বিরোধী দল বিজেপি একটা মিছিলও করতে পারলো না !! কি বার্তা দিচ্ছেন জনগণকে ?
সম্পাদকীয় প্রতিবেদন , প্রবীর রায় চৌধুরী :
একটার পর একটা কেলেঙ্কারী| হাইকোর্ট, লোয়ার কোর্টের পরে হাইকোর্ট, হাইকোর্টে সিঙ্গেল বেঞ্চের পরে ডিভিশন বেঞ্চ, ডিভিশন বেঞ্চের পরে সুপ্রিম কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে আবার ডিভিশন বেঞ্চ ইত্যাদি হওয়ার পর প্রত্যেকটি কেলেঙ্কারিতে—সেটা আর্থিক হোক বা ক্রিমিনাল অফেন্স—হাইকোর্ট অথবা সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সিবিআই অথবা ইডির তদন্ত চলছে| তদন্তের পরে বেশ কিছু চমকদার বড় বড় মাথাদের অ্যারেস্ট দেখা যাচ্ছে এবং সেই গ্রেপ্তারের পরেও আবার তদন্ত চলছে| কিন্তু সবশেষে সেই তদন্ত আর শেষ হয় না|
কোনো কোনো হাইকোর্টের বিচারপতি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলছেন যে, অন্ধকার সুরঙ্গের শেষে আলো দেখতে পাচ্ছেন না| কোনো বিচারপতি আবার বলছেন, চাল আর কাঁকর আলাদা করতে পারছেন না| শেষ পর্যন্ত দেখা গেল একের পর এক সেই তদন্তগুলো পড়ে থাকলো| বিচারপতিরা উষ্মা প্রকাশ করে বলছেন যে কোনো একটি দোকানে অপরাধ হলে তার কর্মচারীর বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে, গ্রেপ্তারি হচ্ছে, কিন্তু দোকানের মালিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই| দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চলা বা উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ পেশ না করবার অজুহাতে একের পর এক জামিন হচ্ছে|
এই দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রথমে মানুষের মনে মনে, তারপর ভুরু কুঁচকে, তারপর ফিসফিসানি এবং সবশেষে ট্রেনে-বাসে, চায়ের দোকানে বা বাজারে সেই কথাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে| সব শেষে আক্ষেপ, হতাশা আর ক্ষোভগুলো আর ঢাকা না থেকে ছিটকে বেরিয়ে পড়লো রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপির খোদ পার্টি অফিসের ভেতরে এবং অমিত শাহের সামনে| শব্দটার নাম ‘সেটিং’| আমরা স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের নাগরিক হিসেবে কখনও বিশ্বাস করতে চাই না যে, কোনো একটি অপরাধের তদন্তে কাউকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকার অপর একটি সরকারের সাথে বা বিচার ব্যবস্থার কোনো অংশের সাথে এই ধরনের সেটিং করতে পারে| সাধারণ মানুষ ধৈর্যের চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছে গিয়েও এটা বিশ্বাস করতে চাইছে না, কারণ যদি মানুষ এটা বিশ্বাস করতে শুরু করে তাহলে সমাজ বলে আর কিচ্ছু থাকবে না| সব শেষ হয়ে যাবে| মানুষ অপরাধ করবে কিন্তু অভিযোগ জানানোর জায়গা থাকবে না|
