পড়ুন ED-র প্রেস বিবৃতি : মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মূল তথ্য প্রমাণ ছিনিয়ে নেওয়ার মারাত্নক অভিযোগ
Image- India Today
বৃহস্পতিবার ৮ জানুয়ারি ২০২৬-এর এই প্রেস নোটটি কেবল একটি প্রশাসনিক বিবৃতি নয়, বরং এটি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও সরাসরি আইনি আক্রমণ। সাধারণত ইডির প্রেস নোটগুলোতে তদন্তের অগ্রগতির কথা থাকে, কিন্তু এই নোটটি কার্যত মুখ্যমন্ত্রীকে তদন্তে বিঘ্ন ঘটানো এবং তথ্যপ্রমাণ চুরির সরাসরি দায়ে অভিযুক্ত করেছে।
৮ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) কর্তৃক প্রকাশিত প্রেস বিজ্ঞপ্তির সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো:
ED-প্রেস বিজ্ঞপ্তি
০৮-০১-২০২৬
আজকের এই তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে সিবিআই কলকাতা এফআইআর নম্বর RC0102020A0022 (তারিখ ২৭.১১.২০২০), যা শ্রী অনুপ মাজি এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে করা হয়েছিল, তার ওপর ভিত্তি করে। এই মামলার প্রেক্ষিতে ইডি ২৮.১১.২০২০ তারিখে একটি ইসিআইআর (ECIR/17/HIU/2020) নথিভুক্ত করেছিল।
তদন্ত চলাকালীন এটি প্রকাশিত হয়েছে যে, অনুপ মাজির নেতৃত্বাধীন কয়লা পাচার সিন্ডিকেট পশ্চিমবঙ্গের ইসিএল (ECL) লিজহোল্ড এলাকা থেকে কয়লা চুরি এবং অবৈধভাবে খনন করত। এরপর এই কয়লা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বর্ধমান, পুরুলিয়া এবং অন্যান্য জেলার বিভিন্ন কারখানা ও প্ল্যান্টে বিক্রি করা হতো।
তদন্তে আরও জানা গেছে যে, এই কয়লার একটি বড় অংশ 'শাকম্ভরী গ্রুপ অফ কোম্পানিজ'-কে বিক্রি করা হয়েছিল। তদন্তে হাওয়ালা অপারেটরদের সাথেও যোগসূত্র পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ব্যক্তির বয়ান সহ একাধিক তথ্য-প্রমাণ এই হাওয়ালা চক্রের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে যে, কয়লা পাচারের লভ্যাংশ লেনদেনের সাথে যুক্ত একজন হাওয়ালা অপারেটর 'ইন্ডিয়ান প্যাক কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড' (I-PAC)-কে দশ কোটি টাকারও বেশি লেনদেনে সহায়তা করেছিল। কয়লা পাচারের অর্থ জেনারেট করা, হাওয়ালা অপারেটর এবং হ্যান্ডলারদের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা ০৮.০১.২০২৬ তারিখের পিএমএলএ (PMLA) তল্লাশিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। আইপ্যাক (IPAC)-ও হাওয়ালা টাকার সাথে যুক্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আজকের এই অভিযানে পশ্চিমবঙ্গের ৬টি এবং দিল্লির ৪টি এলাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তল্লাশি চলাকালীন, দক্ষিণ কলকাতার ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ এবং সরণি থানার অফিসার ইনচার্জ একজন কর্মীসহ কর্মকর্তাদের পরিচয় যাচাই করতে একটি প্রাঙ্গণে এসেছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরে কলকাতা পুলিশের কমিশনারও বেশ কয়েকজন পুলিশ আধিকারিকসহ সেই প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। অনুমোদিত অফিসার (Authorized Officer) তাঁদের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন এবং নিজের পরিচয়পত্রও দেখান।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিশাল সংখ্যক পুলিশ আধিকারিকের আগমনের আগে পর্যন্ত এই কার্যক্রম অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও পেশাদার পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছিল। কুমারী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতীক জৈনের আবাসিক প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন এবং ভৌত নথি (Physical documents) ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ মূল তথ্য-প্রমাণগুলো নিয়ে যান।
মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় এরপর আইপ্যাক-এর অফিস প্রাঙ্গণে যায়, যেখান থেকে কুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সহকারীরা এবং রাজ্য পুলিশের কর্মীরা জোরপূর্বক ভৌত নথি এবং ইলেকট্রনিক প্রমাণগুলো সরিয়ে ফেলেন।
