I-PAC কাণ্ডে হাইকোর্টে বড় ধাক্কা তৃণমূলের! ‘তথ্য সুরক্ষা’র আবেদন খারিজ; ED-র সুপ্রিম প্যাঁচে বিদ্ধ মমতা
১৪ জানুয়ারি ২০২৬, বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে আইপ্যাক (I-PAC) এবং তৃণমূলের দায়ের করা মামলার শুনানি শেষে শাসকদলের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিলেন বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ। একদিকে তৃণমূল তাদের রাজনৈতিক তথ্য সুরক্ষার যে দাবি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল, তা আইনি সারবত্তা হারিয়ে খারিজ হয়ে গেল। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ইডির আনা ‘তথ্য লোপাট’ ও ‘তদন্তে বাধা’ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ এখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন।
মানুষের ভাষা, কলকাতা: ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বড়সড় আইনি বিপর্যয়ের মুখে পড়ল শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। বুধবার কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে আইপ্যাক-ইডি মামলার শুনানিতে তৃণমূলের সমস্ত আইনি ঘুঁটি কার্যত উল্টে গেল। ইডির পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) এসভি রাজু আদালতকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন—ইডি কোনো তথ্যই বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি, কারণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে গিয়ে প্রমাণাদি ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করেই তৃণমূলের করা ‘ডেটা প্রোটেকশন’ মামলাটি নিষ্পত্তি (Disposed of) করে দিল আদালত।
শুনানির নাটকীয় মোড়: ‘ইডি কিছুই পায়নি’
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মেনকা গুরুস্বামী সওয়াল করেছিলেন যে, ইডি তল্লাশির নামে তৃণমূলের আগামী নির্বাচনের কৌশল এবং সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এসভি রাজু এর পাল্টা দিয়ে বলেন, “বাজেয়াপ্ত করার কোনো সুযোগই আমাদের দেওয়া হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলবল এসে অফিসারদের হাত থেকে ফাইল, ল্যাপটপ এবং হার্ড ড্রাইভ কেড়ে নিয়ে গিয়েছেন।” ইডি আদালতের কাছে তাদের ‘পঞ্চনামা’ (Panchnama) পেশ করে দেখায় যে সেখানে কোনো সিজার লিস্ট বা বাজেয়াপ্ত হওয়া নথির উল্লেখ নেই。
বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ পর্যবেক্ষণ করেন যে, যেহেতু ইডির কাছে কোনো তথ্য বা ডিভাইস নেই, তাই সেই তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে নির্দেশের কোনো আইনি প্রয়োজনীয়তা আর অবশিষ্ট থাকে না। ফলে তৃণমূলের আবেদনটি সরাসরি খারিজ বা নিষ্পত্তি করে দেয় হাইকোর্ট。
বিজেপির আক্রমণ: ‘সাংবিধানিক কাঠামোর ভাঙন’
এই রায়ের পরই তৃণমূলকে বিঁধতে ময়দানে নেমেছেন বিজেপি নেতারা। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শৌমিক ভট্টাচার্যের দাবি, “মুখ্যমন্ত্রী নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রমাণ লোপাট করেছেন। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, এটি পশ্চিমবঙ্গে সাংবিধানিক কাঠামোর সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া (Breakdown of constitutional machinery)।” বিজেপির দাবি, ইডি কিছুই পায়নি বলা মানেই প্রমাণিত হয়ে গেল যে মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়ে নথিপত্র সরিয়েছেন, যা তদন্তে সরাসরি বাধার শামিল。
সুপ্রিম কোর্টের প্যাঁচে নবান্ন
হাইকোর্ট ইডির করা মামলাটির শুনানি স্থগিত রেখেছে কারণ ইডি ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। ইডির দাবি:
মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্য পুলিশের বিরুদ্ধে সিবিআই (CBI) তদন্ত চাই।
যে সমস্ত নথি ও ডিভাইস মুখ্যমন্ত্রী নিয়ে গিয়েছেন, তা তদন্তের স্বার্থে ফেরত দিতে হবে।。
নবান্ন সুপ্রিম কোর্টে ক্যাভিয়েট দাখিল করলেও, হাইকোর্টের আজকের এই পর্যবেক্ষণ তাদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিল বলে মনে করছেন আইনজ্ঞরা।