উদাহরণ হিসেবে একটি কাল্পনিক ঘটনার কথা ভাবুন| ধরা যাক আপনার বাড়ির পাশের কেউ এসে আপনার ওপর কোনো অত্যাচার করেছে| সমাজে ব্যবস্থা আছে যে আপনি থানায় অভিযোগ জানাবেন এবং সেই অভিযোগ আদালত পর্যন্ত গড়াবে| কিন্তু এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে মানুষ অভিযোগ জানাতেই ভয় পেয়ে যাচ্ছে| অভিযোগ জানানোর আগে সে বাড়িতে বসে আলোচনা করছে| বাড়ির চারজন লোকের মধ্যে একজন অভিযোগ জানাতে চাইলে বাকি তিনজন বলছে, “বোকামি করিস না, ও কোথাও না কোথাও থানায় সেটিং করে ফেলেছে, ওর প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে যোগাযোগ আছে|” এই অবস্থার পরেও যদি কেউ অভিযোগ করতে যায়, দেখা যাচ্ছে থানা সেই অভিযোগই নিচ্ছে না| আমি বিশ্বাস করি সমস্ত পুলিশ খারাপ হয়ে যায়নি, তাদের ওপরও প্রচুর চাপ থাকে| তাদের মধ্যে থেকেও অনেকে পরামর্শ দেন যে, “দেখো বাবু, এইসব অভিযোগ করে তোমার কিছু হবে না, তুমি শান্তভাবে বাড়ি যাও|” তারা যে সবসময় অসৎ উদ্দেশ্যে বলছেন তা নয়, কারণ তারা জানেন এই লোকটার পরিণতি কী হবে|
এরপরও যদি কোনো আইনজীবীর সাহায্য নিয়ে কেসটি আদালত পর্যন্ত যায়, মানুষ ভাবছে লোয়ার কোর্টে কিছু হবে না| এই ভাবমূর্তি কি আদালতের পক্ষে খুব ভালো হচ্ছে? লোয়ার কোর্ট থেকে তাকে আবেদন করতে হবে হাইকোর্টে, হাইকোর্ট থেকে ডিভিশন বেঞ্চ বা সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার ক্ষমতা ক’টা গরিব মানুষের আছে? সব শেষে সেই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটি যখন নিজের পরিবার বা শুভানুধ্যায়ীদের মাঝে এসে বসেন, সবাই বলে, “কিরে দেখলি? তোকে বারণ করেছিলাম না? এই কারণে তোর কাজ গেল, ব্যবসা গেল, সমাজে তোকে যেকোনো মুহূর্তে বিপক্ষের লোকজন মেরে ফেলতে পারে| যারা অপরাধ করেছে তাদের অনেক দলবল আছে, তারা তোকে যা খুশি তাই করে দিতে পারে| তোর সংসারটার কী হবে?” এই সিচুয়েশনটা কি কোনো সমাজের পক্ষে ভালো?
এই সিস্টেমটার সামগ্রিক বদল দরকার| আজ যদি এই সেটিং তত্ত্ব সত্যিতে পরিণত হয় তবে সমাজটা কত ভয়ঙ্কর হয়ে যেতে পারে ভাবুন| সেই সেটিং তত্ত্বের আওয়াজ যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে রাজ্য বিজেপির দপ্তরে উঠে এল, তখন অবস্থাটা অস্বস্তিকর হয়েছিল| রাজ্য বিজেপির অসংখ্য সমর্থকদেরও সমাজে মানুষের কাছে গিয়ে উত্তর দিতে হচ্ছে যে, “মশাই, তুমি কার বিরুদ্ধে লড়ার কথা বলছ?” এই অবস্থা নিয়ে কোনো বিরোধী দল ভোটে যেতে পারবে? ভোটের পাটিগণিত সিপিএম অনেক ভালো জানত এবং মানুষের হাঁড়ি পর্যন্ত খবর রাখত| বুথে বুথে লিস্ট আর হার্ড কপি নিয়ে প্রতি মুহূর্তে আপডেট আর কাটাছেঁড়া চলত| সেই সিপিএম কিন্তু এখন ক্ষমতায় নেই| শুধুমাত্র পাটিগণিত দিয়ে অংক কষে কেউ যদি ভাবে ভোট বৈতরণী পার হয়ে যাবে, তবে সেটা হবে না|
অথবা সেই রাজনৈতিক দলেরই প্রাক্তন বিচারপতি সাংসদ আবেগপ্রবণ হয়ে বলে ফেলেছেন যে আদৌ এই বিরোধী দলের ভোটে জেতার ইচ্ছা আছে কি না| ভোট জিততে গেলে অন্তত যে মারমুখী বিরোধিতার ব্যাপার থাকে সেটা কি আছে? পাশাপাশি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতই শাসকদলের নেত্রী হোন, গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত তিনি যা করলেন তাতে তাঁর ভেতরে একজন বিরোধী নেত্রী বাস করে বলে মনে হয়| তাঁর কাজ ভুল না ঠিক সেই চিন্তা ছেড়ে দিন, তা আদালত বা সংবিধান বিচার করবে| কিন্তু একজন বিরোধী নেত্রী হিসেবে ঠিক যেরকম করা উচিত তিনি তাই করলেন| দলের বিপদে পড়া মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন| মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভেতরে সেই বিরোধী নেত্রীর সত্তাটা থেকে গেছে বলেই তাঁর দলের নেতারা বুক ঠুকে বলতে পারেন যে তাঁরা এই কারণেই তাঁর দল করেন|
