আইপ্যাক-এ ইডির হানা: ভোট-কৌশল ‘চুরি’র অভিযোগে রণংদেহী মমতা, শহরজুড়ে নজিরবিহীন শোরগোল
আজ ৮ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার। সকাল থেকেই কলকাতার আকাশ মেঘলা থাকলেও রাজভবন থেকে নবান্ন— রাজ্য রাজনীতির পারদ ছিল ফুটন্ত। একদিকে কয়লা পাচার কাণ্ডের সূত্র ধরে ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর দপ্তরে ইডির হানা, অন্যদিকে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অকুস্থলে পৌঁছে নজিরবিহীন প্রতিবাদ। সব মিলিয়ে গত কয়েক বছরের মধ্যে আজ শহর কলকাতা দেখল সবথেকে হাইভোল্টেজ রাজনৈতিক নাটক।
সংক্ষেপ (Summary):
কয়লা পাচার কাণ্ডের পুরনো মামলায় দিল্লির ইডির বিশেষ টিমের হানা আইপ্যাক-এর সল্টলেক দপ্তর ও প্রধান প্রতীক জৈনের বাড়িতে।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজিরবিহীন পদক্ষেপ— খোদ তল্লাশিস্থলে পৌঁছে ‘দলের নথি’ উদ্ধার করে গাড়িতে তুললেন তিনি।
বিজেপি ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে ‘ভোট-কৌশল চুরির’ বিস্ফোরক অভিযোগ তৃণমূল নেত্রীর।
পাল্টা আক্রমণে শুভেন্দু অধিকারী— ‘তদন্তে বাধা দেওয়ার’ অভিযোগে আদালতের দ্বারস্থ এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট।
শুক্রবার রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ মিছিলের ডাক তৃণমূলের।
ভোর ৬টার ঝটিকা হানা এবং স্তব্ধ সেক্টর ফাইভ
আজ যখন শীতের আমেজ গায়ে মেখে কলকাতা ঘুম ভাঙছিল, তখনই দিল্লির ১২ থেকে ১৫ জন ইডি আধিকারিকের একটি বিশেষ দল পৌঁছে যায় সল্টলেক সেক্টর ফাইভের আইপ্যাক (I-PAC) দপ্তরে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা এলাকাটি ঘিরে ফেলেন। সমান্তরালভাবে অভিযান শুরু হয় লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাক-এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। ইডি সূত্রের খবর, ২০২০ সালে নথিভুক্ত হওয়া একটি কয়লা পাচার মামলার আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরেই এই তল্লাশি। অভিযোগ, ওই মামলার কিছু ‘হাওয়ালা’ টাকা আইপ্যাক-এর বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে বা প্রজেক্টে ব্যবহৃত হয়েছে।
সকাল ৮টা নাগাদ খবর চাউর হতেই উত্তপ্ত হতে শুরু করে পরিস্থিতি। তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা, বুথ ভিত্তিক রণকৌশল এবং এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত গোপন তথ্য হাতিয়ে নিতেই মোদী সরকারের এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অপারেশন রিকভারি’
বেলা বাড়ার সাথে সাথে নাটকের ক্লাইম্যাক্স শুরু হয়। দুপুর ১২টা নাগাদ সবাইকে অবাক করে দিয়ে লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কনভয়। সাথে ছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। ইডি আধিকারিকদের পরিচয়পত্র যাচাই করে পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রী সোজা লিফটে করে উপরে উঠে যান। প্রায় ২০ মিনিট পর যখন তিনি নিচে নামেন, তাঁর হাতে দেখা যায় একটি সবুজ রঙের ফোল্ডার। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বিস্ফোরক মেজাজে বলেন, "এগুলো আমার দলের নথি। প্রার্থী তালিকা থেকে শুরু করে আমাদের জেতার রণকৌশল সব ইডি চুরি করার চেষ্টা করছিল। আমি তা উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছি।"
‘Nasty, naughty Home Minister behind it’, PM Modi Control your Home Minister. I Have taken Hard Disc and Files! & now going to other places raided by ED to save my data. This is no way to win elections.
