"ক্ষমা করে দেবেন। একটা ভুল পথে চলে গিয়েছিলাম।" শিশির অধিকারী
নিজস্ব প্রতিবেদন, পটাশপুর: বাংলার রাজনীতিতে অধিকারী পরিবার মানেই এক দাপুটে ইতিহাস। কিন্তু সেই ইতিহাসের অন্যতম কান্ডারি, চুরাশি বছরের বর্ষীয়ান জননেতা শিশির অধিকারী যখন প্রকাশ্য জনসভায় গলার উত্তরীয় খুলে, ঝুঁকে পড়ে সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমা চান, তখন রাজনীতির আঙিনায় এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। মঙ্গলবার পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরে বিজেপির একটি সভায় এমনই এক নজিরবিহীন দৃশ্যের সাক্ষী থাকল গোটা রাজ্য। হাত জোড় করে, মঞ্চের মাটি ছুঁয়ে তিনি বললেন— "গলবস্ত্র হয়ে এই মাটি ছুঁয়ে আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। একটা ভুল পথে চলে গিয়েছিলাম।"
কেন এই প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা?
দীর্ঘ দু’দশকেরও বেশি সময় তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাটন সামলেছেন শিশির অধিকারী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী করার অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি নিজে। কিন্তু গতকাল পটাশপুরের মঞ্চে তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তাঁর কথায়, "আমি আপনাদের ভুল পথে চালিত করেছিলাম। আপনাদের সাথে নিয়ে সেই পথে গিয়েছিলাম, কিন্তু আপনাদের জন্য কিছু করতে পারলাম না। আজ চোখ থেকে জল পড়ে যাচ্ছে।" ব্রাহ্মণ সন্তান হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে তিনি জানান, ভুল বুঝতে পেরেছেন বলেই মানুষের কাছে এই প্রায়শ্চিত্ত করছেন।
তৃণমূলকে কড়া ভাষায় তোপ ও ২০২৬-এর লক্ষ্য
ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি শাসকদলের বিরুদ্ধেও বিষোদগার করেন প্রাক্তন সাংসদ। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের অন্দরের ‘কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি’ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং তা এখন তাঁর কাছে ঘৃণার বিষয়। শিশিরবাবুর বার্তা— "ছাব্বিশ সালে বিজেপি সরকারটা এনে দিন। আমি এখনও অনেকদিন বাঁচব, আপনাদের হড়হড় করে টেনে নিয়ে আসব উন্নয়নের পথে। এরা তো কেবল চুরিটাই ভালো জানে!"
অমিত শাহকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন দাবি করে তিনি পটাশপুরের মানুষকে অভয় দেন যে, বিজেপি এলে এলাকার যে উন্নয়ন হবে, তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি।
"নাটুকে সংলাপ": তৃণমূলের পাল্টা কটাক্ষ
শিশির অধিকারীর এই আবেগঘন মুহূর্তকে অবশ্য ‘নাটক’ বলতে ছাড়েনি তৃণমূল কংগ্রেস। দলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ তীব্র আক্রমণ শানিয়ে বলেন, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য আপনি কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন, সাংসদ হয়েছেন। শিশিরদার মতো বর্ষীয়ান মানুষের এমন সস্তার রাজনীতি করা ঠিক হচ্ছে না। কোন বাধ্যবাধকতায় এই নাটুকে সংলাপ বলছেন জানি না, তবে ধন্যবাদ দেওয়াটাই ওঁর উচিত ছিল।"
রাজনৈতিক গুরুত্ব: ২০২৬-এর আগে দাবার চাল?
রাজনৈতিক মহলের মতে, শিশির অধিকারীর এই ক্ষমা চাওয়া কেবল আবেগ নয়, বরং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে।
শুভেন্দুর হাত শক্ত করা: মেজোপুত্র শুভেন্দু অধিকারী যখন জেলায় জেলায় তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন, তখন বাবার এই ‘অনুশোচনা’ সাধারণ মানুষের বিশেষ করে পুরনো তৃণমূল কর্মীদের মনে সহানুভূতি তৈরি করতে পারে।
আবেগের জোয়ার: মেদিনীপুরের রাজনীতিতে শিশির অধিকারীর একটি ‘অভিভাবক’ সুলভ ইমেজ আছে। তাঁর নিচু হয়ে মাটি ছোঁয়ার দৃশ্যটি গ্রামবাংলার ভোটারদের মনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজেপি নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য শিশিরবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তিনি একজন রাজনৈতিক প্রাজ্ঞ এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি ঠিক সময়ে ‘দেওয়াল লিখন’ পড়তে পেরেছেন বলেই সাধারণ মানুষের কাছে সত্য স্বীকার করেছেন।
শিশির অধিকারীর এই ‘গলবস্ত্র’ হয়ে ক্ষমা চাওয়া কি মেদিনীপুরের মাটিতে তৃণমূলের শেষ পেরেক পুঁতে দেবে? না কি কুণাল ঘোষের বলা ‘নাটক’ হিসেবেই একে মানুষ গ্রহণ করবে? উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৬ পর্যন্ত। তবে ৮৪ বছরের এক প্রবীণ রাজনীতিবিদের এই আত্মসমর্পণ বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবেই থেকে যাবে।
0 মন্তব্যসমূহ