‘খালি কলসি’ নন হুমায়ুন! ব্রিগেডে মিম-আইএসএফ জোটের নীল নকশা ? বদলে যেতে পারে ২০২৬-এর নির্বাচনী পাটিগণিত
সংক্ষেপ (Summary): ব্রিগেডে সমাবেশের ডাক দিয়ে তৃণমূলের বিদ্রূপের মুখে পড়েছেন হুমায়ুন কবির। তবে পর্দার আড়ালে তিনি মিম (AIMIM), আইএসএফ (ISF) এবং অন্যান্য মুসলিম নেতাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এক বিশাল শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।1 তাঁর এই ‘মুসলিম মহাজোট’ যদি সফল হয়, তবে ২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূলের নিশ্চিত ভোট ব্যাংকে বড়সড় ফাটল ধরা এবং রাজ্যের নির্বাচনী অঙ্ক আমূল বদলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সমীকরণ এক নাটকীয় মোড় নিতে চলেছে। ভরতপুরের বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবির এখন আর স্রেফ এক ‘বিদ্রোহী’ নেতা নন, বরং তিনি হয়ে উঠেছেন এক নতুন মুসলিম ফ্রন্টের কেন্দ্রবিন্দু। তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘ব্রিগেড দৌড়ে দেখানোর’ যে বিদ্রূপ করা হয়েছে, তার জবাবে হুমায়ুন স্রেফ বাক্যবাণ ছুড়ছেন না—পিছনে কাজ করছে এক নিপুণ গাণিতিক হিসাব। আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মিম (AIMIM), পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির আইএসএফ (ISF) এবং রাজ্যের অন্যান্য মুসলিম ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের এক ছাতার তলায় এনে এক ‘মহাসফল’ ব্রিগেড সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
হুমায়ুনের তুরুপের তাস মিম ও আইএসএফ! ব্রিগেডে কি দেখা যাবে নয়া মুসলিম ফ্রন্ট? ২০২৬-এর আগে দুশ্চিন্তায় নবান্ন
বিদ্রূপের জবাব মাঠেই: হুমায়ুনের ‘ব্রিগেড চ্যালেঞ্জ’
সম্প্রতি হুমায়ুন কবির যখন ব্রিগেডের ময়দান পরিদর্শনে যান, তখন তাঁকে তৃণমূলের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। শাসকদলের নেতারা কটাক্ষ করে বলেছিলেন, “ব্রিগেডে সভা করার আগে মাঠটা একবার দৌড়ে শেষ করুন।” হুমায়ুন কবির এই ব্যক্তিগত আক্রমণকে আমল না দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি মাঠ পরিদর্শনে গিয়েছেন সেনার অনুমতির প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে। তাঁর লক্ষ্য ৩১ জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে এক ‘ঐতিহাসিক’ সমাবেশ করা। হুমায়ুনের দাবি, যারা তাঁকে ‘পাতাখোর’ বা ‘তোলাবাজ’ বলছে, তাদের জবাব তিনি গত ৬ ও ২২ ডিসেম্বরের জমায়েতেই দিয়ে দিয়েছেন। তাঁর মতে, তাঁর ব্রিগেডে জমায়েত হবে ১০ লক্ষ মানুষের।
মিম ও আইএসএফ-এর সঙ্গে গোপন আলাপ ও মহাজোট
হুমায়ুন কবিরের এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে এক বিশাল নেটওয়ার্কিং।
সূত্রের খবর, তিনি ইতিমধ্য়েই আসাদউদ্দিন ওয়াইসির দল AIMIM-এর বঙ্গ ইউনিটের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক সেরেছেন। মিম-এর পক্ষ থেকেও হুমায়ুনকে নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির ISF এবং রাজ্যের একাধিক প্রভাবশালী ইমাম ও মুসলিম স্কলারদের সঙ্গেও তিনি নিরন্তর যোগাযোগ রাখছেন। হুমায়ুনের লক্ষ্য হলো, পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু ভোটের যে ৩০-৩২ শতাংশ সরাসরি তৃণমূলের দিকে যায়, তাকে খণ্ডিত করে নিজের নবগঠিত ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’র দিকে নিয়ে আসা।
