ঐতিহাসিক জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চের উদ্বোধন: প্রধান বিচারপতির কাছে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার আর্জি মুখ্যমন্ত্রীর
মানুষের ভাষা নিউজ ডেস্ক, জলপাইগুড়ি: উত্তরবঙ্গের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন হলো আজ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের স্থায়ী এবং অত্যাধুনিক সার্কিট বেঞ্চের নতুন ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তরবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও সহজলভ্য করার লক্ষ্যে এই মাইলফলকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই বর্ণাঢ্য এবং গুরুগম্ভীর অনুষ্ঠানের মঞ্চ কেবল প্রশাসনিক স্তরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগঘন সওয়াল এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশে এই অনুষ্ঠান এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক তাৎপর্য লাভ করেছে।
শনিবার বিকেলের এই অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘাওয়াল, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং বিচারবিভাগের একাধিক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব। জলপাইগুড়ি শহরের প্রান্তিক এলাকায় ৪০.০৮ একর জমির ওপর নির্মিত এই বিশালাকার আদালত চত্বরটি রাজ্যের গর্ব হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রায় ৫০০ কোটি টাকারও বেশি খরচ করে নির্মিত এই বিচার ভবনটি কলকাতা হাইকোর্টের মূল ভবনের চেয়েও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন। এখানে বিচারকদের জন্য ৮০টি উচ্চমানের আবাসন এবং প্রধান বিচারপতির জন্য একটি বিশেষ বাংলো তৈরি করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বারবার মনে করিয়ে দেন যে, উত্তরবঙ্গের জন্য এই দিনটি মানুষের মনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
তবে অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে দেশের সংবিধানের ‘অভিভাবক’ হিসেবে সম্বোধন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক নজিরবিহীন আরজি জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামো এবং সাংবিধানিক স্তম্ভগুলি সংকটের মুখে। তাঁর মতে, বিচারব্যবস্থা, সংবিধান, দেশের সাধারণ নাগরিক এবং সংবাদমাধ্যম—এই চারটি স্তম্ভের মধ্যে মেলবন্ধন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন যে, বর্তমানে দেশজুড়ে এক ধরণের নৈরাজ্য তৈরির চেষ্টা চলছে, যেখানে ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। প্রধান বিচারপতির কাছে হাতজোড় করে তিনি আবেদন করেন যেন দেশের ইতিহাস, ভূগোল এবং গণতন্ত্রকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির ভূমিকা এবং তাঁদের কার্যকলাপ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ। তিনি সরাসরি কোনও সংস্থার নাম না নিলেও, ‘কিছু এজেন্সি’ ইচ্ছাকৃতভাবে নাগরিকদের সম্মানহানি ও মানহানির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যমের একাংশের ভূমিকা নিয়ে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কোনও মামলার বিচার শেষ হওয়ার আগেই ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ বা সংবাদমাধ্যমের বিচারে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ণ করে। তিনি বিচারকদের কাছে অনুরোধ জানান, যাতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি সাধারণ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে না পারে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বক্তব্য আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে সাম্প্রতিক ইডি হানার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যদিও তিনি সরাসরি ওই ঘটনার উল্লেখ করেননি, তবে তাঁর বক্তব্যের লক্ষ্য যে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলি ছিল, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি।
কেন্দ্রীয় বরাদ্দ নিয়েও এদিনের মঞ্চ থেকে সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। মঞ্চে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘাওয়ালের উপস্থিতিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্র বিচারবিভাগের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বা বরাদ্দ দিচ্ছে না। তিনি সগর্বে ঘোষণা করেন যে, কেন্দ্র তহবিল বন্ধ করে দেওয়া সত্ত্বেও রাজ্য সরকার নিজস্ব কোষাগার থেকে ১,২০০ কোটি টাকা খরচ করে বিচারবিভাগের উন্নতি ঘটিয়েছে। এই টাকার মাধ্যমেই রাজ্যে ৮৮টি ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গড়ে তোলা হয়েছে, যার মধ্যে ৫২টি আদালত নির্দিষ্টভাবে নারীঘটিত অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। এছাড়া পকসো মামলা, শ্রমিক আদালত এবং মানবাধিকার আদালতের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিউ টাউনে কলকাতা হাইকোর্টের জন্য নতুন ভবন এবং একটি অত্যাধুনিক আইন আকাদেমি তৈরির কাজও রাজ্য সরকারের নিজস্ব উদ্যোগেই এগোচ্ছে বলে তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক শিষ্টাচারও ছিল চোখে পড়ার মতো। তিনি প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য বিচারপতিদের নিজে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নিলেও, কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রীকে উত্তরীয় পরানোর ভার দেন বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ওপর। এই সূক্ষ্ম পদক্ষেপটি কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের বর্তমান শৈত্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বারংবার তরুণ আইনজীবীদের সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যারা নতুন এই পেশায় আসছেন, তারা অনেক সময় সুযোগের অভাবে এবং আর্থিক সংকটে পিছিয়ে পড়েন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিশেষ নজর দেওয়ার অনুরোধ জানান।
উপসংহারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের হেফাজত বা কাস্টডিতে আছি। আপনাদের ওপরে কেউ নেই।” তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ঐক্যের বার্তা দিয়ে বলেন যে, তিনি এই সমস্ত কথা নিজের জন্য বলছেন না, বরং দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার এবং গণতন্ত্রকে রক্ষার তাগিদে বলছেন। জলপাইগুড়ির এই নতুন সার্কিট বেঞ্চ কেবল ইটের গাঁথনি নয়, বরং উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে ন্যায়বিচারের একটি প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। রাতের দিকে এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হলেও মুখ্যমন্ত্রীর এই সাংবিধানিক আরজি নিয়ে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে আলোচনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে।
ট্যাগ (Tags):
#JalpaiguriCircuitBench #MamataBanerjee #CJISuryaKant #SupremeCourtOfIndia #WestBengalPolitics #JudiciaryNews #CentralAgencyControversy #DemocracyAndConstitution #NorthBengalProgress #FastTrackCourts #MediaTrial #JusticeSystemIndia #ManusherBhashaSpecial #LegalGuardianship #BreakingNewsBengal


0 মন্তব্যসমূহ