উপরোক্ত এই কর্মকাণ্ডের ফলে চলমান তদন্ত এবং পিএমএলএ-র অধীনে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি হয়েছে।
এটি স্পষ্ট করা হচ্ছে যে, এই তল্লাশি সম্পূর্ণ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়েছে এবং এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর লক্ষ্য করে করা হয়নি। কোনো দলীয় কার্যালয়ে তল্লাশি চালানো হয়নি। এই তল্লাশির সাথে কোনো নির্বাচনের কোনো যোগসূত্র নেই এবং এটি মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানেরই একটি অংশ। এই তল্লাশি সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত আইনি সুরক্ষাকবচ মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
এই প্রেস নোটটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কতটা আক্রমণাত্মক
১. ‘তদন্তে বাধা’ ও ‘প্রমাণ নষ্টের’ সরাসরি অভিযোগ
ইডির এই প্রেস নোটে সবথেকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপকে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং একদল পুলিশ আধিকারিক তল্লাশিস্থলে প্রবেশ করে “মূল তথ্য-প্রমাণ” (Key evidence) জোরপূর্বক সরিয়ে নিয়েছেন।
২. ‘জোরপূর্বক’ ও ‘পেশাদারিত্বে আঘাত’ শব্দ প্রয়োগ
প্রেস নোটে অভিযোগ করা হয়েছে যে, মুখ্যমন্ত্রীর আগমনের আগে পর্যন্ত তল্লাশি প্রক্রিয়া অত্যন্ত “শান্তিপূর্ণ ও পেশাদার” পদ্ধতিতে চলছিল। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশের আগমনে সেই স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। এখানে মুখ্যমন্ত্রীকে একজন দায়িত্বশীল প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে নয়, বরং তদন্তে ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী এক শক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইডির দাবি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর সহকারীরা “জোরপূর্বক” (Forcibly) নথিপত্র সরিয়ে ফেলেছেন, যা প্রশাসনিক স্তরে এক নজিরবিহীন অভিযোগ।
৩. আইপ্যাক-কে ‘হাওয়ালা’র সাথে সরাসরি যুক্ত করা
এই প্রেস নোটের মাধ্যমে ইডি বড়সড় রাজনৈতিক চাল চেলেছে আইপ্যাক (I-PAC)-কে সরাসরি “হাওয়ালা মানি”-র সাথে যুক্ত করে। ইডির অভিযোগ, কয়লা পাচারের দুর্নীতির টাকা হাওয়ালা অপারেটরদের মাধ্যমে ১০ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ আইপ্যাক-এর অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। যেহেতু আইপ্যাক সরাসরি তৃণমূলের নির্বাচনী রণকৌশল তৈরি করে, তাই এই অভিযোগের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে তৃণমূলের নির্বাচনী তহবিলকেও তদন্তের আওতায় আনার ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থাটি।
৪. ‘রাজনৈতিক সংঘাত’ বনাম ‘আইনি লড়াই’
প্রেস নোটের শেষে ইডি সুকৌশলে জানিয়েছে যে, এই তল্লাশি কোনো “রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের” ওপর লক্ষ্য করে করা হয়নি এবং কোনো দলীয় কার্যালয়েও হানা দেওয়া হয়নি। এই বক্তব্যের মাধ্যমে ইডি মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’র অভিযোগকে নস্যাৎ করতে চেয়েছে। এটি এক প্রকার মুখ্যমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, তাঁর হস্তক্ষেপই বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক’ রূপ দিয়েছে, যা আদতে একটি নিয়মিত আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত ছিল।
৫. আদালতের দ্বারস্থ হওয়া: চূড়ান্ত সংঘাতের বার্তা
প্রেস নোটটি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইডি কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে।
ইডির এই প্রেস নোটটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কারণ এখানে তাঁর ওপর প্রমাণ নষ্ট ও চুরির মতো ফৌজদারি অপরাধের ছায়া ফেলা হয়েছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরণের কড়া বিবৃতি ও আইনি পদক্ষেপ বাংলার রাজনীতিতে এক ‘মহা-সংঘাতের’ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

0 মন্তব্যসমূহ