নওশাদের ‘দেখা নেই’, ফুরফুরায় রেগে আগুন হুমায়ুন; ১০ ফেব্রুয়ারি বাবরি মসজিদ ও ১ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডের হুঙ্কার
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার রাজনীতিতে এখন এক নজিরবিহীন ‘তৃতীয় শক্তি’র মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। একদিকে যেমন ইডি-সিবিআইয়ের তদন্তে শাসকদল ব্যতিব্যস্ত, ঠিক তখনই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের রাশ হাতে নিতে আসরে নেমেছেন ভরতপুরের বিধায়ক তথা জনতা উন্নয়ন পার্টির (JUP) প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর। শুক্রবার ফুরফুরা শরিফে তাঁর সফর এবং ভাঙড়ের আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে দেখা না হওয়া—রাজ্য রাজনীতিতে এক নয়া নাটকের জন্ম দিয়েছে।
মানুষের ভাষা, কলকাতা: ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখটি যেমন কলকাতার আইপ্যাক দপ্তরে ইডির অভিযানের জন্য মনে রাখা হবে, তেমনই ৯ জানুয়ারি ফুরফুরা শরিফের মাটি থেকে ওঠা হুমায়ুন কবীরের হুঙ্কারও ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর নিজের নতুন দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (JUP) নিয়ে এখন সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের ‘কিং মেকার’ হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন হুমায়ুন কবীর। তবে শুক্রবার ফুরফুরা শরিফে গিয়ে নওশাদ সিদ্দিকীর দেখা না পেয়ে তিনি যেভাবে মেজাজ হারালেন, তাতে ২০২৬-এর আগে ‘সংখ্যালঘু মহাজোট’ হবে কি না, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রইল।
ফুরফুরার সফর ও নওশাদের ‘অনুপস্থিতি’
শুক্রবার সকালে ফুরফুরা শরিফে পীরজাদা সাহেরি সিদ্দিকি ও ইব্রাহিম সিদ্দিকির সঙ্গে বৈঠক করতে যান হুমায়ুন কবীর। তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল নওশাদ সিদ্দিকীর ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর সঙ্গে একটি নির্বাচনি জোটের ভিত তৈরি করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করার পরও নওশাদের দেখা পাননি তিনি। নওশাদ সেই সময় কলকাতায় অন্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত ছিলেন বলে খবর। নওশাদের এই ‘অনুপস্থিতি’কে স্রেফ কাকতালীয় বলতে নারাজ হুমায়ুন ভক্তরা। নওশাদ অবশ্য পরে জানিয়েছেন, হুমায়ুন কবীর তাঁর বাড়ির অতিথি, কিন্তু জোটের বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো অফিশিয়াল আলোচনা হয়নি এবং হুমায়ুনের ‘উদ্দেশ্য’ পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা এগোবেন না।
রেগে আগুন হুমায়ুন: ‘জোট না হলে না হবে’
নওশাদের দেখা না পেয়ে ফুরফুরা থেকে বেরোনোর সময় ক্ষোভে ফেটে পড়েন হুমায়ুন কবীর। সাংবাদিকদের সামনে তিনি সোজাসুজি জানিয়ে দেন, “বিজেপিকে হারাতে আর তৃণমূলকে তাড়াতে এক হয়ে লড়ার ডাক দিচ্ছি। আমি ভনিতা করি না। যদি ওনার (নওশাদ) মনে হয় উনি একা লড়ে পারবেন, তবে একাই লড়ুন। এ বিষয়ে আমি আর কোনো চিঠি দেব না। তাতে জোট না হলে না হবে”। এই মন্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, হুমায়ুন নওশাদের এই দূরত্ব বজায় রাখাটাকে সহজভাবে নেননি। রাজনৈতিক মহলের মতে, মুর্শিদাবাদ ও মালদার সংখ্যালঘু ভোটে হুমায়ুন এবং নওশাদ একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ালে লাভ হবে তৃণমূলের।
১ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেড ও ১০ লক্ষ মানুষের টার্গেট
নওশাদকে ছাড়াই নিজের শক্তির প্রমাণ দিতে মরিয়া হুমায়ুন কবীর বড় ঘোষণা করেছেন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তিনি তাঁর জনতা উন্নয়ন পার্টির পক্ষ থেকে বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। তাঁর দাবি, সেই দিন অন্তত ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েত হবে ব্রিগেডে। ইতিমধ্যেই ব্রিগেডের মাঠ পরিদর্শন করেছেন তিনি এবং ডিফেন্স অফিসারদের সঙ্গে কথা বলে সভার অনুমতির প্রক্রিয়াও এগিয়ে রেখেছেন। হুমায়ুন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, ব্রিগেডের এই সভা রাজ্য রাজনীতিতে এক বড় ‘চমক’ হতে চলেছে।
১০ ফেব্রুয়ারি: বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের ঘোষণা