এক নজরে হাইকোর্টের শুনানি ও ফলাফল (Summary Table)
| পক্ষ | দাবি ও যুক্তি | আদালতের সিদ্ধান্ত |
| তৃণমূল কংগ্রেস | ইডি তাঁদের নির্বাচনী তথ্য ও কৌশল চুরি করেছে। | আবেদন খারিজ/নিষ্পত্তি: যেহেতু ইডি কিছুই বাজেয়াপ্ত করতে পারেনি। |
| ইডি (ED) | মুখ্যমন্ত্রী তদন্তে বাধা দিয়েছেন ও প্রমাণ ছিনিয়ে নিয়েছেন। | স্থগিত: বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের অধীনে। |
| মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় | রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রেইড; তিনি কেবল প্রতিবাদ করেছেন। | সুপ্রিম নোটিশের অপেক্ষায়: তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এখন দিল্লির কোর্টে। |
হাইকোর্টের আজকের নির্দেশের ফলে আইনি লড়াইয়ে তৃণমূলের ‘আক্রমণাত্মক’ চালটি কার্যত বুমেরাং হয়ে গেল। ইডি ‘কিছুই পায়নি’—আদালতের নথিতে এই বয়ানটি রেকর্ড হয়ে যাওয়ার ফলে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘প্রমাণ লোপাটে’র অভিযোগটি আরও জোরালো রূপ নিল। এখন সকলের নজর সুপ্রিম কোর্টের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সিবিআই তদন্ত শুরু হবে কি না। ২০২৬-এর আগে এই আইনি সংঘাত যে তৃণমূলের জনভিত্তিতে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
শুনানিতে কি হলো দেখুন বিস্তারিত
১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে কলকাতা হাইকোর্টে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে ইডি (ED) বনাম আইপ্যাক (I-PAC) এবং তৃণমূলের মামলার শুনানি অত্যন্ত নাটকীয় মোড় নেয়। আপনার অনুরোধ অনুযায়ী, নিচে শুনানির মূল সওয়াল-জবাব এবং আইনি যুক্তিগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
কলকাতা হাইকোর্ট: শুনানির বিস্তারিত বিবরণ
অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল (ASG) এসভি রাজু (ইডি-র পক্ষে):
এসভি রাজু: "মাই লর্ড, এই মামলায় ইডির পক্ষ থেকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদন আছে। প্রথমত, গত ৮ জানুয়ারি আইপ্যাক এবং প্রতীক জৈনের বাসভবনে তল্লাশি চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে বাধা সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য একটি নিরপেক্ষ তদন্ত (CBI) প্রয়োজন।
আদালত: "আজকের শুনানির বর্তমান স্থিতি কী?"
এসভি রাজু: "আমি আদালতকে জানাতে চাই যে, ইডি এই একই বিষয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই বিষয়টি বিবেচনা করছে, তাই আমি এই উচ্চ আদালতের কাছে আবেদন করছি যে আমাদের মামলাটির শুনানি আপাতত স্থগিত (Adjourn) রাখা হোক। সুপ্রিম কোর্ট আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে এই বিষয়ে শুনানি করতে পারে। যখন কোনো বিষয় উচ্চতর আদালতে বিচারাধীন থাকে, তখন নিম্নতর বা সমান্তরাল আদালতে শুনানি স্থগিত রাখাই বিচারবিভাগীয় রীতি।"
এসভি রাজু (তৃণমূলের পিটিশন প্রসঙ্গে): "তৃণমূল কংগ্রেস একটি পিটিশন দাখিল করে দাবি করেছে যে আমরা নাকি তাদের অত্যন্ত গোপনীয় রাজনৈতিক তথ্য এবং নির্বাচনী কৌশল সম্বলিত ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করেছি। আমি অন রেকর্ড বলতে চাই— আমরা কিছুই বাজেয়াপ্ত করতে পারিনি। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এসে আমাদের অফিসারদের হাত থেকে ফাইল এবং ল্যাপটপ ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। আমাদের অফিসারদের সেখানে কার্যত বন্দি করে রাখা হয়েছিল। আমাদের কাছে থাকা 'পঞ্চনামা' (Panchnama) স্পষ্ট বলছে যে কোনো নথি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।"
সিনিয়র অ্যাডভোকেট মেনকা গুরুস্বামী (তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে):
মেনকা গুরুস্বামী: "মাই লর্ড, আইপ্যাক কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি প্রফেশনাল কনসালটেন্সি ফার্ম। কিন্তু সেখানে তল্লাশির নামে আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
আদালত: "কিন্তু ইডি তো বলছে তারা কোনো তথ্যই সিজ (Seize) করতে পারেনি। তাহলে আপনি কীসের সুরক্ষার দাবি করছেন?"
