কনস্টিটিউয়েন্সি ওয়াচ: ব্যারাকপুর (১০৮)
ব্যারাকপুর (১০৮): শিল্পাঞ্চলের ১৯ শতাংশ ভোটারের ‘অদৃশ্য’ বিয়োজন কি ২০২৬-এ পরিবর্তনের নতুন কারিগর? নড়বড়ে ঘাসফুলের গড়ে কি ফুটবে পদ্ম?
মানুষের ভাষা (Manusher Bhasha) | তারিখ: ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬
সারাংশ (Summary)
ব্যারাকপুর—বাংলার রাজনীতির সেই চিরন্তন কুরুক্ষেত্র, যেখানে গঙ্গার ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বদলায় রাজনীতির রঙ। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এখানে প্রধান ইস্যু কোনো রাজনৈতিক গ্ল্যামার নয়, বরং ১৯ শতাংশ ভোটারের রহস্যময় অন্তর্ধান। এই বিশাল সংখ্যক নাম উধাও হওয়ার পেছনে কি কেবল যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র? মানুষের ভাষায় আজ ব্যারাকপুরের পোস্টমর্টেম।
ঐতিহ্যের অন্তরালে রাজনীতির ধূসর রেখা
ব্যারাকপুর মহকুমা কেবল উত্তর ২৪ পরগনার এক ভৌগোলিক অংশ নয়, এটি বাংলার রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ দর্পণ। ১৮৫৭-এর মঙ্গল পাণ্ডের বিদ্রোহের আগুন যেমন এই মাটি থেকে জ্বলে উঠেছিল, তেমনই সমসাময়িক বাংলার প্রতিটি নির্বাচনে ব্যারাকপুর তার নিজস্ব বয়ান তৈরি করেছে। এককালে এই এলাকা ছিল বামেদের ‘রেড করিডোর’। কিন্তু ২০০৯-এর পর থেকে এখানে শুরু হয় ঘাসফুল শিবিরের দাপট। তবে ব্যারাকপুরের রাজনীতির বিশেষত্ব হলো এর অস্থিরতা। চটকলের শ্রমিক, হিন্দিভাষী ভোটার এবং গঙ্গার ধারের অভিজাত পাড়া—এই তিনের সংমিশ্রণ ব্যারাকপুরকে এক অনিশ্চিত যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে।
২০২১-এর নির্বাচনে তৃণমূলের রাজ চক্রবর্তী জয়ী হয়েছিলেন এক তারকা-প্রভায়। কিন্তু সেই জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ৯,২২২ ভোট। বিজেপির চন্দ্রমণি শুক্লা যে পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন, তা শাসক দলের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলার জন্য যথেষ্ট ছিল। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে বিজেপির উত্থান এবং তৃণমূলের লিড কমা। আজ ২০২৬-এর শুরুতে দাঁড়িয়ে ব্যারাকপুরের মানুষ কি সেই তারকা-গ্ল্যামারে আজও আচ্ছন্ন? নাকি বাস্তবতার রুক্ষ জমিতে দাঁড়িয়ে তারা বিকল্প কোনো শক্তির স্বপ্ন দেখছে? শিল্পাঞ্চলের মানুষ এখন এক শক্তিশালী ও স্থায়ী নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে।
SIR ফ্যাক্টর: ১৯.০১ শতাংশের ‘ডিজিটাল’ উচ্ছেদ আতঙ্ক
২০২৬-এর নির্বাচনের আগে ব্যারাকপুরের বাতাসে এখন কান পাতলে উন্নয়নের শ্লোগানের চেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে এক নীরব হাহাকার। নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনীর খসড়া রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ব্যারাকপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তত ১৯.০১ শতাংশ ভোটারের নাম ‘আনম্যাপড’ বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র কোপে পড়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫৬ হাজার ভোটার এখন তাঁদের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
