেরার পথে তৃণমূল আশ্রিত প্রায় ২০-৩০ জন দুষ্কৃতী লাঠি, বাঁশ এবং রড নিয়ে শুভেন্দুর গাড়ির ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালায়। পুলিশের নিস্পৃহতার প্রতিবাদে চন্দ্রকোনা রোড পুলিশ ফাঁড়ির মেঝেতে বসে নজিরবিহীন লড়াই শুরু করেছেন শুভেন্দু।
হামলার সেই মুহূর্ত: নেপথ্যে কারা?
শনিবার রাতে পুরুলিয়ার পারায় বিশাল জনসভা শেষ করে মেদিনীপুরের দিকে ফিরছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। রাত ঠিক সাড়ে ৮টা নাগাদ তাঁর কনভয় যখন চন্দ্রকোনা রোড বাজারের চৌরাস্তা সংলগ্ন তৃণমূলের অঞ্চল অফিসের সামনে পৌঁছায়, তখনই পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানো হয়। শুভেন্দুর দাবি, জনা কুড়ি দুষ্কৃতী বাঁশ ও লাঠি নিয়ে স্লোগান দিতে দিতে তাঁর গাড়ির ওপর চড়াও হয়। গাড়ির কাঁচে সজোরে আঘাত করা হয় এবং কনভয়ে থাকা অন্য একটি সুরক্ষা গাড়ির কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
শুভেন্দুর অফিস থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আইনের রক্ষকরাই যখন নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন বুঝতে হবে এই রাজ্যে কোনো গণতন্ত্র অবশিষ্ট নেই। এটি কেবল আমার ওপর হামলা নয়, বাংলার প্রতিটি বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা"।
থানায় শুভেন্দুর ‘বজ্রকঠিন’ অবস্থান: পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার জবাব
হামলার পর পুলিশকে অভিযোগ জানানো হলেও কোনো তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ না নেওয়ায় রণংদেহী মেজাজে ধরা দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সটান গাড়ি ঘুরিয়ে ঢুকে পড়েন চন্দ্রকোনা রোড পুলিশ ফাঁড়িতে। ফাঁড়ি ইনচার্জ তাঁকে চেয়ারে বসার অনুরোধ করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি চটচটে মেঝের ওপর বসে পড়েন।
শুভেন্দুর স্পষ্ট ঘোষণা— "যতক্ষণ না চিহ্নিত দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে, ততক্ষণ আমি এখান থেকে এক ইঞ্চিও নড়ব না"। রাতভর ফাঁড়িতে বসেই তিনি তাঁর আইনজীবীদের ডেকে অভিযোগপত্র লেখান এবং পুলিশের ওপর চাপ বজায় রাখেন। শুভেন্দুর এই ‘গ্রাউন্ড জিরো’ ফাইট বিজেপির নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা তৈরি করেছে।
তৃণমূলের ‘জনরোষ’ তত্ত্ব ও শুভেন্দুর পাল্টা
তৃণমূল নেতৃত্ব এই হামলাকে ‘জনরোষ’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। জেলা তৃণমূল সভাপতি সুজয় হাজরার দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন (SIR) নিয়ে বিজেপি গ্রামগঞ্জের মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ছে। তবে শুভেন্দু পাল্টা যুক্তি দিয়ে জানিয়েছেন, যদি এটা সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ হতো তবে তাঁরা লাঠি-বাঁশ নিয়ে পুলিশের সামনে দাদাগিরি করত না। আসলে আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে ইডির হানা এবং দুর্নীতির ফাইল উদ্ধার হয়ে যাওয়ার ভয়ে তৃণমূল এখন মরিয়া হয়ে ‘গুন্ডামি’র আশ্রয় নিচ্ছে।
কেন শুভেন্দুর এই লড়াই ২০২৬-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