— Megh Updates 🚨™ (@MeghUpdates) January 8, 2026
: Angry CM Mamata threatening on ED raids pic.twitter.com/jSV48dSQ1R
কিন্তু নাটক এখানেই শেষ হয়নি। লাউডন স্ট্রিট থেকে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি পৌঁছে যান সল্টলেক সেক্টর ফাইভের আইপ্যাক অফিসে। সেখানে তখন তল্লাশি তুঙ্গে। প্রায় চার ঘণ্টা তিনি সেই অফিসের ভেতরেই অবস্থান করেন। বিকেলে যখন তিনি বেরোন, তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে একগুচ্ছ ফাইল এবং ল্যাপটপ ব্যাগ দেখা যায়, যা সটান মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে তোলা হয়।
"অমিত শাহ জঘন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী": শাণিত আক্রমণ মমতার
আইপ্যাক দপ্তর থেকে বেরিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে কার্যত ফেটে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে তিনি বলেন, "হিম্মত থাকলে রাজনৈতিকভাবে লড়ুন। ইডি-কে দিয়ে আমাদের ডাটা এন্ট্রি চুরি করছেন কেন? ভোর ৬টায় যখন কেউ ছিল না, তখন কেন ঢুকলেন? আমাদের এসআইআর (SIR)-এর কাজ বিঘ্নিত করার চক্রান্ত চলছে।" তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, ইডি আধিকারিকরা ল্যাপটপ থেকে পেনড্রাইভে তৃণমূলের গোপন ডেটা ট্রান্সফার করে নিয়েছেন, যা একপ্রকার ‘গণতন্ত্রের হত্যা’।
"ED took all our SIR data, party policy data, candidate list, booth president list from IPAC office and Pratik Jain's house."
— News Arena India (@NewsArenaIndia) January 8, 2026
- Bengal CM Mamata Banerjee after ED raid at IPAC office pic.twitter.com/rgJNgtB3sf
তদন্তে বাধার পাল্টা অভিযোগ ইডির
মুখ্যমন্ত্রীর এই ভূমিকায় হতবাক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারাও। দিল্লির ইডি সদর দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, "কোনো রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে এই তল্লাশি নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক আর্থিক দুর্নীতি মামলার অংশ।" তবে মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে তল্লাশিস্থল থেকে ফাইল ও হার্ড ডিস্ক নিজের জিম্মায় নিয়েছেন, তাকে ‘তদন্তে বাধা’ হিসেবে দেখছে ইডি।
ED Headquarters Unit is conducting search action at 10 premises (6 in West Bengal and 4 in Delhi) under PMLA in connection with coal smuggling syndicate led by Anup Majee used to steal and illegally excavate coal from ECL leasehold areas of West Bengal. The search action was… pic.twitter.com/ab7PCReiJo
— ED (@dir_ed) January 8, 2026
বিকেলেই ইডির আইনজীবীরা কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে মৌখিক আবেদন জানান। তাঁদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘প্রমাণ নষ্ট’ করেছেন। শুক্রবার এই মামলার জরুরি শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।
বিজেপির তোপ: রাজীব কুমার পর্বের পুনরাবৃত্তি?
রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে ঘিরে মুখ্যমন্ত্রীকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, "সেই ২০১৯ সালে রাজীব কুমারের বাড়ির সামনে ধরনা দেওয়ার দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানেন যে এবার খেলা শেষ, তাই তিনি ভয় পেয়ে প্রমাণ লুকাতে নিজেই পৌঁছে গিয়েছেন চোরের ডেরায়। একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নিয়েছেন সংবিধান রক্ষার, অথচ আজ তিনিই আইন ভাঙলেন।"
আজকের ঘটনাক্রম এক নজরে (Timeline of Events)
| সময় | ঘটনা |
| সকাল ০৬:০০ | সল্টলেক ও লাউডন স্ট্রিটে ইডির একযোগে প্রবেশ ও তল্লাশি শুরু। |
| সকাল ০৯:৩০ | আইপ্যাক দপ্তরের বাইরে তৃণমূল কর্মীদের জমায়েত ও বিক্ষোভ। |
| দুপুর ১২:১০ | লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সিপি মনোজ ভার্মা। |
| দুপুর ১২:৪৫ | সবুজ ফোল্ডার হাতে প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বেরোলেন মুখ্যমন্ত্রী। |
| দুপুর ০১:১৫ | সল্টলেক সেক্টর ফাইভের আইপ্যাক দপ্তরে মমতার প্রবেশ। |
| বিকেল ০৪:৩০ | আইপ্যাক দপ্তর থেকে ফাইল ও নথি নিয়ে বেরিয়ে অমিত শাহকে কড়া আক্রমণ। |
| বিকেল ০৫:৩০ | ইডির পক্ষ থেকে কলকাতা হাইকোর্টে অভিযোগ দায়ের ও মামলার অনুমতি লাভ। |
২০২৬-এর ভোটের আগে আজকের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, তৃণমূল ও কেন্দ্রের লড়াই আর শুধু রাজনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ নেই—তা এখন ‘ব্যক্তিগত এবং ডিজিটাল’ যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। যদি সত্যিই ইডির হাতে তৃণমূলের গোপন ‘ইলেকশন ডেটা’ পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবে তা ঘাসফুল শিবিরের জন্য বড় বিপদ হতে পারে। আবার অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে নিজেই মাঠে নেমে নথি ‘উদ্ধার’ করলেন, তা তাঁর লড়াকু ভাবমূর্তিকে কর্মীদের কাছে আরও শক্তিশালী করল। কাল হাইকোর্টের রায়ের দিকেই এখন তাকিয়ে গোটা বাংলা।
0 মন্তব্যসমূহ