আজ রাজ্য বিজেপিকে একটা কথা ভাবতে হবে| এই সেটিং তত্ত্ব ওঠার ঠিক পর ইডি যে রেইডটা করল, সেটা নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে হতেই পারে| সেই তদন্তে জুডিশিয়ারি জড়িত এবং সেখানে কোনো স্টে অর্ডার ছিল না| কিন্তু মানুষ যদি ভাবে এই তদন্তটা সেটিং তত্ত্ব ওঠার পর একটা ‘ঝাপটা’ মাত্র এবং তদন্ত যদি আবার পিছিয়ে আসে, তবে মানুষের বিশ্বাসের কঁাটাটা তলার দিকে নেমে যাবে| বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বিলম্ব না করে প্রেস কনফারেন্স করে জানিয়েছেন যে ইডি আদালতে মুখ করেছে এবং মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্তের আর্জি জানিয়েছে|
কিন্তু ইডির ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে| একের পর এক তদন্তে গিয়ে আক্রান্ত হওয়া বা গাড়ি ভাঙচুর হওয়ার ঘটনার পর পর্যাপ্ত ফোর্স কেন নেওয়া হচ্ছে না? বিজেপির বিধায়ক অশোক দিন্ডা সোজাসুজি বলেছেন যে ইডির ভূমিকা তাঁর ভালো লাগেনি| বিরোধী রাজনৈতিক দল বিজেপি যেখানে এত বড় ঘটনার প্রতিবাদে একটি সংগঠিত বড় মিছিল বা প্রতিবাদ রেলি বের করতে পারল না, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাস স্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত বিশাল মিছিল করে এক ঘণ্টার ওপর বক্তৃতা দিলেন| পুরো ফোকাসটাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর চলে গেল| শুধু এসি ঘরে বসে প্রেস কনফারেন্স করে ভোট জেতা যাবে কি?
মানুষ এখনো আশা রাখে যে একটা সুষ্ঠু সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি হোক এবং তার জন্যই তারা জীবন বাজি রেখে বিজেপিকে সাপোর্ট করতে প্রস্তুত| রাস্তাঘাটে চললে বোঝা যায় মানুষ প্রস্তুত ছিল এবং এখনো আছে| মানুষ এমনিতেই ভোটে সবকিছু উল্টে দেবে, ঠিক যেমন সিপিএম-এর সময় হয়েছিল| কিন্তু যারা নেতৃত্বের নিদর্শনে থাকছেন তারা কতটা ঠিক কাজ করছেন তা ভাবার সময় এসেছে| বিরোধী রাজনৈতিক দলের কাছে মানুষের এক্সপেক্টেশন থাকে তাদের জ্বালা-যন্ত্রণাগুলো তুলে ধরার| শৌমিক ভট্টাচার্যের মতো বিদগ্ধ এবং রাজনৈতিক বিচক্ষণ মানুষ যখন ড্যামেজ কন্ট্রোল করার চেষ্টা করেন, তখন বোঝা যায় বার্তাটা সমাজে কেমন যাচ্ছে| আপনারা যদি বিশ্বাস করেন ইডি একটি সংবিধানসম্মত সংস্থা এবং সার্বভৌমত্বের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা আছে, তবে তাদের তদন্তে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে একটা বিশাল বড় মিছিল করে প্রতিবাদটা রেজিস্টার করতে পারতেন আপনারা| কিন্তু আপনারা তা করলেন না|
ভবিষ্যৎ কী হবে? সাধারণ মানুষ আপনাদের ওপর প্রচুর আস্থা আর ভরসা রাখে| কিন্তু এবার ভাবার সময় এসেছে এবং সেটা অ্যালার্মিং| মানুষ কী মনে করছে সেটা কমেন্টে জানাবেন|
Tags- #WestBengalPolitics #I_PACRaid #MamataBanerjee #EDvsTMC #SuvenduAdhikari #CBIInvestigation #HighCourtBengal #SettingTheory #PoliticalAnalysis #ManusherBhasha #BengalElection2026 #CoalSmugglingCase #CentralAgency #KolkataNews #TMC #BJPBengal

0 মন্তব্যসমূহ