মেনকা গুরুস্বামী: "ইডি-র দাবি বিভ্রান্তিকর। তারা তল্লাশি চালিয়েছে এবং ডিজিটাল ক্লোনিং-এর মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে আমাদের আশঙ্কা। সেই তথ্যের অপব্যবহার বন্ধ করার নির্দেশ দিক আদালত।"
সিনিয়র অ্যাডভোকেট কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত আইনজীবী হিসেবে):
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়: "মাই লর্ড, ইডি-র মামলার বিরোধিতা করছি। ইডি এই মামলায় মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে পক্ষভুক্ত করেছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা এখন শুনানি পেছাতে চাইছে কারণ তাদের কাছে কোনো শক্ত প্রমাণ নেই। মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়েছিলেন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখতে এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির বেআইনি আচরণের প্রতিবাদ করতে। ইডি যে আবেদন সুপ্রিম কোর্টে করেছে, সেখানেও অনেক ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছে।"
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও চূড়ান্ত নির্দেশ (বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ):
বিচারপতি সমস্ত পক্ষের যুক্তি শোনার পর চূড়ান্ত নির্দেশ দেন:
আদালত: "তৃণমূল কংগ্রেসের আবেদনের মূল ভিত্তি ছিল তাদের তথ্যের সুরক্ষা। কিন্তু প্রতিপক্ষ (ইডি) হলফনামা দিয়ে আদালতে জানিয়েছে যে তারা আইপ্যাক-এর দফতর থেকে কিছুই বাজেয়াপ্ত করেনি। এমনকি তল্লাশিস্থলে তৈরি হওয়া 'পঞ্চনামা' থেকে এটি পরিষ্কার যে ইডি কোনো নথি বা ডিভাইস উদ্ধার করতে পারেনি। যেহেতু কোনো তথ্য ইডির হেফাজতে নেই, তাই সেই তথ্য সংরক্ষণের বিষয়ে কোনো নির্দেশের আর প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না। ফলে, তৃণমূলের এই আবেদনটি নিষ্পত্তি (Disposed of) করা হলো।"
আদালত (ইডির মামলা প্রসঙ্গে): "যেহেতু ইডি নিজেই জানিয়েছে যে তারা সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি শুনতে রাজি হয়েছে, তাই আমরা এই উচ্চ আদালতে ইডির মামলাটির শুনানি আপাতত স্থগিত রাখছি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর এটি আবার শোনা হবে।"
এই নির্দেশের ফলে তৃণমূলের করা 'ডেটা সুরক্ষা'র মামলাটি আইনগতভাবে শেষ হয়ে গেল, কারণ ইডি স্বীকার করে নিয়েছে তারা কিছুই পায়নি। অন্যদিকে, মমতার বিরুদ্ধে ইডির আনা 'তদন্তে বাধা'র অভিযোগটি এখন সুপ্রিম কোর্টে ভাগ্যনির্ধারণের অপেক্ষায় রইল।
ট্যাগ (Tags):
#HighCourtVerdict #TMCVsED #MamataBanerjee #IPACCase #JusticeSuvraGhosh #SupremeCourtLawsuit #CBIProbeRequest #WestBengalPolitics #ConstitutionalCrisis #BreakingNewsBengal #LegalWar2026

0 মন্তব্যসমূহ