জলে ডোবানো ফোন, জেলবন্দি রাজনীতিবিদ এবং ৫৮ কোটি টাকার সম্পত্তি: পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারির ৫টি চাঞ্চল্যকর দিক
রাজনৈতিক দুর্নীতির খবরে ভরা সংবাদমাধ্যমের ভিড়ে মানুষের এখন অনেক সময় এসবে গা-সওয়া হয়ে যায়। তবুও, মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা সামনে আসে যার তথ্যগুলো এতটাই নির্লজ্জ এবং যার ব্যাপকতা এতটাই বিশাল যে তা আমাদের পূর্ণ মনোযোগ দাবি করে। পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সার্ভিস কমিশন (SSC) শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি তেমনই একটি মামলা। তদন্ত চললেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দুর্নীতির আরও একটি স্তর উন্মোচন করেছে, যা দেখে মনে হচ্ছে এই পচন পদ্ধতিগত এবং অত্যন্ত বেপরোয়া। এই নিবন্ধটি প্রায় ৫৮ কোটি টাকার বিপুল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই পর্বের ৫টি সবথেকে প্রভাবশালী এবং আশ্চর্যজনক দিক তুলে ধরছে।
১. বিপুল ব্যাপকতা: রাজ্যজুড়ে ৫৮ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে তারা এই কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত প্রায় ৫৮ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে। তৃণমূল বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহা এবং অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী প্রসন্ন রায়ের এই সম্পত্তিগুলো কোনো একটি নির্দিষ্ট জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে আবাসন, বিলাসবহুল ভিলা এবং প্রচুর জমি। কলকাতা, রাজারহাট, নিউ টাউন, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ এবং পূর্ব বর্ধমান জুড়ে এই সম্পত্তিগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, যা এই অবৈধ অর্থের বিনিয়োগ কতটা বিস্তৃত ছিল তা প্রমাণ করে। ভৌগোলিক এই বৈচিত্র্য অর্থ পাচারের একটি চিরাচরিত লক্ষণ, যাতে অবৈধ অর্থের উৎস খুঁজে পাওয়া এবং তা বাজেয়াপ্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
২. 'মধ্যস্থতাকারী' ছিলেন একজন আর্থিক মাফিয়া
ইডি-র বর্ণনা অনুযায়ী, প্রসন্ন রায় ছিলেন এই চক্রের "প্রধান মধ্যস্থতাকারী", যার মূল কাজ ছিল অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষক পদের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা। তবে সাম্প্রতিক এই বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পত্তি তার সাথে যুক্ত মোট সম্পদের একটি সামান্য অংশ মাত্র। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে আরও একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় ইডি প্রসন্ন রায়, তার স্ত্রী এবং তাদের সংস্থাগুলোর সাথে যুক্ত ১৬৩ কোটি টাকারও বেশি সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল। সেই তালিকায় ছিল হোটেল এবং রিসোর্টের মতো উচ্চমূল্যের সম্পদ। এই বিশাল অংকটি প্রমাণ করে যে "মধ্যস্থতাকারী"র ভূমিকাটি কোনো ছোট কাজ ছিল না, বরং এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক দুর্নীতির নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
৩. তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করতে পুকুরে ফোন ফেলার নাটকীয় চেষ্টা
বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ সাহার গ্রেফতারির ঘটনাটি কোনো ক্রাইম থ্রিলার বা গোয়েন্দা গল্পের চিত্রনাট্যের চেয়ে কম কিছু নয়। তদন্তকারীরা ঘিরে ফেলতেই সাহা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্ট করার মরিয়া চেষ্টা চালান। তিনি কথিতভাবে তার মোবাইল ফোনটি পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেন, যাতে তার যোগাযোগ এবং পরিচিতিদের তথ্য চিরতরে মুছে ফেলা যায়। কিন্তু তদন্তকারীরা দমে যাননি। অত্যন্ত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ইডি সেই পুকুরের সমস্ত জল পাম্প দিয়ে সরিয়ে ফেলে এবং ডুবন্ত ফোনটি উদ্ধার করে। এটি কেবল আতঙ্ক ছিল না; এটি ছিল একটি পরিকল্পিত ঝুঁকি যা নির্দেশ করে যে, ফোন নষ্ট করার অপরাধের চেয়েও ফোনের ভেতরের তথ্যগুলো সম্ভবত অনেক বেশি বিপজ্জনক ছিল।
৪. অভিযোগের ধারা অব্যাহত: "জেল থেকেও চাকরি বিক্রি"
কারাগারে বন্দি থাকলেও জীবনকৃষ্ণ সাহার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আসা বন্ধ হয়নি। গত নভেম্বরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা শুভেন্দু অধিকারী একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করেন যে, সাহা জেলের ভেতর থেকেও তার "টাকার বিনিময়ে চাকরি"র কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অভিযোগটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'X' (সাবেক টুইটার)-এ একটি ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশ্যে আনা হয়। জনসমক্ষে করা এই ধরনের অভিযোগ দুর্নীতিকে কেবল সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে রাখে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকে তুলে ধরে, যেখানে রাজ্যের সংশোধনাগারগুলোও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থামাতে অক্ষম বলে অভিযোগ উঠছে।
৫. এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারা
জীবনকৃষ্ণ সাহার মামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি রাজ্যের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর কলঙ্ক লেপে দেওয়া উচ্চ-প্রোফাইল গ্রেফতারি এবং দুর্নীতি মামলাগুলোর দীর্ঘ তালিকার সর্বশেষ সংযোজন মাত্র। মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে একজন রাজনৈতিক বিরোধীর মন্তব্য এই ধারাটিকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে:
"আপনার মন্ত্রীদের বাড়ি থেকে কেন ২৭ কোটি টাকা উদ্ধার হচ্ছে, তার জবাব দিতে পারেন? আপনি দায় নেন না। পার্থ চট্টোপাধ্যায় জেলে যান, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জেলে যান, অনুব্রত মণ্ডল জেলে যান, জীবনকৃষ্ণ সাহা জেলে যান, মানিক ভট্টাচার্য জেলে যান, চন্দ্রনাথ সিনহা জেলে যান, কুণাল ঘোষ তিন বছর জেল খেটে ফিরে আসেন।"
বিভিন্ন দুর্নীতি মামলায় বন্দি থাকা প্রভাবশালী নেতাদের নামের এই তালিকাটি শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিকে একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে। এটি প্রমাণ করে যে সমস্যাটি কেবল দু-একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে এটি একটি পুনরাবৃত্তিমূলক ঘটনা।
আস্থার সংকট
পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি থেকে উঠে আসা তথ্যগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের এক করুণ ছবি তুলে ধরে। যখন একজন 'মধ্যস্থতাকারী' ১৬০ কোটি টাকার বেশি সম্পত্তি জমা করতে পারেন এবং একজন রাজনীতিবিদ পুকুরে প্রমাণ ডোবাতে বাধ্য হন এবং জেলের ভেতর থেকেও চাকরি বিক্রির অভিযোগ ওঠে, তখন তা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থাকে নির্দেশ করে। তদন্তকারীরা যতই এই নেটওয়ার্কের গভীরে পৌঁছাচ্ছেন, ততই একটি মৌলিক প্রশ্ন বড় হয়ে উঠছে: যখন পচন এত গভীর, তখন সাধারণ মানুষের এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা কীভাবে ফিরে আসবে?




0 মন্তব্যসমূহ