রাজনৈতিক পাটিগণিতে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা
পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪টি আসনের মধ্যে অন্তত ৯০-১০০টি আসনে মুসলিম ভোটাররা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেন।2 এর আগে ২০২১ সালে আব্বাস সিদ্দিকির আইএসএফ বাম-কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করেও আশানুরূপ ফল করতে পারেনি কারণ ভোট ভাগ হওয়ার ভয়ে সংখ্যালঘুরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরই আস্থা রেখেছিলেন।3 কিন্তু হুমায়ুন কবিরের এবারের কৌশল কিছুটা ভিন্ন। তিনি নিজেকে স্রেফ এক ধর্মীয় নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন অভিজ্ঞ ‘পলিটিক্যাল মাভেরিক’ হিসেবে তুলে ধরছেন। তাঁর দাবি, “বাংলায় মুসলিমদের কন্ঠস্বর চেপে রাখা হয়েছে।”
যদি হুমায়ুন কবির মিম ও আইএসএফ-কে নিয়ে এক মঞ্চে দাঁড়াতে পারেন, তবে:
মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর ২৪ পরগনায় তৃণমূলের একাধিপত্য খতম হতে পারে।
বিপুল সংখ্যালঘু আবেগ একজোট হলে মালদা মুর্শিদাবাদে বিপুল আসনে এগিয়ে থাকে পারে হুমায়ুন , আইএসএফ ও মিম। অন্যরা খাতা খুলতে পারবে তো ? কারণ এই জেলাগুলোতে সংখ্যালঘু মুসলিমরাই সংখ্যাগুরু। তারা এতদিন টিএমসি তে ১০০% ভোট দিত। এবার তা হবে না বলেই সাধারণ মানুষ মনে করছে।
তৃণমূলের ‘সংখ্যালঘু রক্ষা’র ন্যারেটিভ বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
‘বেলাগাম’ বনাম ‘হিসাবী’ হুমায়ুন
অনেকে হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যকে স্রেফ ‘গরম গরম ভাষণ’ বলে উড়িয়ে দিলেও, তাঁর রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে তিনি অত্যন্ত হিসাব কষে পা ফেলেন। মুর্শিদাবাদে ‘বাবরি মসজিদ’-এর প্রতীকী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা থেকে শুরু করে ওড়াকান্দির ঠাকুরবাড়ির অবমাননার প্রতিবাদে সরব হওয়া—প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি সংখ্যালঘু ও দলিত ভাবাবেগকে স্পর্শ করতে চাইছেন। তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৭ জানুয়ারি মুর্শিদাবাদ সফরে আসছেন, আর হুমায়ুন কবিরের পাল্টায় বড় কোনো কর্মসূচি ওই জেলাই তাঁর জনপ্রিয়তার লিটমাস টেস্ট হতে চলেছে।
তৃণমূল কংগ্রেস হুমায়ুন কবিরকে যতই ‘মীরজাফর’ বা ‘সুবিধাবাদী’ বলে আক্রমণ করুক না কেন, তাঁর পিছনে থাকা ক্রমবর্ধমান ভিড়কে অগ্রাহ্য করা কঠিন। ব্রিগেডের ময়দানে যদি সত্যিই মিম ও আইএসএফ-এর ঝাণ্ডা হুমায়ুনের পাশে ওড়ে, তবে তা হবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের সবথেকে বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’। ‘খালি কলসি’ নয়, হুমায়ুন কবির এখন এক বিস্ফোরক রাজনৈতিক সমীকরণ যার বিস্ফোরণ ঘটলে বদলে যেতে পারে বাংলার বিধানসভার রঙ।
ট্যাগ: #HumayunKabir #WestBengalPolitics #MuslimVoteBank #AIMIM #ISF #BrigadeParadeGround #TMCVsHumayun #BengalElection2026 #MurshidabadPolitics

0 মন্তব্যসমূহ