প্রশাসনিক স্তরে একে কারিগরি ত্রুটি বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চললেও, বাস্তবের চিত্রটি অত্যন্ত ভয়াবহ। যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের একটি বিশাল অংশ চটকল শ্রমিক এবং হিন্দিভাষী হিন্দু পরিবার। অদ্ভুতভাবে, টিটাগড় এবং ব্যারাকপুর মিউনিসিপ্যালিটির নির্দিষ্ট কিছু ওয়ার্ডেই এই বিয়োজনের হার সবথেকে বেশি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ১৯ শতাংশ ভোটার আসলে সেই নীরব জনতা, যারা গত কয়েক বছরে তৃণমূলের তোষণ নীতি এবং স্থানীয় তোলাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শুরু করেছিলেন। যদি এই বিশাল সংখ্যক মানুষ ভোটের দিন বুথে পৌঁছাতে না পারেন, তবে তা গণতন্ত্রের পরাজয় হিসেবেই দেখা হবে। আর যদি তাঁরা তালিকায় ফিরে আসেন, তবে সেই ফিরে আসা হবে এক বিরাট ‘প্রটেস্ট ভোট’ হিসেবে—যা সরাসরি বিজেপি-র পাল্লা ভারী করবে।
চটকলের হাহাকার ও কর্মসংস্থানের মরীচিকা
ব্যারাকপুরের রাজনীতির পিচ তৈরি হয় চটকলের গেটে। রিলায়েন্স জুট মিল থেকে শুরু করে ব্যারাকপুরের বিভিন্ন বড় বড় চটকলগুলো এখন ধুঁকছে। কাঁচা পাটের অভাব, মজুতদারদের দাপট এবং রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার অভাব—এই তিনে মিলে শ্রমিকের ঘরে উনুন জ্বলা দায় হয়ে পড়েছে। শ্রমিকদের একাংশ মনে করছেন, তৃণমূল সরকার কেবল উৎসব আর মেলা নিয়ে ব্যস্ত, অথচ চটকলের হাজার হাজার শ্রমিকের প্রভিডেন্ট ফাণ্ড বা ইএসআই-এর বকেয়া নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।
এই ক্ষোভকে পুঁজি করেই বিজেপি তাদের রণনীতি সাজিয়েছে। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, কেন্দ্র সরকার কাঁচা পাটের দাম নির্ধারণ করলেও রাজ্য সরকারের মধ্যস্থতাকারীরা সেই সুফল শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না। শিল্পাঞ্চলের চটকল গেটগুলোতে এখন বিজেপির ‘শ্রমিক সেল’ অত্যন্ত সক্রিয়। তারা শ্রমিকদের বোঝাচ্ছে যে, ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার ছাড়া এই রুগ্ন শিল্পের পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়। মানুষের ভাষা-র সমীক্ষায় দেখা গেছে, বেকারত্ব (৪৫%) এবং চটকল সংকট এখন ব্যারাকপুরের প্রধান নির্বাচনী ইস্যু।
তৃণমূলের অন্দরের ফাটল ও রাজ চক্রবর্তীর গ্ল্যামার সংকট
রাজ চক্রবর্তীকে প্রার্থী করে তৃণমূল ২০২১-এ গ্ল্যামারের যুদ্ধে জিতেছিল ঠিকই, কিন্তু বিধায়ক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে খোদ দলের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে ‘সেলিব্রিটি’ বিধায়কের দূরত্ব শিল্পাঞ্চলের মানুষের নজর এড়ায়নি। ব্যারাকপুরের মতো একটি কঠিন কেন্দ্রে কেবল শুটিংয়ের অবসরে রাজনীতি করা সম্ভব নয়—এই ধারণা এখন মানুষের মনে বদ্ধমূল হচ্ছে। অন্যদিকে, বিজেপি এখানে এমন এক মুখ খুঁজছে যে মাটির কাছের লোক। ২০২৬-এর লড়াই হবে ‘গ্ল্যামার বনাম গ্রাউন্ড রিয়ালিটি’-র। তৃণমূলের অন্দরে এখন গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে, যা ভোটারদের মনে শাসক দলের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