শুভেন্দু অধিকারী বারবার প্রমাণ করছেন যে তিনি এসি ঘরে বসে রাজনীতি করায় বিশ্বাসী নন। এর আগে কোচবিহারেও তাঁর কনভয়ে হামলা হয়েছিল এবং সেখানেও তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন কীভাবে পুলিশ দলদাসের ভূমিকা পালন করছে। গত বৃহস্পতিবার আইপ্যাক দপ্তরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপের পর শুভেন্দুর এই সরব হওয়া এবং থানার মেঝেতে বসে ধর্না দেওয়া—তৃণমূলের বিরুদ্ধে এক বড়সড় ‘ইমেজ ক্রাইসিস’ তৈরি করছে। শুভেন্দুর দাবি, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাতে গেলে মানুষের সাথে মানুষের মতো করে মিশে লড়াই করতে হবে, আর আমি সেই লড়াইয়ের সৈনিক।"
শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে হামলার তালিকা (২০২০ - ২০২৬)
| তারিখ | স্থান | হামলার ধরণ ও পরিস্থিতি |
| ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | চন্দ্রকোনা রোড, পশ্চিম মেদিনীপুর | পুরুলিয়া থেকে ফেরার পথে লাঠি, বাঁশ নিয়ে গাড়ির ওপর হামলা। প্রতিবাদে তিনি ফাঁড়িতে অবস্থানে বসেন। |
| ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | দক্ষিণ ২৪ পরগনা (রায়দিঘী, কুলতলি) | কালীপূজার অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে একাধিক স্থানে ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ দ্বারা হামলার অভিযোগ। |
| ৫ অগাস্ট ২০২৫ | খাগড়াবাড়ি, কোচবিহার | এসপি অফিসের ডেপুটেশনে যাওয়ার পথে পাথর বৃষ্টি ও কালো পতাকা প্রদর্শন। বুলেটপ্রুফ কাঁচ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। |
| ২০ ডিসেম্বর ২০২২ | কাঁথি, পূর্ব মেদিনীপুর | জনসভা সেরে ফেরার পথে কনভয় লক্ষ্য করে ইঁট বৃষ্টির অভিযোগ। |
| ২২ অগাস্ট ২০২১ | চাঁপাডালি, পাঁশকুড়া | শুভেন্দুর কনভয় চলে যাওয়ার পর তাঁর অনুগামীদের ওপর হামলার অভিযোগ এবং গাড়ি ভাঙচুর। |
| ১০ জুলাই ২০২১ | নন্দীগ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর | ভোট পরবর্তী হিংসার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে যাওয়ার পথে কালো পতাকা ও বিক্ষোভের মুখে পড়েন। |
চন্দ্রকোনা রোডের পুলিশ ফাঁড়িতে শুভেন্দু অধিকারীর এই অবস্থান বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাইলফলক। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও এক নেতা যেভাবে পুলিশের ‘অস্বস্তি’ বাড়িয়ে থানার মেঝেতে বসে রাত কাটালেন, তা ২০২৬-এর আগে বিরোধীদের অক্সিজেন দিচ্ছে। শুভেন্দুর এই লড়াই কেবল একটি হামলার প্রতিবাদ নয়, বরং তা বাংলার বুকে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার এক দীর্ঘ যুদ্ধের অংশ।
সারসংক্ষেপ (Summary):
শনিবার রাতে চন্দ্রকোনা রোডে শুভেন্দু অধিকারীর কনভয়ে তৃণমূলি হামলার প্রতিবাদে রাতভর পুলিশ ফাঁড়ির মেঝেতে বসে ধর্না দিলেন বিরোধী দলনেতা। শুভেন্দুর দাবি, পুলিশি মদতেই এই হামলা চালানো হয়েছে এবং দুষ্কৃতীদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত তিনি লড়াই চালিয়ে যাবেন। এই ঘটনা ২০২৬-এর ভোটের আগে বাংলার রাজনৈতিক উত্তাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল।
ট্যাগ (Tags):
#SuvenduAdhikari #ConvoyAttack #ChandrakonaDharna #WestBengalPolitics #JusticeForOpposition #LawOrderBreakdown #BJPvsTMC #MidnaporeTension #BengalElection2026 #StruggleForDemocracy

0 মন্তব্যসমূহ