Hot Posts

6/recent/ticker-posts

Ad Code

Recent in Home

সল্টলেকে ED ডিরেক্টরের গোপন বৈঠক -জালে কি এবার বড় মাছ ? ২৭৪২ কোটির কয়লা কেলেঙ্কারিতে I-PAK যোগসূত্র কোথায়?

এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট: সিজিও কমপ্লেক্সে ইডি ডিরেক্টরের ‘মাস্টার ক্লাস’, লক্ষ্য কি নবান্ন? আইপ্যাক ও কয়লা কেলেঙ্কারির অন্তর্তদন্তে রাহুল নবীন



মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির পারদ এখন ফুটন্ত টগবগে কড়াইয়ের মতো। একদিকে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতিসক্রিয়তা। এই দুইয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে খোদ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর ডিরেক্টর রাহুল নবীনের তিন দিনের কলকাতা সফর কেবল প্রশাসনিক ‘রুটিন রিভিউ’ নয়, বরং এক বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আইনি যুদ্ধের ব্লু-প্রিন্ট বলে মনে করা হচ্ছে। সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্স এখন কার্যত দুর্ভেদ্য দুর্গ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারায় ঘেরা এই দপ্তর থেকেই নির্ধারিত হচ্ছে আগামী কয়েক মাসের বাংলার রাজনীতির গতিপথ।

তিন দিনের মিশন: সিজিও কমপ্লেক্সে হাই-ভোল্টেজ বৈঠক

বৃহস্পতিবার সকালেই তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল এবং এজেন্সির শীর্ষ আইনি পরামর্শদাতাকে সাথে নিয়ে কলকাতায় পা রেখেছেন ইডি ডিরেক্টর রাহুল নবীন। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, কলকাতা বিমানবন্দরে নামার পর তিনি সরাসরি বিএসএফ (BSF) ক্যাম্পে যান এবং সেখান থেকে আজ সকালে সিজিও কমপ্লেক্সে পৌঁছান। কলকাতার ইডি দপ্তরে কর্মরত সমস্ত পদস্থ আধিকারিককে এই বৈঠকে উপস্থিত থাকার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

যুগ্ম অধিকর্তা (Joint Director) এবং তার ওপরের স্তরের সমস্ত অফিসারদের সাথে রাহুল নবীনের এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইডি সূত্রে খবর, গত কয়েক সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গে যে নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে তল্লাশিকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের সাথে যে সংঘাত বেঁধেছে, তার প্রতিটি খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখছেন ডিরেক্টর। গতবার তিনি কলকাতায় এসেছিলেন সন্দেশখালিতে ইডি অফিসারদের ওপর হামলার পর। আর এবার তাঁর আসার নেপথ্যে রয়েছে আইপ্যাক কাণ্ডে ‘নথি চুরির’ চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

আইপ্যাক তল্লাশি ও ‘সবুজ ফাইল’ বিতর্ক: সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু

গত ৮ জানুয়ারি আইপ্যাক এবং তার প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনের বাসভবনে ইডি-র তল্লাশি কেবল একটি সাধারণ সার্চ অপারেশন ছিল না। ওই দিনটি বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন ‘ফল্ট লাইন’ তৈরি করে দিয়েছে। ইডি-র অভিযোগ, আইপ্যাক দপ্তরে তল্লাশি চলাকালীন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা সেখানে সশরীরে উপস্থিত হন।

সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, ইডি সুপ্রিম কোর্টে যে হলফনামা জমা দিয়েছে, তাতে সরাসরি অভিযোগ করা হয়েছে যে তল্লাশি চলাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলপূর্বক ইডি আধিকারিকদের কাছ থেকে নথিপত্র এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইস ‘ছিনিয়ে’ নিয়েছেন। এমনকি এক ইডি অফিসারের মোবাইল ফোনও সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি ছিল, ওই সবুজ ফাইলে দলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনি কৌশল এবং অত্যন্ত গোপনীয় তথ্য ছিল, যা বিজেপি-র নির্দেশে ইডি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। এই ‘সবুজ ফাইল’ এবং ‘প্রমাণ লোপাটের’ অভিযোগই এখন রাহুল নবীনের টেবিলের সবথেকে বড় ফাইল।

সুপ্রিম কোর্টের লড়াই: ২ নম্বর রেসপন্ডেন্ট মুখ্যমন্ত্রী

এই মামলার জল গড়িয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে এই মামলার পরবর্তী শুনানি। ইডি তাদের রিট পিটিশনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘রেসপন্ডেন্ট নম্বর ২’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তালিকায় রয়েছেন ডিজি রাজীব কুমার এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারও।

সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই রাজ্য পুলিশের দায়ের করা ইডি-বিরোধী এফআইআর-এ স্থগিতাদেশ দিয়েছে। কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল অত্যন্ত কড়া। আদালত জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাজে রাজ্যের হস্তক্ষেপ কোনোভাবেই কাম্য নয় এবং এই বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন যাতে আইনের আড়ালে অপরাধীদের আড়াল না করা হয়। ইডি-র দাবি, যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তখন নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে এই মামলাটি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত।

২৭৪২ কোটির কয়লা কেলেঙ্কারি: আইপ্যাক যোগসূত্র কোথায়?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে, নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণকারী সংস্থা আইপ্যাক-এর দপ্তরে ইডি-র হঠাৎ কী কাজ? ইডি-র উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট—এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে ২৭৪২ কোটি টাকার কয়লা পাচার মামলায়।

সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত অনুপ মাজি ওরফে লালা ইসিএল (ECL) এলাকা থেকে অবৈধভাবে কয়লা তুলে যে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছিল, তার একটি বড় অংশ ‘হাওয়ালা’ চ্যানেলের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচারের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ইডি-র প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, এক হাওয়ালা অপারেটর কয়লা পাচারের ‘প্রোসিডস অফ ক্রাইম’ লেন্ডিং বা লেয়ারিং করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আইপ্যাক-এর অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করেছে। ইডি-র লক্ষ্য এখন সেই ট্রেইল বা পথের হদিস পাওয়া, যার মাধ্যমে কয়লা পাচারের কালো টাকা নির্বাচনি ফান্ডে পরিণত হয়েছে।

আইপ্যাক-এর অন্দরে বদল: ডিজিটাল ঢাল ও গোপনীয়তা

৮ জানুয়ারির ঝড়ের পর আইপ্যাক-এর অন্দরেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, তল্লাশির পরদিনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে আইপ্যাক ম্যানেজমেন্টের এক জরুরি বৈঠক হয়। এরপরই কর্মীদের জন্য নতুন ‘রেড গাইডলাইন’ ইস্যু করা হয়েছে:

  • ডেটা প্রোটেকশন: এখন থেকে ল্যাপটপ বা হার্ড ডিস্কে কোনও স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ডেটা রাখা হবে না। সবটাই থাকবে এনক্রিপ্টেড ক্লাউড সার্ভারে।

  • ডিজিটাল সাইলেন্স: কর্মীদের সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও মন্তব্য করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

  • লিগ্যাল শিল্ড: এজেন্সির কোনও প্রশ্নের উত্তরে আইনি পরামর্শদাতার উপস্থিতি ছাড়া একটি শব্দও না বলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইপ্যাক এখন এই তল্লাশিকে একটি ‘পলিটিক্যাল ওয়েপন’ হিসেবে ব্যবহার করার রণকৌশল নিচ্ছে। ‘বেঙ্গল প্রাইড’ বা বাংলার সম্মানের ওপর হামলা হিসেবে এই তল্লাশিকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।

রাহুল নবীনের রিভিউ: কেবল শুরু নাকি শেষ অঙ্ক?

শুক্রবার সিজিও কমপ্লেক্সের বৈঠকে রাহুল নবীন ইডি আধিকারিকদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, তদন্তের গতি এক বিন্দুও কমানো চলবে না। আইপ্যাক-এর সাথে যুক্ত প্রতিটি ভেন্ডার পেমেন্ট এবং ক্যান্ডিডেট সিলেকশন সংক্রান্ত নথি খুঁটিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, ইডি এখন শুধু পেরিফেরাল প্লেয়ার বা নিচুতলার কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে থেমে থাকতে চাইছে না। রাহুল নবীনের গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর খুব শীঘ্রই আইপ্যাক প্রধান প্রতীক জৈনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সমন পাঠাতে পারে এজেন্সি। এমনকি প্রয়োজনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা নিয়েও আইনি প্রশ্ন তোলার পরিকল্পনা রয়েছে ইডি-র।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাহুল নবীনের এই সফর আসলে দিল্লির একটি কড়া বার্তা। ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে তৃণমূলের মূল ‘স্ট্র্যাটেজি রুট’ বা শিকড়ে আঘাত হানাই ইডি-র লক্ষ্য। যদি প্রমাণ হয় যে কয়লা পাচারের টাকা সত্যিই নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে তা তৃণমূলের জন্য এক অস্তিত্বের সংকট তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনাকে ফেডারেল স্ট্রাকচার বা যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর ওপর আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরছে। সুপ্রিম কোর্ট এখন এই ‘লক্ষণ রেখা’ কোথায় টানে, তার ওপরেই নির্ভর করছে আগামী দিনে কেন্দ্রীয় এজেন্সি এবং নির্বাচিত রাজ্য সরকারের সম্পর্ক।


রাহুল নবীন আরও দু’দিন কলকাতায় থাকবেন। সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে লাইট জ্বলবে রাতভর। ফাইলের পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসবে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের গোপন সূত্র। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম ইডি-র এই লড়াই এখন আর কেবল একটি দুর্নীতির মামলা নয়, এটি এখন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। ইডি ডিরেক্টরের এই সফর কি কোনও বড় গ্রেফতারির পূর্বাভাস? নাকি সুপ্রিম কোর্টের শুনানির আগে নথি গোছানোর কৌশল? উত্তর দেবে সময়। তবে এটুকু নিশ্চিত, রাহুল নবীনের এই তিন দিনের ‘মাস্টার ক্লাস’ বাংলার রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী কম্পন সৃষ্টি করবে।

ট্যাগসমূহ (Tags):

#EDDirectorKolkata, #RahulNavinVisit, #IPACRaids, #MamataVsED, #PratikJainED, #CoalSmugglingScam, #WestBengalPolitics2026, #SupremeCourtHearingBengal, #CGOComplexMeeting, #MoneyLaunderingCase, #AnupMajiLala, #BreakingNewsBengal, #ManusherBhashaExclusive, #PoliticalShowdownBengal, #EDInvestigation


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

Comments

Ad Code