বিজেপির ‘নীরব’ উত্থান ও জাতীয়তাবাদের জোয়ার
ব্যারাকপুরের হিন্দিভাষী ভোটারদের মধ্যে রাম মন্দিরের আবেগ এবং জাতীয়তাবাদের জোয়ার এখনও স্তিমিত হয়নি। বিজেপি এখানে সরাসরি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি না করে বরং ‘নাগরিক অধিকার’ এবং ‘দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন’-এর ডাক দিচ্ছে। বিশেষ করে SIR ইস্যুকে সামনে রেখে বিজেপি ঘরোয়া বৈঠকগুলোতে বোঝাচ্ছে যে, কীভাবে একটি বিশেষ ভোটব্যাঙ্ককে সুরক্ষিত রেখে অন্য পক্ষের নাম কাটা হচ্ছে। এই প্রচারটি হিন্দু মধ্যবিত্ত এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে এক বিরাট মেরুকরণ তৈরি করছে। হিন্দিভাষী ভোটারদের মধ্যে বিজেপি এবার ১০০ শতাংশ মেরুকরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে।
২০২৬-এর নির্বাচনী রণক্ষেত্র (ডেটা শিট)
| সাল / মাপকাঠি | বিজয়ী / লিড | প্রাপ্ত ভোট শতাংশ | প্রধান প্রতিপক্ষ | রাজনৈতিক সমীকরণ |
| ২০ ২০২১ বিধানসভা | রাজ চক্রবর্তী (TMC) | ৪৬.৪৭% | বিজেপি (BJP) | ৯,২২২ ভোটের ব্যবধান |
| ২০ ২৪ লোকসভা (লিড) | তৃণমূল (TMC) | ৪৫.৫৬% | বিজেপি (BJP) | ৩.৫% ভোট কমেছে |
| ২০ ২৬ (সম্ভাব্য SIR) | ? | ১৯.০১% ডিলেশন | - | বিজেপির বিশাল অ্যাডভান্টেজ |
সংখ্যালঘু ভোটের নতুন অংক: নওশাদ ও হুমায়ুন ফ্যাক্টর
ব্যারাকপুর বিধানসভা এলাকার সংখ্যালঘু ভোটারদের একটি বড় অংশ গত এক দশকে ঘাসফুল শিবিরের অনুগত থেকেছে। কিন্তু ২০২৬-এর ছবিটা একটু আলাদা। নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফ (ISF) ধীরে ধীরে তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে টিটাগড় সংলগ্ন এলাকায় মুসলিম তরুণদের মধ্যে নওশাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীরের মতো তৃণমূল বিধায়কের বিদ্রোহ সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের অন্দরে একটি অস্বস্তি তৈরি করেছে। যদি সংখ্যালঘু ভোট ১০-১৫ শতাংশও ভাগ হয়ে যায়, তবে বিজেপির জয় ঠেকানো তৃণমূলের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
পরিবর্তনের পদধ্বনি
সব মিলিয়ে ব্যারাকপুর ১০৮ নম্বর কেন্দ্রটি এখন পরিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ১৯ শতাংশ ভোটারের উধাও হওয়া, চটকলের সংকট এবং শাসক দলের অন্তর্দ্বন্দ্ব—এই সব কটি ফ্যাক্টরই এখন বিজেপির পালে হাওয়া দিচ্ছে। শিল্পাঞ্চলের মানুষ এবার আর কেবল প্রতিশ্রুতিতে ভুলতে রাজি নয়, তারা চায় কাজের অধিকার এবং নাগরিকত্বের সুরক্ষা। যদি বিজেপি প্রার্থী নির্বাচনে কোনো ভুল না করে এবং বুথ স্তর পর্যন্ত এই ক্ষোভকে ধরে রাখতে পারে, তবে ২০২৬-এর মে মাসে ব্যারাকপুরে পদ্ম ফোটানো স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ‘মানুষের ভাষা’ কেবল এটুকুই বলতে পারে যে, ব্যারাকপুর এবার আর তোষণে নয়, বরং ন্যায়ে বিশ্বাসী। রাজনীতির ময়দানে হাওয়া এখন গেরুয়া শিবিরের অনুকূলেই বইছে।
ট্যাগসমূহ: #BarrackporeElection2026 #OpinionPoll #WestBengalPolitics #NawsadSiddique #HumayunKabir #SIRList #TMC #BJP #ManusherBhasha #BengalNewsViral #MuslimFactor
0 মন্তব্যসমূহ