সিঙ্গুরের মাটি থেকে পরিবর্তনের ডাক ?মোদীর মেগা সমাবেশ কি ২০২৬-এর ভাগ্য নির্ধারণ করবে?
মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক, সিঙ্গুর: পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে সিঙ্গুর এমন এক নাম, যা একইসঙ্গে আন্দোলনের সাফল্য এবং শিল্পায়নের বিয়োগান্তক পরিণতির প্রতীক। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই সিঙ্গুরকেই এবার নিজেদের প্রধান রণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিল ভারতীয় জনতা পার্টি। রবিবার সিঙ্গুরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মেগা জনসভাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির পারদ এখন তুঙ্গে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গুরের এই সমাবেশ কেবল একটি জনসভা নয়, বরং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শিল্পনীতি’র বিরুদ্ধে বিজেপির এক সুপরিকল্পিত ‘স্ট্র্যাটেজি বদল’। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, যে মাটি থেকে মমতার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল, সেই মাটি থেকেই তাঁর সরকারের পতনের ঘণ্টা বাজিয়ে দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
শনিবার মালদহের সভায় প্রধানমন্ত্রী অনুপ্রবেশ এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা লুটের মতো ইস্যুগুলিকে সামনে এনেছিলেন। কিন্তু সিঙ্গুরে তাঁর আক্রমণের অভিমুখ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজেপি সূত্রের খবর, টাটা ন্যানো কারখানা সিঙ্গুর থেকে চলে যাওয়ার সেই যন্ত্রণাকেই এবার ভোটের প্রধান হাতিয়ার করতে চাইছে গেরুয়া শিবির। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর বক্তৃতায় তুলে ধরতে পারেন কীভাবে ২০০৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমি আন্দোলনের জেরে টাটা মোটরস পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে গুজরাটের সানন্দে চলে গিয়েছিল এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি কীভাবে সেই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়ে গুজরাটের ভোল বদলে দিয়েছিলেন। বিজেপির এই প্রচারের মূল লক্ষ্য হলো রাজ্যের শিক্ষিত বেকার যুবকদের বোঝানো যে, তৃণমূলের আমলে বাংলা ‘শিল্পের কবরস্থানে’ পরিণত হয়েছে।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের পরিসংখ্যান তুলে ধরে নবান্নকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, গুজরাট বা মহারাষ্ট্রের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ বিনিয়োগের দৌড়ে কয়েক আলোকবর্ষ পিছিয়ে। যেখানে গুজরাটে ৯২১টি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, সেখানে বাংলার ঝুলিতে রয়েছে মাত্র ১১৬টি। এই পরিসংখ্যানের মাধ্যমেই বিজেপি সিঙ্গুরের মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে যে, গত ১৫ বছরে রাজ্যে কোনও বড় কলকারখানা তৈরি না হওয়ায় কর্মসংস্থানের পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্যের ক্রমবর্ধমান ৭.৭১ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝাকে সামনে এনে তৃণমূলের আর্থিক ব্যর্থতাকেও প্রকট করতে চাইছে তারা।
সিঙ্গুর আন্দোলনের ইতিহাস বাংলার রাজনীতিতে এক চিরস্থায়ী ক্ষত বা ক্ষতের ওপর প্রলেপ দেওয়ার মতো বিষয়। ২০০৬ সালে বামফ্রন্ট সরকার যখন টাটাদের জন্য জমি অধিগ্রহণ শুরু করেছিল, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২৬ দিনের অনশন এবং লাগাতার আন্দোলন টাটাদের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। সেই জয় তৃণমূলের কাছে ‘মা-মাটি-মানুষে’র জয় হলেও, আজ প্রায় দুই দশক পর সিঙ্গুরের সেই জমিতে চাষাবাদ বা শিল্প—কোনওটাই সঠিকভাবে না হওয়ায় এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভের চোরাস্রোত রয়েছে। বিজেপি সেই ক্ষোভকেই ভোটবাক্সে রূপান্তর করতে চাইছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় এলে সিঙ্গুর এবং সংলগ্ন এলাকায় আধুনিক শিল্পের নতুন জোয়ার আসবে এবং যুবকদের আর কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে যেতে হবে না।
তবে এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে বামফ্রন্টও পিছু হটতে নারাজ। সিপিআই(এম) নেতা সুজন চক্রবর্তী পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে জানিয়েছেন যে, সিঙ্গুরকে ধ্বংস করার নেপথ্যে তৃণমূল এবং বিজেপি—উভয়েরই ভূমিকা ছিল। তাঁর দাবি, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টাটাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন, তখন বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজসহ একাধিক কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতা সেই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। ফলে আজ বিজেপির মুখে শিল্পের কথা মানায় না। বামেদের অভিযোগ, তৃণমূল এবং বিজেপি উভয়েই সিঙ্গুরকে নিয়ে কেবল ইমোশনাল কার্ড খেলছে, প্রকৃত উন্নয়নের সদিচ্ছা কারও নেই।
সব মিলিয়ে রবিবারের এই হাইভোল্টেজ সভা কেবল বিজেপির শক্তি প্রদর্শন নয়, বরং ২০২৬-এর আগে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বোঝার এক বড় পরীক্ষা। মালদহের ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুর পর সিঙ্গুরে ‘শিল্প’ ইস্যু তুলে প্রধানমন্ত্রী মোদী বাংলার মানুষের সামনে এক ভিন্ন রাজনৈতিক বিকল্প পেশ করতে চাইছেন। এখন দেখার, প্রধানমন্ত্রীর এই ‘সিঙ্গুর স্ট্র্যাটেজি’ তৃণমূলের দুর্গে কতটা ফাটল ধরাতে পারে। সিঙ্গুরের মাটি কি আবার কোনও নতুন পরিবর্তনের সাক্ষী হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আজ বিকেলের মেগা সমাবেশের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা পশ্চিমবঙ্গ।
ট্যাগ (Tags):
#PMModiInSingur #SingurRally2026 #BengalAssemblyElection #MamataBanerjee #TataNanoLegacy #IndustrializationBengal #BJPStrategyChange #ModiSingurVisit #EmploymentIssueBengal #TMCvsBJP #PoliticalWarfareSingur #ManusherBhashaAnalysis #SingurMovementHistory #WestBengalDevelopment #BreakingNewsSingur

0 মন্তব্যসমূহ