হুমায়ুন কবীরের সবথেকে বড় আইনি ও ধর্মীয় বাজি হলো মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের আদলে মসজিদ নির্মাণ। শুক্রবার ফুরফুরা শরিফ থেকে তিনি ঘোষণা করেন যে, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এই মসজিদ নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে। বেঙ্গালুরুর একটি বেসরকারি নির্মাণ সংস্থাকে এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং মাটির পরীক্ষা (Soil Testing)-ও শেষ হয়ে গিয়েছে। হুমায়ুনের দাবি, সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় মন্দির গড়ার অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু সংবিধান তাঁকে মুর্শিদাবাদে নিজের পছন্দমতো মসজিদ গড়ার অধিকার দিয়েছে। শাসকদল তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রিয়াঙ্কা অধিকারী এই প্রকল্পের সমালোচনা করে বলেছেন, “ভোটের আগে বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই হুমায়ুন এসব করছেন”।
সংখ্যালঘু রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে হুমায়ুন কবীরের এই সক্রিয়তা মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরাতে পারে। হুমায়ুন কবীর ইতিমধ্যেই বালিগঞ্জ, বৈষ্ণবনগর এবং খড়গপুর গ্রামীণের মতো ১০টি আসনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য হলো তৃণমূলের থেকে সংখ্যালঘু ভোটারদের সরিয়ে নেওয়া, যা আদতে বিজেপির সুবিধা করে দেবে বলে বিরোধীদের দাবি। নওশাদ সিদ্দিকী যেখানে বামেদের সঙ্গে জোটে আগ্রহী, সেখানে হুমায়ুন চাইছেন নিজেকে ‘স্বতন্ত্র শক্তি’ হিসেবে জাহির করতে।
এক নজরে হুমায়ুন কবীরের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডার (Summary Table)
| তারিখ | বিশেষ কর্মসূচি / ঘটনা | রাজনৈতিক গুরুত্ব |
| ৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ফুরফুরা সফর ও নওশাদের সঙ্গে সংঘাত। | জোট নিয়ে জট এবং আইএসএফ-এর দূরত্ব। |
| ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | আইপ্যাক দপ্তরে ইডি হানা নিয়ে মন্তব্য। | তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হওয়া। |
| ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ব্রিগেডে জনসভা (১০ লক্ষ জমায়েতের ডাক)। | নতুন দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র শক্তির পরীক্ষা। |
| ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | বাবরি মসজিদ নির্মাণের সূচনা। | সংখ্যালঘু আবেগ ব্যবহার করে ভোটব্যাঙ্ক সংহত করা। |
| মার্চ/এপ্রিল ২০২৬ | পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। | তৃণমূলের বিকল্প হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা। |
হুমায়ুন কি ২০২৬-এর ‘গেম চেঞ্জার’?
হুমায়ুন কবীর একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক খেলোয়াড়। কংগ্রেস, তৃণমূল এবং বিজেপি—তিনটি দলেই তিনি ছিলেন। এখন নিজের দল গড়ে তিনি যে তাস খেলেছেন, তা যেমন বিপজ্জনক তেমনই আকর্ষণীয়। নওশাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে জোটের জট যদি না কাটে, তবে সংখ্যালঘু ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আইপ্যাক দপ্তরে ইডির হানা নিয়ে হুমায়ুন যেমন সরব হয়েছেন, তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের অবসান চেয়েছেন তিনি। এখন দেখার, ১ ফেব্রুয়ারির ব্রিগেডে তিনি সত্যিই ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েত করতে পারেন কি না এবং ১০ ফেব্রুয়ারির মসজিদ নির্মাণ বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বনাম রাজনীতির লড়াইয়ে কোন দিকে মোড় নেয়।
সারসংক্ষেপ (Summary):
ফুরফুরা শরিফে নওশাদ সিদ্দিকীর সঙ্গে দেখা না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হুমায়ুন কবীর জোট নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ব্রিগেডে ১০ লক্ষ মানুষের জমায়েত এবং ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে বাবরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন এই বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক নিয়ে নজিরবিহীন ডামাডোল শুরু হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে।
ট্যাগ (Tags):
#HumayunKabir #ISF #NaushadSiddiqui #FurfuraSharif #JanataUnnayanParty #BabriMasjidBengal #BrigadeRally #WestBengalElection2026 #MinorityPolitics #BreakingNewsBengal

0 মন্তব্যসমূহ